এসো হাদিস পড়ি ?
এসো হাদিস পড়ি ?
হাদিস অনলাইন ?

এরূপ অন্ধ অনুসরণকে তাক্বলীদে শাখছী বলা হয়। অর্থাৎ ‘নবী ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তির কোন শারঈ সিদ্ধান্তকে বিনা দলীলে মেনে নেওয়া। এর ফলে মানুষ অন্য একজন মানুষের অন্ধ অনুসারী হয়ে পড়ে। অনুসরণীয় ব্যক্তির ভুল-শুদ্ধ সব কিছুকেই সে সঠিক মনে করে। মানুষ যুগে যুগে কখনো তার বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা রসম-রেওয়াজের অনুসারী হয়েছে, কখনো কোন সাধু ব্যক্তি অথবা ধর্মনেতার অনুসারী হয়েছে। ফলে নবীদের মাধ্যমে আল্ল­াহ প্রেরিত ইলাহী সত্যকে সত্য বলে স্বীকার করেও অনেকে তা মানতে ব্যর্থ হয়েছে শুধুমাত্র তাক্বলীদী গোঁড়ামীর কারণে। 

এভাবে কারো তাক্বলীদ করে কুরআন ও ছহীহ হাদীছকে অবজ্ঞা করলে সে জাহান্নামী হবে। অপরদিকে কুরআন ও হাদীছের বিশুদ্ধ দলীল অনুযায়ী নবী (ছাঃ)-এর অনুসরণ করাকে বলা হয় ‘ইত্তেবা’। কোন বিষয়ে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক ফৎওয়া নিশ্চিতভাবে জানার পর নিঃসংকোচে তা মেনে নেওয়া প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক। ইচ্ছাকৃতভাবে বা দুনিয়াবী কোন স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে অথবা নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির দোহাই দিয়ে তা পরিত্যাগ করলে ঐ ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানদার হ’তে পারবে না (নিসা ৪/৬৫)। এভাবে যদি সে কুরআন বা হাদীছের কোন বিশুদ্ধ আমলকে অপসন্দ করে, তাহ’লে তার সমস্ত আমল বরবাদ হবে (মুহাম্মাদ ৪৭/৯, ৩৩)। তবে কোন মুসলিম ব্যক্তিকে কাফের, ঈমানহীন, মুনাফিক, জাহান্নামী ইত্যাদি আখ্যা দেয়া বা সম্বোধন করা শরী‘আতসম্মত নয় (বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৮১৫)। বরং কারু মাঝে এরূপ দোষ দেখা দিলে বলতে হবে যে, এরূপ কাজ বা চিন্তা কুফরী বা শিরকের পর্যায়ভুক্ত অপরাধ।

এটা আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তন নয়। বরং এটি জন্মগত ত্রুটি সংশোধন। অতএব তা অপারেশনের মাধ্যমে প্রকৃতরূপে ফিরিয়ে আনায় কোন বাধা নেই। আরফাজা বিন আস‘আদ (রাঃ) (জাহেলী যুগে) কুলাব যুদ্ধে নাক হারালে তিনি সেখানে রূপার তৈরী একটি নাক লাগান। কিন্তু তাতে দুর্গন্ধ দেখা দিলে রাসূল (ছাঃ) তাকে স্বর্ণের নাক সংযোজনের নির্দেশ দেন (তিরমিযী, আবুদাঊদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/৪৪০০ সনদ হাসান)।

এসব শয়তানী ওয়াসওয়াসা মাত্র। আল্লাহর আকার রয়েছে যা তাঁর উপযুক্ত। তা কারু সাথে তুলনীয় নয় (শূরা ৪২/১১)। অতএব এই বিশুদ্ধ আক্বীদার বিরোধী কোন চিন্তা আসলে সূরা ইখলাছ পাঠ করে বাম দিকে তিনবার থুক মারবেন এবং আঊযুবিল্লাহ পাঠ করবেন। এছাড়া ‘আমানতু বিল্লাহ’ (আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি) বলতে পারেন’ (বুখারী হা/৭২৯৬; মুসলিম হা/১৩৪; মিশকাত হা/৭৫)।

এদের আক্বীদা ভ্রান্ত ফিরক্বা খারেজীদের আক্বীদার সাথে অধিক সামঞ্জস্যশীল। এই ভ্রান্ত মতবাদটি হিজরী ১ম শতকে বছরায় জন্মলাভ করে। আব্দুল্লাহ বিন ইবায আত-তামীমীর নামে মতবাদটির জন্ম হলেও আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ)-এর প্রখ্যাত ছাত্র জাবের বিন যায়েদ (২২-৯৩ হিঃ)-এর হাতেই মতবাদটি প্রসার লাভ করে। বর্তমান ওমানের ৮৭ ভাগ মুসলমানের মধ্যে ৭০ ভাগ এই মতবাদের অনুসারী। তাদের উল্লেখযোগ্য আক্বীদা হ’ল- (১) তাদের একদল আল্লাহর সকল গুণাবলীকে অস্বীকার করে। তাদের ধারণা মতে আল্লাহর গুণাবলীর দ্বারা আল্লাহকেই বুঝায়। কারণ আল্লাহ জানেন, বা শুনেন, বা দেখেন, বা ক্ষমতাবান বললে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য হয়। (২) তারা আল্লাহর উপরে থাকাকে এবং আরশের উপরে সমুন্নীত হওয়াকে অস্বীকার করে এবং বলে যে,আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান (যা কুরআন ও হাদীছের ঘোর বিরোধী)। (৩) তারা পরকালে জান্নাতীদের আল্লাহকে দেখার বিষয়কে অস্বীকার করে (৪) তাদের মতে কুরআন মাখলূক বা সৃষ্ট। এটি সরাসরি আল্লাহর বাণী নয় (৫) তাদের একদল লোক কবরের আযাবকে অস্বীকার করে (৬) তাদের মতে ক্বিয়ামতের দিন রাসূল (ছাঃ)-এর শাফা‘আত হবে শুধুমাত্র মুত্তাক্বীদের জন্য, পাপীদের জন্য নয়। (৭) তারা পুলছিরাত ও মীযানের পাল্লাকে অস্বীকার করে।(বিস্তারিত দ্রঃ ড. গালিব বিন আলী আল-‘এওয়াজী, ফিরাক্ব মু‘আছারাহ ১/১৮৮-১৯৩; মুছত্বাফা বিন মুহাম্মাদ, আল-উছূল ওয়া তারীখুল ফেরাক্বিল ইসলামিয়াহ, ১/২৪৪-২৭৬)।1 / ২44-২76)।1 / ২44-২76)।

রাসূল (ছাঃ) জিবরীল (আঃ)-কে স্বরূপে দেখেছেন দু’বার (মুসলিম হা/১৭৭)। প্রথমবার দেখেন মি‘রাজের পূর্বে মক্কার বাত্বহা উপত্যকায় ৬০০ ডানা বিশিষ্ট বিশাল অবয়বে। যাতে আসমান-যমীনের মধ্যবর্তী দিগন্ত বেষ্টিত হয়ে পড়ে (নাজম ৫৩/৫-১০, তাকভীর ৮১/২৩; তিরমিযী হা/৩২৭৮, ৩২৮৩; মিশকাত হা/৫৬৬১-৬২;)। দ্বিতীয়বার দেখেন মি‘রাজ রজনীতে (নাজম ৫৩/১৩-১৬, আলোচনা দ্রঃ ইবনু কাছীর, ঐ আয়াতের তাফসীর)। 

তিনি কখনো মানুষের রূপ ধারণ করে, আর কখনো স্বরূপে। যেমন প্রথম ‘অহী’ নাযিলের দিন হেরা গুহাতে তিনি মানুষের রূপ ধারণ করে এসেছিলেন (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৮৪১)। একবার রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের সামনে দেহ্ইয়া কাল্বীর রূপ ধারণ করে এসেছেন (বুখারী হা/৫০; মুসলিম হা/৮; নাসাঈ হা/৪৯৯১)। আরেকবার রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে পাশাপাশি বসা অবস্থায় আয়েশা (রাঃ) তাদেরকে দেখে সালাম প্রদান করেন (আহমাদ হা/২৩৭২৭, সনদ ছহীহ)। এছাড়া তিনি মারিয়াম (আঃ)-এর সামনে সুঠামদেহী একজন যুবকের রূপ ধারণ করে এসেছিলেন (মারিয়াম ১৯/১৭)।

উত্তর

শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে অস্বীকার করায় কাদিয়ানী সম্প্রদায় কাফের। চৌদ্দশ’ হিজরীর প্রথম দিকে গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর (১৮৩৫-১৯০৮) মাধ্যমে মুসলিমদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ সম্প্রদায় জন্মলাভ করে(পৃঃ ১১৮-২২)। গোলাম আহমাদ প্রথমে নিজেকে মুজাদ্দিদ ও ইমাম মাহদী দাবী করে। এরপর নিজেকে ঈসা ইবনু মারইয়াম এবং সবশেষে নিজেকে ‘নবী’ বলে দাবী করে। এমনকি মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর চেয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে (পৃঃ ১০৮)। 

নিম্নে তাদের কিছু আক্বীদা উল্লেখ করা হ’ল : (১) তারা বিশ্বাস করে যে, স্বয়ং আল্লাহ্ ছালাত আদায় করেন, ছওম পালন করেন, ঘুমান, জাগ্রত থাকেন, লিখেন, সঠিক করেন, ভুল করেন, স্ত্রীর সাথে মিলিত হন ইত্যাদি (পৃঃ ৯৭)। (২) তারা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে শেষনবী বলে স্বীকার করে না (পৃঃ ১০২)। (৩) তারা বিশ্বাস করে যে, গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী নবী ও রাসূলগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ (পৃঃ ১০৩, ১০৮)। (৪) তারা বিশ্বাস করে যে, গোলাম আহমাদের নিকট জিবরীল (আঃ) অহী নিয়ে আগমন করতেন (পৃঃ ১০৬)। (৫) যারা গোলাম আহমাদকে বিশ্বাস করে না তাদেরকে তারা ‘কাফির’ আখ্যা দিয়ে থাকে এবং তাদেরকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী মনে করে (পৃঃ ১২২)। (৬) তারা মুসলিমদের পিছনে ছালাত আদায় করাকে জায়েয মনে করে না এবং মুসলমানদের সাথে বিবাহ-শাদী হারাম মনে করে ও তাদের কবরস্থানে মুসলমানদের দাফন নিষিদ্ধ বলে’ (পৃঃ ৩৪, ৩৬-৩৭)। (৭) বৃটিশ প্রভুদের খুশী করার জন্য গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী তার বায়‘আত নামায় বলেন, যে ব্যক্তি ইংরেজ হুকুমতের আনুগত্য করে না, বরং তাদের বিরুদ্ধে মিছিল করে, সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়’ (পৃঃ ১২১-২২)। ইংরেজরা সবচেয়ে ভয় পায় মুসলমানদের জিহাদী জাযবাকে। তাই তিনি লেখেন, তোমরা এখন থেকে জিহাদের চিন্তা বাদ দাও। কেননা দ্বীনের জন্য যুদ্ধ হারাম হয়ে গেছে। এখন ইমাম ও মসীহ এসে গেছেন এবং আসমান থেকে আল্লাহর নূর অবতরণ করেছেন। অতএব কোন জিহাদ নেই। সুতরাং যারা এখন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে, তারা আল্লাহর শত্রু’ (পৃঃ ১১৯)। (৮) তাঁর লিখিত বই ‘আল-কিতাবুল মুবীন’-কে তারা কুরআনের ন্যায় মনে করে, যা বিশ পারায় সমাপ্ত এবং এর বিরোধী সবকিছুকে তারা বাতিল গণ্য করে (পৃঃ ১০৮, ১১৭)। (৯) তারা কাদিয়ান শহরকে মক্কা-মদীনার চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মনে করে এবং ঐ শহরের মাটিকে তারা ‘হারাম শরীফ’ বলে (পৃঃ ১১১-১২)। (১০) তারা তাদের দ্বীনকে পৃথক ও নতুন পরিপূর্ণ দ্বীন মনে করে। গোলাম আহমদের সাথীদেরকে ‘ছাহাবা’ এবং তার অনুসারীদের নতুন ‘উম্মত’ বলে(পৃঃ ১১০)। (১১) কাদিয়ানে তাদের বার্ষিক সম্মেলনকে ‘হজ্জ’ মনে করে (১১৬)। এছাড়াও তাদের বহু নিকৃষ্ট আক্বীদা রয়েছে (বিস্তারিত দ্রঃ ইহসান ইলাহী যাহীর, আল-ক্বাদিয়ানিয়াহ : দিরাসাত ও তাহলীল (রিয়াদ : ১৪০৪/১৯৮৪), পৃঃ ৯৪-১২৩; ১৫৪-৫৯)। 

গোলাম আহমাদের শেষ পরিণতি : অল ইন্ডিয়া আহলেহাদীছ কনফারেন্স-এর সেক্রেটারী ও সাপ্তাহিক ‘আখবারে আহলেহাদীছ’ পত্রিকার সম্পাদক আবুল অফা ছানাউল্লাহ্ অমৃতসরী (রহঃ) অনেকগুলি মুনাযারায় তাকে পরাজিত করেন। মাওলানা ছানাউল্লাহর আগুনঝরা বক্তৃতা ও ক্ষুরধার লেখনীতে অতিষ্ঠ হয়ে গোলাম আহমাদ ১৯০৭ সালের ১৫ই এপ্রিল তারিখে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে মাওলানা ছানাউল্লাহকে ‘মুবাহালা’ করার আহবান জানিয়ে বলেন, আমাদের দু’জনের মধ্যে যে মিথ্যাবাদী, তাকে যেন আল্লাহ সত্যবাদীর জীবদ্দশায় মৃত্যু দান করেন’। আল্লাহ মিথ্যুকের দো‘আ কবুল করেন এবং বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ১৩ মাস ১০ দিন পর ১৯০৮ সালের ২৬ মে কঠিন কলেরায় আক্রান্ত হয়ে নাক-মুখ দিয়ে পায়খানা বের হওয়া অবস্থায় এই ভন্ডনবী ন্যক্কারজনকভাবে লাহোরে নিজ কক্ষের টয়লেটে মৃত্যুবরণ করেন। অথচ মুবাহালা গ্রহণকারী সত্যসেবী আহলেহাদীছ নেতা আল্লামা ছানাউল্লাহ আমৃতসরী মৃত্যুবরণ করেন মিথ্যাবাদীর মৃত্যুর প্রায় ৪০ বছর পরে ১৯৪৮ সালের ১৫ই মার্চ তারিখে। ফালিল্লা-হিল হাম্দ।

কোন জিন বা মানুষের পক্ষে অতীত বা ভবিষ্যতের খবর জানা সম্ভব নয়। এসব খবর সম্পর্কে অবহিত দাবীকারী মিথ্যাবাদী বৈ কিছুই নয়। কেননা তা গায়েবের খবর। যা কেবলমাত্র আল্লাহই জানেন (নামল ১৭/৬৫, আন‘আম ৬/৫৯)। কোন ঈমানদার জিন বা মানুষ এসব জানার দাবী করতে পারে না। আর কারো নিকটে এসব জানতে চাওয়াও হারাম (আবুদাঊদ হা/৩৯০৪; মিশকাত হা/৪৫৯৯)। এমনকি যদি কেউ গণককে এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসাও করে, তাহ’লে তার চল্লিশ দিনের ছালাত কবুল হবে না’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৪৫৯৫)।

হিন্দু শ্বশুর-শাশুড়ীর বাড়ীতে পিতা-মাতার হক আদায়ের উদ্দেশ্যে গমন করায় বাধা নেই। তবে তা যেন তাদের ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে না হয়। কেননা ইসলামী শরী‘আতে অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে অংশগ্রহণ করা হারাম (ফুরকান ৭২; আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৪৩৪৭)। সেখানে তাদের যবেহকৃত পশু ও হারাম খাদ্য ব্যতীত অন্যান্য খাবার খাওয়া যাবে (বুখারী হা/২৬১৯-২০) এবং ছালাত আদায় করা যাবে (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৭৩৭)।

কুর্দীরা পশ্চিম এশিয়ার একটি নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী। জনসংখ্যা প্রায় পৌনে তিন কোটি। তুরস্ক, ইরাক, ইরান ও আর্মেনিয়ায় এদের আবাসস্থল। কুর্দি এদের প্রধান ভাষা। এদের অধিকাংশই (প্রায় ৯০%) সুন্নী মুসলিম এবং শাফেঈ মাযহাবের অনুসারী। কিছু সংখ্যক ছূফী, শী‘আ ও খৃষ্টান রয়েছে। বিভিন্ন দেশে তারা তাদের এলাকাসমূহকে ‘কুর্দিস্তান’ নামকরণ করলেও, তাদের কোন স্বাধীন রাষ্ট্র নেই। বায়তুল মুক্বাদ্দাস বিজয়ী প্রখ্যাত সেনানায়ক সুলতান ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী ছিলেন কুর্দী ভাষী। কুর্দীরা ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠী হওয়ায় তাদের আক্বীদা নিয়ে পৃথকভাবে কোন আলোচনার সুযোগ নেই।

অমুসলিম পিতা-মাতা, ভাই-বোনের সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা পিতা-মাতার সাথে সর্বাবস্থায় সদাচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন (লোকমান ৩১/১৫)। রাসূল (ছাঃ) আসমা (রাঃ)-কে তার অমুসলিম মায়ের সাথে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন (বুখারী হা/৩১৮৩, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯১৩)। এছাড়া আবু হুরায়রা (রাঃ) তার মুশরিক মাতার সাথেই বসবাস করতেন (মুসলিম হা/২৪৯১, মিশকাত হা/৫৮৯৫ ‘মু‘জেযাহ’ অনুচ্ছেদ)। তাদের রান্না করা খাবার খেতেও কোন বাধা নেই। কেননা রাসূল (ছাঃ) ইহূদী ও মুশরিক মহিলার বাড়ীতে খেয়েছেন ও পান করেছেন (বুখারী হা/৩৪৪, মিশকাত হা/৫৮৮৪, ৫৯৩১)। তবে তাদের যবেহকৃত প্রাণীর গোশত খাওয়া যাবে না (বাক্বারাহ ২/১৭৩; মায়েদাহ ৫/৩)। আর ভাই-বোনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। একদা রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে একটি কারুকার্য খচিত রেশম মিশ্রিত পোষাক আসলে তিনি তা ওমর (রাঃ)-কে প্রদান করলে তিনি তা মক্কায় অবস্থানকারী তার মুশরিক ভাইয়ের পরিধানের জন্য পাঠিয়ে দেন (বুখারী হা/৫৯৮১

এটি গোলামী যুগে এদেশে ইংরেজদের চালুকৃত একটি আদালতী পরিভাষা। এটি ইংল্যান্ডে সম্মানসূচক সম্বোধনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। যেমন Oxford ডিকশনারীতে বলা হয়েছে, My Lord : (in Britain) a title of respect used when speaking to a judge, bishop or some male members of the nobility (people of high social class). অর্থাৎ বৃটেনে ‘মাই লর্ড’ বলতে বিচারক, বিশপ এবং উচ্চ সামাজিক মর্যাদা সম্পন্ন পুরুষের প্রতি সম্মানসূচক সম্বোধনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়’। সুতরাং বিচারককে সম্মানসূচক সম্বোধনের ক্ষেত্রে ‘মাই লর্ড’ বলা ইংল্যান্ডের পরিভাষায় দোষণীয় নয়। লর্ড শব্দটি ইংরেজরা গড-এর ক্ষেত্রেও ব্যবহার করে থাকেন (ঐ)। অতএব এ জাতীয় দ্ব্যর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করা থেকে বেঁচে থাকাই উত্তম। এক্ষেত্রে ‘মহামান্য বা মাননীয় বা বিজ্ঞ আদালত’ বলা যেতে পারে।

মান্নান (অধিক দাতা) আল্লাহর গুণবাচক নামসমূহের মধ্যে অন্যতম, যা ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত (আবুদাউদ হা/১৪৯৫; তিরমিযী হা/৩৫৪৪; মিশকাত হা/২২৯০, সনদ ছহীহ)। তবে হান্নান (অধিক স্নেহশীল) আল্লাহর ছিফাতী নাম মর্মে যে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, তা যঈফ (আহমাদ হা/১৩৪৩৫; সিলসিলা যঈফাহ হা/১২৪৯)। তাই হান্নান নাম রাখায় বাধা নেই। আর ‘আল্লাহ’ হ’ল ইসমে যাত বা সত্তাগত নাম। এটিই আল্লাহর প্রকৃত নাম (আবুদাউদ হা/১৪৯৬, ৩৮৫৭; মিশকাত হা/২২৯১; যঈফাহ হা/৬১২৪-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)।

যায়েদ বিন ছাবিত (রাঃ) ছিলেন অহি লেখকগণের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য। সেকারণ কুরআন জমা করার সময় ওছমান (রাঃ) তাঁকেই এ গুরুদায়িত্ব প্রদান করেন (বুখারী হা/৪৬৭৯, ৪৯৭৯)। তিনি ব্যতীত আরো অনেক ছাহাবী বিভিন্ন সময়ে এ মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। যাদের সংখ্যা ২৬ থেকে ৪২ পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে। ইবনু কাছীর (রহঃ) এক্ষেত্রে ২৫ জন ছাহাবীর নাম উল্লেখ করেছেন। তারা হ’লেন (১) হযরত আবুবকর (২) ওমর (৩) ওছমান (৪) আলী (৫) আবান বিন সাঈদ ইবনুল আছ (৬) উবাই বিন কা‘ব (৭) যায়েদ বিন ছাবেত (৮) খালেদ বিন সাঈদ ইবনুল ‘আছ (৯) মু‘আয বিন জাবাল (১০) আরক্বাম বিন আবুল আরক্বাম (১১) ছাবেত বিন ক্বায়েস বিন শাম্মাস (১২) হানযালা বিন রবী‘ (১৩) ও তার ভাই রাবাহ (১৪) ও চাচা আকছাম বিন ছায়ফী (১৫) খালেদ বিন ওয়ালীদ (১৬) যুবায়ের ইবনুল ‘আওয়াম (১৭) আব্দুল্লাহ বিন সা‘দ বিন আবী সারাহ (১৮) ‘আমের বিন ফুহায়রাহ (১৯) আব্দুল্লাহ বিন আরক্বাম (২০) আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ বিন আব্দে রবিবহি (২১) ‘আলা ইবনুল হাযরামী (২২) ‘আলা বিন উক্ববাহ (২৩) মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহ (২৪) মু‘আবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (২৫) মুগীরাহ বিন শো‘বা (রাঃ) (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৫/৩৩৯-৩৫৫)।

প্রশ্নঃ মোযা টাখনুর উপর পর্যন্ত পরা থাকলে প্যান্ট টাখনুর নীচে পরা যাবে কি?

উত্তর
যাবে না। কারণ উভয়ের বিধান পৃথক। শরী‘আতে মোযা পরিধান সিদ্ধ (তিরমিযী হা/২৮২০; মিশকাত হা/৪৪১৮)। কিন্তু টাখনুর নীচে কাপড় পরা হারাম। টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরলে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে তাকাবেন না, তার সাথে কথা বলবেন না এবং তাকে (গোনাহ থেকে) পবিত্রও করবেন না (মুসলিম, মিশকাত হা/২৭৯৫, ‘ক্রয়-বিক্রয়’ অধ্যায়)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন টাখনুর নীচে কাপড় যতটুকু যাবে, ততটুকু জাহান্নামে পুড়বে’ (বুখারী, মিশকাত হা/৪৩১৪)। অতএব সর্বাবস্থায় এ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।

ফেরেশতাগণের নামগুলি কুরআন এবং ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। জিবরীল এবং মীকাঈলের নাম কুরআনে বর্ণিত হয়েছে (বাক্বারাহ ৯৮)। কুরআনে মীকাল আসলেও হাদীছে মীকাঈল শব্দে এসেছে (বুখারী হা/৩২৩৬)। এছাড়া ইসরাফীলের নাম হাদীছে পাওয়া যায় (মুসলিম হা/৭৭০, মিশকাত হা/১২১২)। আর যে ফেরেশতা জান কবয করেন তার নাম মালাকুল মাঊত (সাজদাহ ১১)। ক্বিয়ামতের প্রাক্কালে যিনি সিংগায় ফুঁক দিবেন তার নাম ইসরাফীল (ইবনু কাছীর, সূরা বাক্বারাহ ৯৮ আয়াতের ব্যাখ্যা)। যারা কবরে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তাদের নাম মুনকার এবং নাকীর (তিরমিযী, মিশকাত হা/১৩০)। আব্দুর রহমান বিন সাবাত্ব বলেন, দুনিয়াবী কর্মসমূহ পরিচালনা করেন চার জন ফেরেশতা। জিব্রীল, মীকাঈল, মালাকুল মাঊত যার নাম আযরাঈল এবং ইস্রাফীল (কুরতুবী, তাফসীর সূরা নাযে‘আত ৭৯/৫)। তিনি বলেন, মালাকুল মউতের নাম হ’ল আযরাঈল। যার অর্থ আব্দুল্লাহ (কুরতুবী, শাওকানী, আয়সারুত তাফাসীর, তাফসীর সূরা সাজদাহ ৩২/১১)। তবে আলবানী (রহঃ) বলেন, ‘মালাকুল মাঊত’ কুরআনে বর্ণিত নাম। কিন্তু মানুষের মাঝে প্রচলিত তার ‘আযরাঈল’ নামকরণের কোন শারঈ ভিত্তি নেই। এটা ইসরাঈলী বর্ণনা মাত্র (আলবানী, তা‘লীক্ব ‘আলাত তাহাবী পৃঃ ৭২)।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও ছালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর’ (বাক্বারাহ ৪৫)। এর অর্থ হ’ল- আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাক্বদীরের উপর ভরসা করে যেকোন বিপদ ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করা। কেননা বিপদে ধৈর্যধারণের মাধ্যমেই ভবিষ্যত সফলতার পথ উন্মোচিত হয়। দ্বিতীয়তঃ ছালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করা। কেননা রাসূল (ছাঃ) যখন কোন বিষয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তেন, তখন তিনি নফল ছালাতে দন্ডায়মান হ’তেন (আবুদাঊদ হা/১৩১৯, মিশকাত হা/১৩২৫, সনদ হাসান)। বদর যুদ্ধের দিন তিনি ছালাত ও ক্রন্দনের মাধ্যমে সারা রাত অতিবাহিত করেন (আহমাদ হা/১০২৩, ইবনু হিববান হা/২২৫৭, সনদ ছহীহ)। মিসর গমনকালে ইবরাহীম (আঃ)-এর স্ত্রী সারা সেদেশের বাদশাহ কর্তৃক অপহৃত হলে ইবরাহীম (আঃ) তাকে আল্লাহর যিম্মায় ছেড়ে দিয়ে ছালাতের মাধ্যমে স্ত্রীর ইয্যতের হেফাযতের জন্য আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী সারাও ছালাতে রত হয়ে আল্লাহর নিকটে আশ্রয় চেয়েছিলেন। তাতে ঐ লম্পটের হাত-পা অবশ হয়ে গিয়েছিল’ (বুখারী হা/২২১৭; ‘ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ২৬২ পৃঃ)। মূলতঃ ছালাতের মাধ্যমেই বান্দা আল্লাহর সর্বাধিক নৈকট্য লাভ করে। সেকারণ বিপদ মুহূর্তে বা কোন সফলতা লাভের আশায় ধৈর্য ও ছালাতের মাধ্যমেই আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে।

উক্ত বক্তব্যটি আল্লাহর বাণী দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ বলেন, তোমার যে কল্যাণ হয়, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। আর যে অকল্যাণ হয়, তা তোমার (আমলের) কারণে হয় (নিসা ৪/৭৯)। অর্থাৎ আল্লাহ সব সময় বান্দার মঙ্গল করেন। কিন্তু বান্দা ভুলক্রমে বা ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেই নিজের অকল্যাণ করে থাকে। আল্লাহ তাতে বাধা দেন না বান্দার স্বাধীন ইচ্ছা শক্তিকে অব্যাহত রাখার স্বার্থে। তাই যে ভাল কর্ম করবে সে নে‘মত লাভ করবে। আর যে অন্যায় করবে সে বিপদে পতিত হবে (ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৮/২৩৯)। তবে এটাও তাক্বদীর অনুযায়ী হয়ে থাকে, যা পূর্বেই নির্ধারিত ছিল। 

প্রকৃত ঈমানদারের জন্য ভাল-মন্দ উভয়টিই কল্যাণকর হয়ে থাকে। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেন, মুমিনের ব্যাপারটি কতই না বিস্ময়কর! তার সমস্ত কাজই তার জন্য কল্যাণকর।... যদি তার কোন মঙ্গল স্পর্শ করে, সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। এটা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি তার কোন মন্দ স্পর্শ করে, সে ছবর করে। আর এটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়’ (মুসলিম হা/২৯৯৯; মিশকাত হা/৫২৯৭)।

ইসলাম গ্রহণের সময় কেবল কালেমা শাহাদাত ‘আশহাদু আল লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান ‘আবদুহূ ওয়া রাসূলুহু’ পাঠ করাই যথেষ্ট। ছুমামা বিন উছাল, যিমাদ আযদী প্রমুখ ইসলাম গ্রহণকালে এই কালেমাই পাঠ করেছিলেন (মুসলিম হা/১৭৬৪, ৮৬৮; মিশকাত হা/৩৯৬৪, ৫৮৬০)। বাকী কালেমাগুলি যেকোন সময় পাঠ করা যায়।

ঈসা (আঃ) দ্বিতীয় আসমানে জীবিত আছেন (আলে ইমরান ৩/৫৫, নিসা ৪/১৫৭; বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫৮৬২)। তিনি দামেশকের পূর্বপ্রান্তের শ্বেত মিনার হ’তে হলুদ বর্ণের দু’টি পোষাক পরিহিত অবস্থায় দু’জন ফেরেশতার পাখায় ভর করে অবতরণ করবেন।... অতঃপর তিনি বায়তুল মুক্বাদ্দাসের ‘লুদ্দ’ দরজার নিকটে ‘দাজ্জাল’কে হত্যা করবেন।... অতঃপর আল্লাহ ‘ইয়াজূজ-মা’জূজ’কে পাঠাবেন। তারা প্রত্যেকে উঁচু জায়গা থেকে বের হয়ে দ্রুত বেগে নীচে চলে আসবে (আম্বিয়া ২১/৯৬)।... তারা সামনে যাকে পাবে, তাকেই হত্যা করবে।... তখন ঈসা ও তাঁর ঈমানদার সাথীগণ আল্লাহর নিকট দো‘আ করবেন। ফলে আল্লাহর পক্ষ হতে গযব অবতীর্ণ হয়ে ‘ইয়াজূজ-মা’জূজ’ সব ধ্বংস হয়ে যাবে।... 

ঈসা (আঃ) ইসলামী শরী‘আত অনুযায়ী পৃথিবীতে ইনছাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন। শূকর হত্যা করবেন। জিযিয়া বিলুপ্ত করবেন (কারণ তখন সবাই মুসলমান হবে (নিসা ৪/১৫৯)। সে সময় সম্পদের এমন প্রাচুর্য হবে যে, তা নেবার মত লোক পাওয়া যাবে না’... (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫৫০৫)। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, মানুষের মন থেকে কৃপণতা, হিংসা ও বিদ্বেষ দূর হয়ে যাবে’।... তখন মুসলমানদের মধ্য থেকে ইমাম মাহদী ইমাম হবেন এবং ঈসা হবেন মুক্তাদী। এটি হবে উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে প্রদত্ত বিশেষ সম্মান’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৫৫০৬-০৭)। মাহদী রাসূল (ছাঃ)-এর বংশধর হবেন’ (তিরমিযী, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৫৪৫২-৫৩)। তিনি সাত বছর দুনিয়ায় অবস্থান করবেন’ (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৫৪৫৪)। ঈসা (আঃ)ও দুনিয়াতে সাত বছর অবস্থান করবেন’ (মুসলিম হা/২৯৪৩)। ঊর্ধ্বারোহনের পূর্বের ৩৩ বছর এবং দুনিয়ায় অবতরণের পরের ৭ বছর মিলে তাঁর বয়স হবে মোট ৪০ বছর। তারপর তিনি মৃত্যুবরণ করবেন। মুসলমানগণ তাঁর জানাযার ছালাত আদায় করবে (আবুদাঊদ শরহ ‘আউনুল মা‘বূদ সহ হা/৪৩২৪, ছহীহাহ হা/২১৮২)। এ সময় মানুষ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করবে। হঠাৎ একদিন স্নিগ্ধ বায়ু প্রবাহিত হবে। তাতে সকল ঈমানদার মানুষ মৃত্যুবরণ করবে। কেবল পাপী লোকেরাই অবশিষ্ট থাকবে। যারা গাধার ন্যায় পরস্পর দ্বন্দ্ব-কলহে লিপ্ত হবে। অতঃপর তাদের উপরেই ক্বিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে (মুসলিম, মিশকাত হা/৫৪৭৫)।

উক্ত মর্মের বর্ণনাটি জাল। ইমাম যাহাবী, ইবনু তায়মিয়াহ, ইবনু হাজার, আলবানী সকলেই এ ব্যাপারে একমত (হাকেম হা/৪২২৮, সিলসিলা যঈফাহ হা/২৫)।

উত্তর

এরূপ অবস্থায় ‘খোলা’ করে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। কারণ যথাযোগ্য কারণে স্বামী থেকে ‘খোলা’ করা অর্থাৎ মোহর ফিরিয়ে দিয়ে বিচ্ছিন্ন হওয়া শরী‘আতসম্মত (বুখারী হা/৫২৭৩; মিশকাত হা/৩২৭৪)। মাযহাবী ভাইদের অনেকের মধ্যে গুরুতর সমস্যা রয়েছে। যেমন (১) আক্বীদাগত দিক থেকে তাদের নিকটে আল্লাহ ‘নিরাকার’। (২) তাদের মতে শেষনবী (ছাঃ) ‘নূরের তৈরী’ এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেননি। (৩) তারা মৃত পীরের অসীলায় আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেন এবং কবর পূজা করেন। (৪) তাদের মতে পীর-আউলিয়ারা কবরে যিন্দা থাকেন ও ভক্তের আহবান শোনেন। (৫) তারা ছহীহ তরীকায় ছালাত আদায় করেন না। (৬) তারা একসাথে তিন তালাককে তিন তালাক বায়েন গণ্য করেন এবং (৭) হিল্লা করাকে জায়েয বলেন ইত্যাদি।

উত্তর

খাৎনা করা মুস্তাহাব। জনৈক ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বলেন, তুমি কুফরীর চুল ফেলে দাও এবং খাৎনা কর (আবুদাঊদ হা/৩৫৬, সনদ হাসান, ইরওয়া হা/৭৯)। খাৎনা করা মানুষের ফিৎরাত বা স্বভাবজাত পাঁচটি বিষয়ের অন্যতম (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৪৪২০ ‘পোষাক’ অধ্যায় ‘চুল অাঁচড়ানো’ অনুচ্ছেদ)। এটি ইসলাম ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য স্বরূপ। এর মধ্যে যে স্বাস্থ্যগত কল্যাণ নিহিত রয়েছে, সে বিষয়ে সকল স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী একমত। ইবরাহীম (আঃ) ৮০ বছর বয়সে আল্লাহর হুকুমে খাৎনা করেছিলেন (বুখারী হা/৩৩৫৬)।

এরূপ অবস্থায় ‘খোলা’ করে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। কারণ যথাযোগ্য কারণে স্বামী থেকে ‘খোলা’ করা অর্থাৎ মোহর ফিরিয়ে দিয়ে বিচ্ছিন্ন হওয়া শরী‘আতসম্মত (বুখারী হা/৫২৭৩; মিশকাত হা/৩২৭৪)। মাযহাবী ভাইদের অনেকের মধ্যে গুরুতর সমস্যা রয়েছে। যেমন (১) আক্বীদাগত দিক থেকে তাদের নিকটে আল্লাহ ‘নিরাকার’। (২) তাদের মতে শেষনবী (ছাঃ) ‘নূরের তৈরী’ এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেননি। (৩) তারা মৃত পীরের অসীলায় আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেন এবং কবর পূজা করেন। (৪) তাদের মতে পীর-আউলিয়ারা কবরে যিন্দা থাকেন ও ভক্তের আহবান শোনেন। (৫) তারা ছহীহ তরীকায় ছালাত আদায় করেন না। (৬) তারা একসাথে তিন তালাককে তিন তালাক বায়েন গণ্য করেন এবং (৭) হিল্লা করাকে জায়েয বলেন ইত্যাদি।

উত্তর

এগুলি নিতান্তই নীতি-বহির্ভূত কাজ। শরী‘আতের বিষয়বস্ত্তসমূহ নিয়ে এরূপ করা খেল-তামাশার শামিল। যা আখেরাতে চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ (লোকমান ৩১/৬)। বরং এভাবে টাকার চ্যালেঞ্জ দেওয়া জুয়ার পর্যায়ভুক্ত কাজ, যা হারাম (মায়েদাহ ৫/৯০)। অতএব এসব থেকে দূরে থাকা আবশ্যক। এক্ষেত্রে শরী‘আতসম্মত পন্থা হ’ল আন্তরিকতার সাথে সংশোধনের উদ্দেশ্যে একে অপরের ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং নিজেকে সংশোধন করা। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক কর সুন্দর পন্থায়। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক ভালভাবেই জানেন কে তার পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তিনি ভালভাবেই জানেন কে সুপথপ্রাপ্ত হয়েছে’ (নাহল ১৬/১২৫)।

উত্তর

এভাবে খাওয়ানোর মাধ্যমে আল্লাহ বর-কনের মধ্যে অধিক ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিবেন বলে যদি কোন আক্বীদা থাকে, তবে তা জায়েয নয়। বরং কুসংস্কার মাত্র। তবে সাধারণভাবে এরূপ খাওয়ায় কোন বাধা নেই। রাসূল (ছাঃ) ও আয়েশা (রাঃ) একই পাত্রের একই স্থানে মুখ রেখে পানি পান করেছেন (মুসলিম, মিশকাত হা/৫৪৭)।

উত্তর

রাসূল (ছাঃ) মৃত্যুবরণ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে’ (আলে ইমরান ৩/১৮৫)। তিনি স্বীয় রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই তুমি মৃত্যুবরণ করবে। যেমন তারা (বিগত নবীরা) মৃত্যুবরণ করেছে’ (যুমার ৩৯/৩০)। ৬৩ বছর বয়সে রাসূল (ছাঃ) মৃত্যুবরণ করার পর আবুবকর (রাঃ) বলেছিলেন, ‘যারা মুহাম্মাদ-এর ইবাদত করে তারা জেনে রাখুক যে, মুহাম্মাদ মারা গেছেন। আর যারা আল্ল¬াহর ইবাদত করে, তারা জেনে রাখুক যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি অমর’ (বুখারী হা/৩৬৬৮)। 

উল্লেখ্য, কেউ কেউ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট উম্মতের দরূদ ও সালাম পৌঁছানো হয়(নাসাঈ; মিশকাত হা/৯২৪) দ্বারা তাঁর জীবিত থাকার প্রমাণ পেশ করেন। অথচ এখানে সালাম অর্থ দো‘আ। চাই তা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে হৌক বা দূর থেকে হৌক। দ্বিতীয়তঃ বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে বারযাখী জীবনের অন্তর্ভুক্ত। যেখানে মানুষের হায়াত বা মঊত বলে কিছু নেই। তাই রূহ ফেরত দেওয়ার অর্থ তাঁকে অবহিত করানো এবং তিনি তা বুঝতে পারেন। আর সেটাই হ’ল তাঁর উত্তর দেওয়া (মির‘আত হা/৯৩১-এর ব্যাখ্যা, ৪/২৬২-৭৪)। 

বারযাখী জীবন দুনিয়াবী জীবনের সাথে তুলনীয় নয়। অতএব এ হাদীছগুলির মাধ্যমে ‘হায়াতুন্নবী’ প্রমাণের কোন অবকাশ নেই। বরং এটা পরিষ্কারভাবে শিরকী আক্বীদা। এছাড়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কবরের নিকটে গিয়ে দরূদ পাঠ করলে তিনি শুনতে পান মর্মে বায়হাক্বী বর্ণিত হাদীছটি ‘জাল’ (সিলসিলা যঈফাহ হা/২০৩)। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই তুমি শুনাতে পারো না কোন মৃত ব্যক্তিকে’ (নামল ২৭/৮০)। আর ‘তুমি শুনাতে পারো না কোন কবরবাসীকে’ (ফাত্বির ৩৫/২২)।

উত্তর

স্রেফ উপদেশ হাছিলের জন্য এসব স্থানে গমন করা যায়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর, অতঃপর দেখ মিথ্যারোপকারীদের পরিণতি কেমন হয়েছে’?(আন‘আম ৬/১১)।

উত্তর

স্বামী ছহীহ হাদীছের উপর আমল করতে বাধা দিলে স্বামী গোনাহগার হবে। এমতাবস্থায় স্ত্রীর করণীয় হ’ল স্বামীকে সদুপদেশ দেয়া এবং ছহীহ হাদীছের উপর আমল করতে উৎসাহিত করা। আর এক্ষেত্রে রাগান্বিত না হয়ে সাধ্যমত সদাচরণের মাধ্যমে তাকে বুঝানো এবং তার হেদায়াতের জন্য আল্লাহরর নিকট বেশী বেশী দো‘আ করা। এরপরেও না বুঝলে স্বামী স্ত্রীর তার ধর্মীয় কাজে বাধা দেওয়ার অধিকার রাখে না। কারণ সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতায় সৃষ্টির প্রতি কোন আনুগত্য নেই’ (শারহুস সুন্নাহ, মিশকাত হা/৩৬৯৬)।

উত্তর

সকল আসমানী কিতাব আরবী ভাষায় নাযিল হয়নি। আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক রাসূলকে তার স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছেন, তাদেরকে আল্লাহ্র বিধান সমূহ ব্যাখ্যা করে বুঝাবার জন্য’ (ইবরাহীম ৪; আহমাদ হা/২১৪৪৮, ছহীহাহ হা/৩৫৬১)। সুতরাং তাদের নিকটে প্রেরিত কিতাবসমূহ সেই জাতির ভাষাতেই প্রেরণ করেছেন। যেমন তাওরাত হিব্রু ভাষায়, ইঞ্জীল সুরিয়ানী এবং কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে (ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৬/৫২২)

উত্তর

অমুসলিমের জন্য আরবী মূল কুরআন স্পর্শ করা জায়েয নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, পবিত্র ব্যতীত কেউ কুরআন স্পর্শ করবে না (ত্বাবারাণী, ছহীহুল জামে‘ হা/৭৭৮০)। এটা ছোট ও বড় উভয় পবিত্রতাকে শামিল করে। আর অমুসলিমরা উভয় দিক দিয়েই অপবিত্র। তবে অমুসলিমদের জন্য কুরআন শ্রবণ, কুরআনের তাফসীর বা অনুবাদ সহ কুরআন স্পর্শ করে পড়ায় বাধা নেই (মাজমূ‘ ফাতাওয়া বিন বায ২৪/৩৪০)। নিঃসন্দেহে তাকে পূর্ণ সম্মান বজায় রেখে স্পর্শ করতে হবে।

তাক্বদীর শব্দটির অর্থ নির্ধারণ করা বা অনুমান করা। শারঈ পরিভাষায় তাক্বদীর হ’ল, আল্লাহ কর্তৃক বান্দার ভবিষ্যত নির্ধারণ করা। আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক মানুষের তাক্বদীর লিপিবদ্ধ করেছেন আসমান-যমীন সৃষ্টির ৫০ হাযার বছর পূর্বে এবং তিনি যার ভাগ্যে যা লিপিবদ্ধ করেছেন তাই ঘটবে (ছহীহ মুসলিম, মিশকাত হা/৭৯)। তাক্বদীর সম্পূর্ণ গোপনীয় বিষয়। আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং তাক্বদীরের জ্ঞান তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে গোপন রেখেছেন। এজন্য রাসূল (ছাঃ) এ প্রসঙ্গে অহেতুক বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে নিষেধ করেছেন(তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মিশকাত হা/৯৮)। একদিন ছাহাবায়ে কেরাম তাকে কেবল তাক্বদীরের উপর ভরসা করে সকল আমল ছেড়ে দেওয়ার আবেদন জানালে রাসূল (ছাঃ) বললেন, তোমরা সৎকর্ম করে যাও। কেননা যাকে যেজন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার পক্ষে সে কাজ সহজসাধ্য হবে। যারা সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত, তাদের জন্য সেরূপ আমল এবং যারা দুর্ভাগাদের অন্তর্ভুক্ত তাদের জন্য সেরূপ আমল সহজ করে দেওয়া হয়েছে (বুখারী হা/৪৯৪৯)। 

‘তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাস’ মুমিনের মৌলিক ও অপরিহার্য ছয়টি আক্বীদার অন্তর্ভুক্ত। তাক্বদীর একটি গায়েবী বিষয়, যার রহস্য মহান আল্লাহ ব্যতীত কেউ অবগত নন। এজন্য সাধারণভাবে বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে, যেমন একজন লোকের সামনে ফলের রস ভর্তি গ্লাস রাখা রয়েছে। সে ইচ্ছা করলে তা পান করতে পারে, নাও পারে। অর্থাৎ সে পান করতে বাধ্য নয়। অতঃপর যদি সে পান করে, তবে তা আল্লাহর জ্ঞানে পূর্ব থেকেই রক্ষিত রয়েছে। আবার যদি পান না করে, তবুও তা আল্লাহর জ্ঞানে আগে থেকেই রক্ষিত আছে। যদি বলা হয় এর ব্যাখ্যা কি? এর জবাব এতটুকুই দেওয়া যায় যে, অসীম জ্ঞানের অধিকারী মহান আল্লাহর সৃষ্টি রহস্য মানুষের স্বল্পজ্ঞান দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। মানুষের সৎ-অসৎ যাবতীয় কর্মের ক্ষেত্রেও অনুরূপ বক্তব্যই প্রযোজ্য। একজন পাপাচারী পাপকর্মের দিকে প্রবৃত্ত হয় এবং নিজ হাতে তা বাস্তবায়ন করে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, নিজ ইচ্ছা ও ক্ষমতা প্রয়োগ করে সে পাপাচারে লিপ্ত হচ্ছে। কিন্তু একই সাথে আল্লাহর জ্ঞান বা পূর্বনির্ধারণ থেকে বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা তার নেই। এটা আল্লাহ তা‘আলার অপরিসীম ক্ষমতা ও হিকমতের বহিঃপ্রকাশ। এক্ষণে বান্দা যেহেতু নিজের তাক্বদীর জানে না, সেহেতু তাকে মন্দ কর্ম হ’তে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে হবে এবং সর্বদা আল্লাহর বিধান মেনে কাজ করে সুন্দর পরিণতি লাভের চেষ্টা করতে হবে। তার সাধ্যমত চেষ্টার পরেও যেটা ঘটবে, বুঝতে হবে সেটাই ছিল তার তাক্বদীরের লিখন। 

মূলতঃ আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করে বিবেক-বুদ্ধি দান করে, ভালো আর মন্দ দু’টি পথ দেখিয়ে এক মহাপরীক্ষার মধ্যে ফেলেছেন। আর ভালো পথের জন্য জান্নাত আর মন্দ পথের জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করে রেখেছেন। ফলে বিবেক দিয়ে নিজ স্বাধীনতাকে ব্যবহার করে মানুষ এ পৃথিবীতে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত যা কিছু করবে, আল্লাহ তাঁর অগ্রিম জ্ঞানে সেগুলোর সব কিছু সম্পর্কে জানেন এবং সেগুলোই তিনি লিখে রেখেছেন। 

স্মর্তব্য যে, আল্লাহ তাক্বদীরের মন্দকে পরিবর্তন করে দিতে পারেন। তিনি তাক্বদীরের ভাল-মন্দকে ইচ্ছা করলে মিটিয়ে দিতে পারেন এবং বহালও রাখতে পারেন (রা‘দ ৩৯)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘মানুষ পাপকর্মের কারণে রূযী থেকে বঞ্চিত হয়। দো‘আর মাধ্যমে তাক্বদীর পরিবর্তন হয় এবং নেকীর মাধ্যমে বয়স বৃদ্ধি পায় (নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, হা/৪৯২৪; মিশকাত হা/৪৯২৫)। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি স্বীয় জীবিকায় প্রশস্ততা ও মৃত্যুতে বিলম্ব কামনা করে, সে যেন আত্মীয়-স্বজনের সাথে উত্তম ব্যবহার করে’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯১৮)। 

কেউ কেউ ‘ভাগ্যে যা আছে তাই হবে, আমার কিছু করার নেই’ বলে নিজেকে বিভ্রান্তির পথে টেনে নিয়ে যায়। অথচ দুনিয়ায় তারা না খেয়ে বসে থাকে না, পরীক্ষার জন্য প্রস্ত্ততি না নিয়ে পরীক্ষা দেয় না, পিপাসা লাগলে পানি না খেয়ে ভরসা করে না। অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী জীবনের জন্য তারা ভাগ্যের উপর ভরসা না করে চেষ্টা করে। কিন্তু যত ভরসা কেবল চিরস্থায়ী জীবনের ক্ষেত্রেই করে! এরূপ অপযুক্তির মাধ্যমে মানুষ কেবল নিজেকে ধ্বংসেই নিক্ষেপ করে। ভ্রান্ত ফের্কা অদৃষ্টবাদী জাবরিয়াগণ এরূপ ভেবে থাকেন। অথচ আল্লাহ বান্দার তাক্বদীর জানেন। কিন্তু বান্দা তা জানেনা। তাই তাকে সাধ্যমত আল্লাহর পথে কাজ করে যেতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘বান্দা কেবল সেটাই পায়, যেটার জন্য সে চেষ্টা করে’(নাজম ৫৩/৩৯)।

উত্তর

ইমাম আবু হানীফা (৮০-১৫০হিঃ) কোন গ্রন্থ রচনা করে যাননি। যদি ‘ফিক্বহে আকবর’ ও ‘মুসনাদে আবু হানীফা’-কে তাঁর কিতাব হিসাবে গণ্য করা হয়, তাহ’লে বলা হবে যে, প্রথমোক্ত ছোট পুস্তকটি ছিল আক্বায়েদের উপর লিখিত এবং শেষোক্তটি ছিল হাদীছের সংক্ষিপ্ত সংকলন (আহলেহাদীছ আন্দোলন (থিসিস), পৃঃ ১৭১)। পরবর্তীকালে যেসব ফিক্বহ ও উছূলে ফিক্বহ রচিত হয়েছে, সবই পরবর্তীগণের রচিত (দিরাসাতুল লাবীব, পৃঃ ১৫৬)। শাহ অলিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) এগুলোকে ইমাম আবু হানীফার দিকে সম্বন্ধ করার বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করেছেন (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ১/১৬০)। এক্ষণে যেসব গ্রন্থসমূহকে হানাফী মাযহাবের মূল ফৎওয়া গ্রন্থ হিসাবে গণ্য করা হয়, সেগুলি হ’ল- (১) কুদূরী, আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বাগদাদী (মৃঃ ৪২৮ হিঃ)। সংকলনকাল : ৫ম শতাব্দী হিঃ। (২) হেদায়াহ, বুরহানুদ্দীন মারগীনানী (মৃঃ ৫৯৩ হিঃ)। সংকলনকাল : ৬ষ্ঠ শতাব্দী হিঃ। (৩) কানযুদ দাক্বায়েক্ব, হাফেযুদ্দীন নাসাফী (মৃঃ ৭১০ হিঃ)। সংকলনকাল : ৮ম শতাব্দী হিঃ। (৪) শরহ বেকায়াহ, ওবায়দুল্লাহ বিন মাসঊদ (মৃঃ ৭৪৫ হিঃ)। সংকলনকাল : ৮ম শতাব্দী হিঃ। (৫) দুর্রে মুখতার, মুহাম্মাদ আলাউদ্দীন (মৃঃ ১০৭১ হিঃ)। সংকলনকাল : ১১শ শতাব্দী হিঃ। (৬) ফাতাওয়া আলমগীরী, পাঁচশত আলেম। সংকলনকাল ১১১৮ হিঃ। (৭) মা লা বুদ্দা মিনহু, কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথী (মৃঃ ১২২৫ হিঃ)। সংকলনকাল : ১৩শ শতাব্দী হিঃ। এগুলো উপমহাদেশে সর্বাধিক প্রচলিত। 

এছাড়াও অন্যান্য গ্রন্থ রয়েছে। যেমন : (৮) আলাউদ্দীন কাসানী (মৃত্যু ৫৮৭ হিঃ) কর্তৃক রচিত গ্রন্থ ‘বাদায়ে‘উস সানায়ে‘। (৯) যাফর ইবনু আহমাদ ইবনু লতীফ উছমানী (মৃঃ ১৩৯৪ হিঃ) প্রণীত ‘ই‘লাউস সুনান’। তবে ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর মৃত্যুর দীর্ঘদিন পরে রচিত উক্ত কিতাব সমূহের সাথে ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর কোন সম্পর্ক নেই।

শী‘আদের ইছনা ‘আশারিয়া ফেরকা থেকে বের হওয়া এই গোষ্ঠীটির আক্বীদা কুফরীর পর্যায়ভুক্ত। তাদের প্রধান আক্বীদাগুলি হ’ল : (১) এরা বিশ্বাস করে যে, আলী (রাঃ) তাদের প্রভু। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, তাকে কেউ জন্ম দেয়নি। তিনি মারা যাননি, তিনি পানাহার করেন না। (২) তারা খ্রিষ্টানদের ন্যায় ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করে। তাদের মতে, আলীর মধ্যে আল্লাহ প্রবেশ করেছেন। অতঃপর আলী মুহাম্মাদকে সৃষ্টি করেছেন, মুহাম্মাদ সৃষ্টি করেছেন সালমান ফারেসীকে, আর সালমান ফারেসী সৃষ্টি করেছেন পঞ্চ ইয়াতীমকে, যাদের হাতে রয়েছে আসমান-যমীনের নিয়ন্ত্রণ। তারা হ’লেন, মিকদাদ, আবু যর গিফারী, আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা, উছমান বিন মায‘উন ও কুন্বর বিন কাদান (ইনি মানুষের শরীরে রূহ সঞ্চারকারী)। (৩) তারা মনে করে যে, মৃত্যুর পর আলী-এর রূহ মেঘমালায় অবস্থান করছে। সেজন্য তারা মেঘকে সালাম দেয় এবং বিশ্বাস করে যে, মেঘের গর্জন আলী (রাঃ)-এর ধমক এবং বিদ্যুতের চমক তার চাবুকের আঘাত। (৪) তারা হজ্জব্রত পালন করে না। বরং একে কুফরী এবং মূর্তিপূজা বলে আখ্যায়িত করে (৫) তারা মানুষের পুনর্জন্মে বিশ্বাসী। ফলে কিয়ামত, পরকাল, প্রতিদান ও হিসাব-নিকাশকে তারা অস্বীকার করে (ড. গালিব বিন আলী ইওয়াজী, ফিরাক্ব মু‘আছারাহ ২/৫৬১-৬৩)। এদের সম্পর্কে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, এরা ইহুদী-নাছারাদের চেয়েও এমনকি মূর্তিপূজক হিন্দুদের চেয়েও বড় কাফের। এরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধরত তাতার ও ফিরিঙ্গী যোদ্ধাদের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর। অতীতে বাগদাদের ইসলামী খেলাফত কেবল তাদের সহযোগিতার কারণেই তাতারদের হাতে ধ্বংস হয়েছিল(ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৩৫/১৪৯-১৫০)। 

(এদের বর্তমান ভূমিকা বিস্তারিত জানার জন্য পাঠ করুন ‘তাওহীদের ডাক’ পত্রিকা, সেপ্টে-অক্টো’১৩ পৃঃ ৩০-৩৭)।

কুরআন ও ছহীহ হাদীছে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের ক্ষেত্রে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, সেগুলিকে সহজে বুঝানোর স্বার্থে তাওহীদকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। যার কোন একটির প্রতি অবিশ্বাস করলে ঈমানশূন্য হ’তে হবে। যেমন (১) তাওহীদে রুবূবিয়াত বা আল্লাহকে স্রষ্টা হিসাবে বিশ্বাস করা। দলীল : আ‘রাফ ৫৪, ১৫৮, যারিয়াত ৫৬-৫৭, আনকাবূত ৬১, যুমার ৩৮, বাক্বারাহ ২৯, শু‘আরা ২১, হূদ ৬। স্বল্পসংখ্যক নাস্তিক ব্যতীত পৃথিবীর সকল ধর্মাবলম্বী মানুষ এ প্রকার তাওহীদে বিশ্বাস করে থাকে। (২) তাওহীদে ইবাদত বা উলূহিয়াত। অর্থাৎ ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক না করা। দলীল :যারিয়াত ৫৬, বাক্বারাহ ২১, ফাতিহা ৪। (৩) তাওহীদে আসমা ওয়া ছিফাত বা আল্লাহর গুণাবলীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। অর্থাৎ আল্লাহকে রিযিকদাতা, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা, ক্ষমাকারী ইত্যাদি হিসাবে বিশ্বাস করা। দলীল : আ‘রাফ ১৮০, শু‘আরা ১১ প্রভৃতি। নিম্নোক্ত দু’প্রকার তাওহীদে অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস রাখে না। মুসলিমগণ উপরোক্ত তিন প্রকার তাওহীদেই বিশ্বাস রাখেন। কেবল প্রথম প্রকার তাওহীদ বিশ্বাসে ‘মুসলিম’ হওয়া যায় না।

উত্তর

লায়লাতুল ক্বদরের বাহ্যিক কোন নিদর্শন নেই। হযরত উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) আমাদের খবর দিয়েছেন যে, ‘ঐদিন সূর্য উঠবে, কিন্তু আলোকচ্ছটা থাকবে না’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২০৮৮)। এর উপরে ভিত্তি করে অনেক বিদ্বান লায়লাতুল ক্বদর নির্দিষ্ট করেছেন। অথচ ওবাদাহ বিন ছামেত (রাঃ) প্রমুখাৎ বুখারী বর্ণিত হাদীছে এর ব্যাখ্যা এসেছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে লায়লাতুল ক্বদর সম্পর্কে খবর দেবার জন্য বের হ’লেন। তখন দু’জন মুসলিম তাঁর সামনে এসে গেল। তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে ক্বদরের রাত্রি সম্পর্কে খবর দেবার জন্য বের হয়েছিলাম। কিন্তু অমুক অমুকের সাথে দেখা হয়ে গেল। ফলে সেটা আমার থেকে উঠিয়ে নেওয়া হ’ল (অর্থাৎ নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণের কথাটা আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হ’ল)। সম্ভবতঃ এটা তোমাদের জন্য ভাল হ’ল (বুখারী হা/২০২৩; মিশকাত হা/২০৯৫)। ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, হাদীছের ব্যাখ্যা এটাই হ’তে পারে যে, তিনি বের হয়েছিলেন কেবল ঐ বছরের লায়লাতুল ক্বদর নির্দিষ্ট করে বলার জন্য’ (তাফসীর ইবনে কাছীর)। অতএব বাহ্যিক নিদর্শন দেখে লায়লাতুল ক্বদর নির্দিষ্ট করার কোন সুযোগ নেই। কেননা রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা রামাযানের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলিতে লায়লাতুল ক্বদর সন্ধান কর’ (বুখারী হা/২০১৭; মিশকাত হা/২০৮৩)।

পবিত্র কুরআনের শুরুতেই আল্লাহকে না দেখে গায়েবে বিশ্বাসকে মুত্তাক্বীদের অন্যতম গুণ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে (বাক্বারাহ ২/৩)। তিনি অন্যত্র বলেন, নিশ্চয়ই যারা তাদের প্রতিপালককে না দেখে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও বড় পুরস্কার(মুলক ৬৭/১২)। হাদীছে জিবরীলে ঈমান সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি বলেন, ঈমান হচ্ছে আল্লাহকে বিশ্বাস, ফেরেশতাকে বিশ্বাস ইত্যাদি বলার পর ইহসান-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, তুমি আল্লাহর ইবাদত কর এমনভাবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ (অর্থাৎ তিনি অদৃশ্যে আছেন, তাঁকে দেখা যায় না) (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২)।

উত্তর

আদম (আঃ) আল্লাহকে দেখেছেন মর্মে কোন দলীল পাওয়া যায় না। আল্লাহর উপরোক্ত বাণী অনুযায়ী দুনিয়াতে কেউই আল্লাহকে দেখতে পাবে না। তিনি নবী হৌন বা অন্য কেউ হোক। কোন নবী-রাসূল থেকেই এটা প্রমাণিত হয়নি যে, তারা আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখেছেন। রাসূল (ছাঃ) স্বয়ং আল্লাহকে দেখেননি। বরং তাঁর ‘নূর’ দেখেছেন(মুসলিম, মিশকাত হা/৫৬৫৯) এবং একবার ফজরের পূর্বে তাঁকে স্বপ্নে দেখেছিলেন(তিরমিযী হা/৩২৩৪-৩৫, মিশকাত হা/৭২৫, ৭২৬, ৭৪৮)। আখেরাতে নবী-রাসূলগণ সহ প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তি আল্লাহকে দেখতে পাবেন (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫৬৫৫)।

আল্লাহ্ তা‘আলা শেষ যামানায় ঈসা (আঃ)-কে নবী হিসাবে নন, বরং ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসাবে প্রেরণ করবেন (বুখারী হা/২২২২, মুসলিম হা/১৫৫)। মুহাম্মাদ (ছাঃ) আগমনের মধ্যদিয়ে পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলের আনীত শরী‘আত রহিত হয়ে গেছে (তওবা ৯/৩৩)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যদি আজকে মূসাও জীবিত থাকতেন, তাহলে আমার ইত্তেবা করা ব্যতীত তাঁর কোন উপায় থাকতো না (আহমাদ, মিশকাত হা/১৭৭)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ঈসা ইবনে মারিয়াম অবতরণ করবেন একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসাবে। তখন নেতা থাকবেন তোমাদের মধ্য হ’তে’। উম্মতে মুহাম্মাদীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলবেন, তোমরা একে অপরের উপর আমীর হবে। এটি এই উম্মতের জন্য আল্লাহর দেওয়া সম্মান’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৫৫০৬-০৭)। অতএব ক্বিয়ামতের প্রাক্কালে ঈসা (আঃ) দুনিয়াতে আগমন করে নতুন কোন শরী‘আত আনবেন না। বরং শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) আনীত শরী‘আতেরই অনুসরণ করবেন।

উত্তর

আল্লাহ বলেন, আমরা অবশ্যই প্রত্যেক জনপদে রাসূল পাঠিয়েছি এই দাওয়াত দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং ত্বাগুত থেকে বিরত হও (নাহল ৩৬)। তিনি বলেন, অতঃপর তাদের পরবর্তী বংশধররা আসে, যারা ছালাত বিনষ্ট করে এবং প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে যায়। ফলে তারা দ্রুত পথভ্রষ্ট হয় (মারিয়াম ৪৯)। উপরোক্ত আলোচনায় বুঝা যায় যে, যুগে যুগে আল্লাহ বিভিন্ন জনপদে নবী পাঠিয়েছেন। কিন্তু মানুষ তাঁদের অবাধ্যতা করেছে। ফলে মূল ইলাহী ধর্ম বিকৃত হয়ে মানুষের মনগড়া ধর্মই এখন অবশিষ্ট রয়েছে। যা হিন্দু-বৌদ্ধ, ইহুদী-খৃষ্টান ইত্যাদি নামে অভিহিত হয়েছে। ‘ইসলাম’ আসার পরে বিগত সকল ইলাহী ধর্ম বাতিল হয়ে গেছে। ‘ইসলাম’-ই এখন ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্ম (আলে ইমরান ১৯)। অন্যান্য ধর্মে যেসব কল্যাণময় উপদেশ পাওয়া যায়, তা বিগত ইলাহী ধর্মসমূহ থেকে গৃহীত হওয়াটা বিচিত্র নয়। কুরআনে আহলে কিতাব হিসাবে ইহুদী ও নাছারাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে। তারা হযরত মূসা ও ঈসা (আঃ)-এর অনুসারী ছিলেন। তাদের নিকটে আল্লাহর কিতাব তাওরাত ও ইঞ্জীল এসেছিল। কিন্তু তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বিকৃত করে ফেলে (বাক্বারাহ ৭৯, নিসা ৪৬ প্রভৃতি)। ফলে তারা অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায় (ফাতিহা ৭)। উক্ত কিতাবদ্বয়ের অস্তিত্ব দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। হিন্দুদের সম্পর্কে কুরআনে কিছু বলা হয়নি। তবে তাদের ধর্মের মূল বৈশিষ্ট্য মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে বলা হয়েছে (আন‘আম ৭৪ প্রভৃতি)।

উত্তর

আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে জানার জন্য যে তিন প্রকার তাওহীদ সম্পর্কে জানা আবশ্যক তার মধ্যে তাওহীদে আসমা ওয়াছ ছিফাত অন্যতম। এর অর্থ আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলী সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। যার মাধ্যমে মানুষ বিবিধ কল্যাণ লাভ করতে পারে। যেমন- ১-মানুষ যখন আল্লাহ্কে ‘রাযযাক’ বা একমাত্র রিযিকদাতা বলে বিশ্বাস করে, তখন সে রুযী নিয়ে চিন্তিত হয় না। ২- মানুষ যখন জানবে যে, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোন শরীক নেই। তখন মানুষ শিরকমুক্তভাবে ইবাদত করবে। ৩- মানুষ যখন জানবে যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। তখন স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর প্রতি তার ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে। ৪- মানুষ যখন জানবে যে, আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা, তখন সে কোন অন্যায় কাজ করতে ভয় পাবে। ৫- মানুষ যখন জানবে যে, আল্লাহ হায়াত ও মঊতের মালিক, তিনি সন্তানদাতা এবং রোগ ও আরোগ্যদাতা, তখন সে এসব নিয়ে কোনরূপ দুশ্চিন্তায় ভুগবে না। এভাবে মানুষ যখন আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে জানবে তখন সে বুঝতে পারবে যে, তার জন্য এসব কিছু শোভা পায় না। মনে রাখা অবশ্যক যে, অধিকাংশ বাতিল ফেরকারই জন্ম হয়েছে এই তাওহীদ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে। একই বিভ্রান্তির শিকার হয়ে অনেক তাফসীরবিদ তাদের তাফসীর গ্রন্থসমূহে আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে অবমাননাকর ও ঈমানবিধ্বংসী আকীদাসমূহ প্রচার করেছেন।

মূলতঃ কালেমার কোন প্রকার নেই। একই কালেমা বিভিন্ন শব্দে হাদীছের গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত হয়েছে। ভারত বর্ষের বিদ্বানগণ ঐ শব্দগুলোর প্রতি লক্ষ্য করে কালেমার বিভিন্ন নামকরণ করেছেন। যেমন- কালেমা তাইয়েবাহ, শাহাদাত, তাওহীদ, তামজীদ ইত্যাদি। এটি ইজতেহাদী বিষয়। প্রশ্নে বর্ণিত দু’টি কালেমাই কালেমায়ে শাহাদাতের অন্তর্ভুক্ত (প্রথমটি দ্রষ্টব্য : আবুদাঊদ হা/২৬৭৯। দ্বিতীয়টি দ্রষ্টব্য : ছহীহ মুসলিম হা/২৩৪)।

কারণ হল, তৎকালীন সময়ে ইমাম আহমাদ (রহঃ) সবচেয়ে বড় বিদ্বান ছিলেন এবং তার কথা সকল হক্বপন্থী জনগণ এক বাক্যে মেনে নিত। তাই তিনি যদি বিষয়টির ব্যাপারে স্বীকৃতি দেন, তাহলে সবাই এক বাক্যে তা মেনে নেবে। উল্লেখ্য যে, ‘কুরআন সৃষ্ট’ মতবাদটি কুফরী মতবাদ। কেননা এর দ্বারা কুরআনকে অন্যান্য সৃষ্টির মত ধারণা করা হয়। অথচ কুরআন সরাসরি আল্লাহর কালাম এবং এটাই আহলে সন্নাত ওয়াল জামা‘আত আহলেহাদীছের ছহীহ আক্বীদা (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : আহলেহাদীছ আন্দোলন, ডক্টরেট থিসিস পৃঃ ১০৫-০৬)।

উত্তর

এরূপ এক প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছিলেন, إِعْمَلُوا فَكُلٌّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ ‘তোমরা আমল করতে থাক। কেননা প্রত্যেকের জন্য ঐ কাজ সহজ হয়, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ; মিশকাত হা/৮৫)। অনুরূপ আরেকটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, سَدِّدُوا وَقَارِبُوا ‘তোমরা সৎকর্ম কর ও আল্লাহর নৈকট্য তালাশ কর’। কারণ জান্নাতী ব্যক্তি জান্নাতী আমলের উপরেই মৃত্যুবরণ করবে, ইতিপূর্বে সে যে আমলই করুক না কেন এবং জাহান্নামী ব্যক্তি জাহান্নামী কাজের উপরেই মৃত্যুবরণ করবে, ইতিপূর্বে সে যে আমলই করুক না কেন। অতঃপর তিনি বলেন, তোমাদের ব্যাপারে তোমাদের পালনকর্তা ফায়ছালা শেষ করে ফেলেছেন। ‘তোমাদের একদল জান্নাতে যাবে ও একদল জাহান্নামে যাবে’ (শূরা ৪২/৭; তিরমিযী হা/২১৪১, মিশকাত হা/৯৬)। 

ভাগ্যে কি লিপিবদ্ধ আছে, মানুষ তা জানে না। অতএব মানুষকে একনিষ্ঠ চিত্তে সৎ আমল করে যেতে হবে। ইবনে ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) বলেন,كُلُّ شَيْئٍ بِقَدَرٍ حَتَّى الْعَجْزُ وَالْكَيْسُ ‘প্রত্যেক বস্ত্তই আল্লাহর নির্ধারণ অনুযায়ী রয়েছে। এমনকি বুদ্ধির স্বল্পতা ও তীক্ষ্ণতা পর্যন্ত’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৮০)। (বিস্তারিত দ্রঃ দরস : তাক্বদীরে বিশ্বাস, মাসিক আত-তাহরীক নভেম্বর ২০০৩)।

উত্তর

আটরশী পীর ছাহেবের মৌলিক বিভ্রান্তিগুলির অন্যতম হ’ল- (১) পরকালে মুক্তির জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আবশ্যকতা নেই। যেমন পীর ছাহেব বলেছেন, ‘হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খৃষ্টানগণ নিজ নিজ ধর্মের আলোকেই সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করতে পারে এবং তাহ’লেই কেবল বিশ্বে শান্তি আসতে পারে’ (আটরশীর কাফেলা, সংকলনে মাহফূযুল হক, আটরশীর দরবার থেকে প্রকাশিত, ৮৯ পৃঃ, সংস্করণ-১৯৮৪, তাসাউফ, তত্ত্ব ও পর্যালোচনা, ১৪৭ পৃঃ, প্রকাশকাল-২০০০ খৃঃ)। অথচ মানবজাতির জন্য আল্লাহ্র মনোনীত একমাত্র দ্বীন হ’ল ইসলাম (আলে ইমরান ১৯)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম তালাশ করলে, তা কখনোই কবুল করা হবে না। এমন ব্যক্তি পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (আলে-ইমরান ৮৫)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন তার শপথ করে বলছি, এ উম্মতের কেউ যদি আমার আনীত দ্বীন গ্রহণ ব্যতিরেকে মৃত্যুবরণ করে, সে ইহুদী হৌক বা খৃষ্টান হৌক, অবশ্যই সে জাহান্নামের অধিবাসী হবে (মুসলিম হা/১৫৩, মিশকাত হা/১০)। 

(২) ভাল-মন্দ পীরের হাতে। পীর ছাহেব বলেছেন, এনায়েতপুরী ছাহেব তিরোধানের পূর্বে আমাকে বলে গেছেন, ‘বাবা তোর ভাল-মন্দ উভয়টাই আমার হাতে রইল। তোর কোন চিন্তা নেই’ (শাহছুফী হযরত ফরিদপুরী ছাহেবের নসিহত, ৩/১১১ পৃঃ, প্রকাশক : পীরজাদা মোস্তফা আমীর মুজাদ্দেদী, বিশ্ব জাকের মঞ্জিল ফরিদপুর, ৩য় মুদ্রণ ১লা মে-১৯৯৯ খৃষ্টাব্দ)। এই আক্বীদা পীরকে সরাসরি আল্লাহ্র আসনে বসিয়ে দেওয়ার শামিল। অথচ আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী)! বলুন, সবকিছুই আল্লাহর তরফ থেকে হয়’ (নিসা ৭৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘যদি আল্লাহ তোমাকে কষ্টে নিপতিত করেন, তাহলে তিনি ব্যতীত তা দূর করার কেউ নেই। আর যদি তিনি তোমার কোন কল্যাণ করতে চান, তবে প্রতিরোধের কেউ নেই’ (ইউনুস ১০৭)। 

এছাড়াও সকল পীরপূজারীই এ বিশ্বাস করে থাকে যে, পীর পরকালে তাদের মুক্তির অসীলা হবে। অথচ স্বয়ং রাসূল (ছাঃ) নিজ কন্যা ফাতেমা (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলছেন, হে ফাতেমা বিনতে মুহাম্মাদ! তুমি নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। আমি আল্লাহর আযাব থেকে তোমাকে রক্ষায় কিছুই করতে পারব না’ (মুসলিম হা/২০৪)। 

উক্ত আলোচনায় তাদের আক্বীদা সম্পর্কে সামান্য কিছু ধারণা দেওয়া হ’ল। এছাড়াও তাদের আরো বিভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ রয়েছে, যা থেকে দূরে থাকা আবশ্যক।

ফেরেশতামন্ডলী নূরের তৈরী আল্লাহ্র একটি বিশেষ সৃষ্টি (মুসলিম হা/২৯৯৬)। তাঁদের প্রতি ঈমান আনা ঈমানের অন্যতম রুকন (বাক্বারা ২/২৮৫; বুখারী হা/৫০)। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আনুগত্যের জন্য তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং পৃথিবী পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদেরকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রেখেছেন (বুখারী হা/৩২৩৬; তিরমিযী হা/২৪৩১)। আল্লাহ তা‘আলার কোন আদেশ তাঁরা অমান্য করেন না (তাহরীম ৬)। তাঁদের পানাহারের প্রয়োজন পড়ে না। দিনে-রাত্রে ক্লান্তিহীনভাবে তাঁরা শুধু পবিত্রতা বর্ণনায়ই লিপ্ত থাকে (আম্বিয়া ২০, ফুছছিলাত ৩৮)। তারা আকৃতি পরিবর্তনে সক্ষম(মারইয়াম ১৭, মুসলিম হা/১৬৭)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জিবরীল (আঃ)-কে তার নিজ আকৃতিতে দেখেছেন যে তার ৬০০ টি ডানা বা পাখা আছে (বুখারী হা/৪৮৫৭)। তাদের সংখ্যা এত বেশী যে, সপ্তম আসমানে বায়তুল মামুর নামক মসজিদে প্রতি ওয়াক্তে সত্তর হাযার ফেরেশতা একত্রে ছালাত আদায় করে। যারা একবার সেখানে শামিল হয়েছে, ক্বিয়ামত পর্যন্ত দ্বিতীয়বার আর সুযোগ পাবেনা (বুখারী হা/৩৬৭৪, মুসলিম হা/৪২৯)।

উত্তর

হকপন্থী মুসলমান কেবলমাত্র ‘আহলেহাদীছ’ নামেই অভিহিত হবেন। ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনে এযাম নিজেদেরকে ‘আহলুল হাদীছ’ বলতেন। ইমাম আহমাদ সহ অধিকাংশ মুহাদ্দিছ বিদ্বান কিয়ামত পর্যন্ত হকের উপর প্রতিষ্ঠিত নাজী ফেরকা হিসাবে কেবলমাত্র আহলেহাদীছ জামা‘আতকেই নির্দিষ্ট করেছেন (সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৭০ আলোচনা দ্রঃ)। হাদীছের বক্তব্য অনুযায়ী, মুসলিম উম্মাহ ৭৩ ফেরকায় বিভক্ত হবে। যার মধ্যে ৭২ ফেরকাই জাহান্নামী হবে। মাত্র একটি ফেরকা জান্নাতী হবে। আমাদের সকলের ধর্মীয় পরিচয় মুসলিম। তার মধ্য নাজী ফেরকার বৈশিষ্ট্যগত নাম হ’ল ‘আহলেহাদীছ’। অতএব প্রত্যেক মুসলমানেরই আক্বীদা ও আমলে প্রকৃত ‘আহলেহাদীছ’ হওয়া আবশ্যক।

উত্তর

আল্লাহ বান্দার কর্ম দেখে হাসেন (বায়হাক্বী, আসমা ওয়া ছিফাত, ‘আল্লাহ্র হাসি’ অনুচ্ছেদ ২/২১৬-২৪)। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আল্লাহ ঐ দুই ব্যক্তিকে দেখে হাসবেন যারা একে অপরকে হত্যা করেছে, অতঃপর দু’জনেই জান্নাতে প্রবেশ করেছে। একজন আল্লাহ্র রাস্তায় লড়াই করতে গিয়ে নিহত হয়েছে। অতঃপর হত্যাকারীর তওবা আল্লাহ কবুল করেছেন এবং সে শহীদ হয়েছে’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৮০৭ ‘জিহাদ’ অধ্যায়)। অন্য হাদীছে রাসূল (ছাঃ) বলেন, আল্লাহ তিন ব্যক্তিকে ভালবাসেন ও তাদের দেখে হাসেন এবং তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন। (১) যে ব্যক্তি আল্লাহ্র রাস্তায় যুদ্ধ করে শহীদ হয় অথবা যুদ্ধে সাহায্য করে (২) যে ব্যক্তির সুন্দরী স্ত্রী ও সুন্দর বিছানা রয়েছে। অথচ সবকিছু ছেড়ে শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদের ছালাত আদায় করে (৩) যে ব্যক্তি সফরে কাফেলার সঙ্গে থাকা অবস্থায় ভাল থাক বা কষ্টে থাক ঘুম থেকে উঠে ছালাত আদায় করে’ (হাকেম ১/২৫; ছহীহাহ হা/৩৪৭৮)। আল্লাহ্র আকার ও তাঁর নীচের আসমানে অবতরণ বিষয়ে অনেক ছহীহ দলীল রয়েছে (মায়েদাহ ৬৪; ছোয়াদ ৭৫; কলম ৪২; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১২২৩)। তবে তিনি কিভাবে অবতরণ করেন সে সম্পর্কে আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। কারণ এর অর্থ স্পষ্ট কিন্তু ধরণ অস্পষ্ট (معناه معلوم وكيفيته مجهول) (উছূলুল ই‘তিক্বাদ ৩/৩৮৭-এর টীকা দ্রঃ; আক্বীদাতুস সালাফ. পৃঃ ২৯; ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন’ ডক্টরেট থিসিস, পৃঃ ১১৭)।

উত্তর

এটা কুফরী আক্বীদা। ইসলামে পীরের কোন অস্তিত্ব নেই। কারণ আল্লাহ ও রাসূল (ছাঃ) কোন পীরের অনুসরণ করার নির্দেশ দেননি। আল্লাহ বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তোমাদের আমীরের আনুগত্য কর’ (নিসা ৫৯)। যিনি আল্লাহ্র কিতাব অনুযায়ী তোমাদের পরিচালনা করেন (মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৬২ ‘নেতৃত্ব ও বিচার’ অধ্যায়)। ‘পীর’ এদেশে ছূফীদের একটি উপাধি। প্রাচীন ও আধুনিককালে মুসলমানদের তাওহীদ বিশ্বাসে ফিৎনা সৃষ্টির সবচেয়ে বড় মাধ্যম হ’ল ছূফীবাদ। অতএব এইসব মতবাদ থেকে সাবধান!

পাঁচটি নয় কোন ব্যক্তি ইসলামের কোন একটি রুকনকে অস্বীকার করলে সে আর মুসলিম থাকে না। আর অমুসলিম ব্যক্তি কাফের এবং সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে। কাফের, মুশরিক বা মুনাফিকদের জাহান্নাম থেকে বের হওয়ার কোন সুযোগ নেই। অব্যাহতভাবে তারা জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করতে থাকবে (তওবাহ ৬৮; তাগাবুন ১০)।

উত্তর

একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদত খালেছ হওয়ার শর্ত হ’ল দু’টি : (ক) রিয়া মুক্ত হওয়া। অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহকে রাযী-খুশী করার উদ্দেশ্যে ইবাদত করা। (খ) রাসূল (ছাঃ)-এর তরীকায় সম্পাদিত হওয়া (কাহফ ১১০)।

উত্তর

ইয়াজূজ মাজূজ সম্প্রদায় আদম (আঃ)-এর বংশধর। তারা ক্বিয়ামতের প্রাক্কালে ঈসা (আঃ)-এর সময় পৃথিবীতে উত্থিত হবে। শাসক যুলক্বারনাইন তাদেরকে এখন প্রাচীর দিয়ে আটকিয়ে রেখেছেন (কাহফ ৯৪-৯৮)। ঐ প্রাচীর ভেঙ্গে তারা সেদিন বেরিয়ে আসবে এবং সামনে যা পাবে সব খেয়ে ফেলবে। তাদের সাথে কেউ লড়াই করতে পারবে না। এক সময় তারা বায়তুল মুক্বাদ্দাসের এক পাহাড়ে গিয়ে বলবে, দুনিয়াতে যারা ছিল তাদের হত্যা করেছি। এখন আকাশে যারা আছে তাদের হত্যা করব। তারা আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ করবে। আল্লাহ তাদের তীরে রক্ত মাখিয়ে ফেরত পাঠাবেন। একদা ঈসা (আঃ) তাদের জন্য বদদো‘আ করবেন। এতে তারা সবাই মারা যাবে ও পচে দুর্গন্ধ হবে। আল্লাহ শকুন পাঠাবেন। লাশগুলোকে তারা নাহবাল নামক স্থানে নিক্ষেপ করবে। মুসলিমরা তাদের তীর ও ধনুকগুলো ৭ বছর জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করবে (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫৪৭৫)।

উত্তর

উক্ত ভাইয়ের কথাই সঠিক। আল্লাহর নিজস্ব আকার রয়েছে। তবে তাঁর আকার কারো সাথে তুলনীয় নয় (শূরা ১১)। আল্লাহর চেহারা, হাত, চোখ, পা ইত্যাদি গুণের কথা সরাসরি পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে (রহমান ২৭; মায়েদাহ ৬৪; ত্বোয়া-হা ২০; ক্বলম ৪২)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তাঁর তুলনীয় কিছুই নেই, তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা(শূরা ১১)।

উত্তর

নেক আমল ও দো‘আর মাধ্যমে মানুষের তাকদীরের পরিবর্তন হয়। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা মিটিয়ে দেন এবং যা ইচ্ছা করেন তা বহাল রাখেন’(রা‘দ ৩৯)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘দো‘আর মাধ্যমে তাকদীর পরিবর্তন হয় এবং সৎ আমলের মাধ্যমে বয়স বৃদ্ধি হয়’ (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ হা/৯০, ৪০২২; মিশকাত হা/২২৩৩, ৪৯২৫; ছহীহাহ হা/১৫৪)।

উত্তর

এটি স্বাভাবিক পরিবর্তন। আল্লাহ যা খুশী তাই করতে পারেন। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা হচ্ছে- আল্লাহর সৃষ্টির চিরন্তন নিয়মের কোন পরিবর্তন নেই। এর ব্যতিক্রম কেবল তার হুকুমেই হ’তে পারে। যেমন মারিয়াম ও ঈসার বেলায় হয়েছিল। আরেকটি ব্যাখ্যা হ’ল, তোমরা আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করো না (তাফসীর ইবনু কাছীর)। অর্থাৎ কোন মানুষ নিজের পক্ষ থেকে শরীরের কোন অঙ্গ পরিবর্তন করতে পারবে না। এটা নিষিদ্ধ। কিন্তু যদি লিঙ্গ বা অন্য কোন অংশের পরিবর্তন আপনা আপনি ঘটে যায়, তাহ’লে সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে। আল্লাহ্ সৃষ্টিকর্তা হিসাবে যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন (বুরূজ ১৬)। এছাড়া আল্লাহ কিছু পাপের শাস্তি হিসাবেও মানুষকে অন্যরূপে রূপান্তরিত করে থাকেন (বুখারী, ছহীহ আবূদাঊদ হা/৪০৩৯)। যেমন অবাধ্য ইহুদীদেরকে তিনি বানর-শূকরে রূপান্তরিত করেছিলেন (বাক্বারাহ ৬৫)।

উত্তর

‘মাযহাব’ শব্দের আভিধানিক অর্থ চলার পথ। পারিভাষিক অর্থ মতবাদ, মতাদর্শ ইত্যাদি। চারজন প্রসিদ্ধ মুজতাহিদ ইমামের ফিক্বহী মতামতকে ইসলামী পরিভাষায় মাযহাব বলা হয়। উক্ত চার ইমামের মৃত্যুর বহু পরে রাজনৈতিক দলাদলির সুবাদে বিভিন্ন মাযহাবের সূত্রপাত হয় এবং মুসলিমগণ নানা দলে ভিন্ন ভিন্ন নামে বিভক্ত হয়ে যায়। মানুষ স্ব স্ব মাযহাবের অন্ধ মুক্বাল্লিদ হয়ে পড়ে এবং ছহীহ হাদীছের নিরপেক্ষ অনুসরণ থেকে অধিকাংশই দূরে চলে যায়। অথচ উক্ত চার ইমামের প্রত্যেকেই বলে গেছেন, ‘যখন তোমরা ছহীহ হাদীছ পাবে, মনে রেখ সেটাই আমাদের মাযহাব’(শা‘রানী কিতাবুল মীযান (দিল্লী ছাপা) ১/৭৩)। শাহ অলিউল্লাহ দেহলভী বলেন, ৪র্থ শতাব্দী হিজরীর পূর্বে মুসলমানগণ নির্দিষ্ট কোন একটি মাযহাবের মুক্বাল্লিদ ছিল না (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগ মিসরী ছাপা ১/১১৮)।

উত্তর

সাত আসমানের চেয়ে আল্লাহ্র আরশ বড় একথা ঠিক (ইবনু আবী শায়বা, সিলসিলা ছহীহাহ হা/১০৯)। কিন্তু আরশের চেয়ে আল্লাহ বহুগুণ বড় এ কথা বলা যাবে না। কারণ এর দ্বারা আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাথে তুলনা করা হয়। অথচ তাঁর সাথে তাঁর কোন সৃষ্টিকে তুলনা করা যায় না (শূরা ১১)। তবে কোন কিছুর সাথে তুলনা না করে ‘আল্লাহ সবার বড়’ এ কথা বলায় কোন দোষ নেই।

উত্তর

পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও ছহীহ হাদীছ সমূহে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা‘আলার আকার আছে। যেমন আল্লাহর চেহারা (আর-রহমান ২৭), তাঁর দুই হাত(ছোয়াদ ৭৫; মায়েদাহ ৬৪), তাঁর চোখ (তূর ৪৮) আছে বলে কুরআন মজীদে উল্লেখিত হয়েছে। অনুরূপভাবে হাদীছে এসেছে, আল্লাহ যখন জাহান্নামকে বলবেন, তুমি কি পূর্ণ হয়েছ? তখন সে বলবে, আরো বেশি আছে কি? তখন মহান আল্লাহ জাহান্নামে তাঁর পা রাখবেন। জাহান্নাম তখন বলবে, যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে (বুখারী হা/৪৮৪৮; মুসলিম ‘জান্নাত’ অধ্যায় হা/৩৫, ৩৭, ৩৮; মিশকাত হা/৫৬৯৪-৯৫)। তাছাড়া মুমিনগণ জান্নাতে আল্লাহর দর্শন লাভে সর্বাধিক খুশি হবেন (মুসলিম হা/৪৬৬-৬৭ ‘ঈমান’ অধ্যায়)। কুরআন ও হাদীছে এ ধরনের অনেক প্রমাণ রয়েছে। 

আল্লাহর নিজস্ব আকার আছে। কিন্তু তা কারু সাথে তুলনীয় নয় (শূরা ১১; নাহল ৭৪)। আল্লাহ নিরাকার হ’লে মুমিনগণ কিভাবে তাঁকে জান্নাতে দেখতে পাবেন? ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদা হ’ল, মুমিনগণ জান্নাতে আল্লাহ তা‘আলার দর্শন লাভে ধন্য হবেন। আল্লাহর দর্শনকে কেবল বিদ‘আতী মু‘তাযিলা, মাতুরিদিয়া ও কতিপয় মুর্জিয়া অস্বীকার করে। 

আল্লাহর জ্ঞান ও ক্ষমতা অসীম। সুতরাং তাঁর আকার থাকা এ গুণের বিরোধী নয়। অতি যুক্তিবাদীরা আল্লাহকে অবশেষে আকার ও গুণহীন শূন্য সত্তায় পরিণত করেছে। যা নাস্তিক্যবাদের শামিল এবং কুরআন ও হাদীছের প্রকাশ্য অর্থের বিরোধী (দ্রঃ আহলেহাদীছ আন্দোলন থিসিস, পৃঃ ৯৮)।

উত্তর

কালেমা ত্বাইয়েবা হচ্ছে لا إله إلا الله ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থ: ‘নেই কোন উপাস্য আল্লাহ ব্যতীত’। আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, الكلمة الطيبة لا إله إلا الله‘কালেমায়ে ত্বাইয়েবাহ’ হ’ল, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (তাফসীরে কুরতুবী, তাফসীরে ইবনে কাছীর, ইবরাহীম ২৪নং আয়াতের তাফসীর দ্রঃ)।

প্রশ্নঃ আমরা জানি শিরক বড় গুনাহ। এই শিরকের গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করবেন কি?

উত্তর
শিরক একটি অমার্জনীয় পাপ (নিসা ৪/৪৮) যাকে আল্লাহ মহা যুলুম বা অন্যায় বলে আখ্যায়িত করেছেন (লোক্বমান ১৩)। তবে সে প্রকৃতপক্ষে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে শিরক থেকে ফিরে আসলে এবং আমলে ছালেহ করলে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন। আল্লাহ বলেন, ‘তবে যারা তওবা করে, বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। যে তওবা করে ও সৎকর্ম করে, সে ফিরে আসার স্থান আল্লাহর দিকে ফিরে আসে’ (ফুরক্বান ৭০-৭১)।