এসো হাদিস পড়ি ?
এসো হাদিস পড়ি ?
হাদিস অনলাইন ?

পণ ও যৌতুক


এ তো গেল কনে ও মনের কথা; কিন্তু আসল ও পণের কথাটা বাকীই থেকে গেছে; যা বর্তমান বিবাহের মূল স্তম্ভ! বউ কেমন হবে না হবে, তার  দ্বীন ও চরিত্র কেমন সে তো গৌণ বিষয়। মুখ্য বিষয় হল, ‘কত কি দিতে পারবে?’ তাই তো নতুন জামাই শবশুর বাড়ি গেলে ‘জামাইটা কার?’ প্রশ্নের উত্তরে একই কথা বলা হয় ‘জামাই টাকার!’

পণ? পণ এক আশ্চর্য যাদু! পণের ‘সোনার কাঠি’ ও যৌতুকের ‘রূপার কাঠি’ দ্বারা মেয়ে শবশুরবাড়িতে ইচ্ছাসুখ পেতে পারে।

পণ; জাহান্নামকে জান্নাত এবং জান্নাতকে জাহান্নাম বানাতে পারে!

পণ; নারীর অবমাননা, নারীর মর্যাদায় কুঠারাখাত, তার অধিকার হরণ।

পণ; যুবজীবনের অভিশাপ। অশান্তির বিষাক্ত দাবানল।

পণ; স্ত্রীর নিকট ব্যক্তিত্ব বিক্রয়ের মূল্য।

পণ; ইসলামী বিধানের নির্লজ্জ বিরুদ্ধাচরণ।

পণ; অর্থ-লোলুপতা, শোষণ ও পীড়ন।

পণ; এক প্রকার ঘুষ। আর প্রিয় নবী (সাঃ) ঘুষদাতা ও গ্রহীতা উভয়কেই অভিশাপ করেছেন।’’[1]

পণ; অসৎ উপায়ে অন্যের অর্থ আত্মসাৎ। আর আল্লাহ বলেন,

) Vla taklva mvalkm bynkm balbatl vtdlva <তার vantm tlmvn উপরে দেউলিয়া পার্টি শিশু ডি alhkam ltaklva পাবলিক সম্পদ (

‘‘তোমরা অন্যায় ভাবে একে অপরের সম্পদ গ্রাস করো না এবং জেনে-শুনে লোকেদের ধন সম্পদের কিয়দংশ অন্যায়ভাবে  গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণকে উৎকোচ দিও না।[2]

বরপণের মাল হারামের মাল। কন্যাপক্ষের কথায় ‘হারামের মাল হারামে যাক।’ কারণ, সাধারণতঃ তা হয়, পূর্ব থেকেই ‘ফিক্স্ড ডিপোজিট’ করা সূদের অর্থ অথবা চুরি বা হরফ করা অথবা ভিক্ষা করা যাকাতের টাকা। পণে দেওয়া হালাল টাকা খুব কমই হয়। হালাল হলেও পণের নর্দমায় পড়ে তা হারামে পরিণত হয়ে যায়।

কিন্তু এই সর্বনাশী বিষজীবাণু এল কোত্থেকে? অর্ধাঙ্গিনী পেতে গেলে তো অর্থ প্রদান করতে হয়; যেমন বহু মুসলিম দেশে আজও প্রচলিত। কিন্তু এ সমাজে এর প্রাদুর্ভাবের কারণ কি? এর কারণ কি বিজাতির অনুকরণ নয়? পণপ্রথার কারণ, মুসলিমের দ্বীন থেকে ঔদাসিন্য, নারী প্রগতির নামে বেলেল্লাপনা ও পর্দাহীনতা। পারা খসে পড়লে আয়নার এবং ছিলা থাকলে কলার মূল্য ও কদর অবশ্যই থাকে না।

পাত্রীপক্ষের উচ্চ আশা; ঘুষ, হাদিয়া, বখশিশ্ বা পারিতোষিক দিয়েও বড় ঘর ঢোকা। উচ্চ শিক্ষিত সরকারী চাকুরী-জীবি পাত্রের জন্য কন্যা সহ লাখ টাকার নিলাম ডাকা!

কিছু না নিয়ে বিয়ে করতে বা দিতে চাইলে পাত্রীপক্ষ ভাবে, পাত্রের নিশ্চয় কোন ‘খুঁত- টুঁত’ আছে। একথা কানে এলে সদিচ্ছা নিমেষে মোটা পণে পরিণত হয়।

পণ না নিয়ে থাকলে সামান্য কলহ-দ্বনেদ্বর ফলে পাত্রীপক্ষ সন্ধির বদলে সহজে তালাক (খোলা) নিতে প্রস্ত্তত হয়। তালাক হলে দ্বিতীয় বিবাহে মোটা টাকার পণ নেওয়ার এরাদা পাক্কা হয়েই থাকে।

মেয়েকে বঞ্চিতা করে ছেলের নামে জমি-ভিটে ইত্যাদি রেজিষ্ট্রী করে দেওয়াও পণ প্রথার এক কারণ। তবে এইভাবে বঞ্চিতা করার এক কারণও পণ-প্রথা। যেহেতু মেয়ের বিবাহের সময় পণ ও যৌতুকের জন্য ২/৩ বিঘা জমি বিক্রয় করে অথবা না করে সর্বমোট প্রায় ৪/৫ বিঘা জমির মূল্য যদি ব্যয় হয়ে থাকে, তবে তার আর অন্যান্য অংশীদাররা কেন বাকী জমির ভাগ ঐ মেয়েকে দেবে? যদিও এরূপ বুঝা ও আচরণ আল্লাহর ভাগ-বণ্টন আইনে অবৈধ হস্তক্ষেপ।

সমাজে বিশেষ করে বিবাহ-শাদীতে উপহার উপঢৌকন দেওয়া-নেওয়ার প্রথা ও লৌকিকতার রেওয়াজ বড়। উপহারে প্রেম ও ভালোবাসা বর্ধিত হয়। নববধূর মন যেমন এই শুভ মুহূর্তে নতুন মানুষদের নিকট থেকে উপহার রূপে কিছু পেতে আকাঙ্ক্ষী হয়, তেমনি হয় নব জামাতার মন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অনুভূতিহীন পাত্রীপক্ষের জবাব থাকে ‘চায় না তো কি দোব? চাক্ তবে দোব।’ ফলে সেই আকাঙিক্ষত লৌকিকতার সামান্য উপহারটুকু ‘চাওয়া’র ছাঁচে পড়ে ভবিষ্যতে অসামান্য পণরূপে প্রকাশ পায়।

আবার পাড়ার ‘শাঁকচুন্নী’দের কথায় নিজেদের সম্ভ্রম রাখতে গিয়ে অনেক বরের মা দেখাদেখি পণ চেয়ে বসে। কনে সুন্দরী হলেও অনেকে পণে টাকা, জমি, টিভি, গাড়ি না নিয়ে চালাকী করে জামাই-বেটীকে সাজিয়ে দিতে বলে!

‘করেছিনু পণ, লইব না পণ বৌ যদি হয় সুন্দরী,
কিন্তু আমায় বলতে হবে সবর্ণ দেবে কয় ভরি?’

কিন্তু এই পণপ্রথার অনিবার্য পরিণতি কি?

এই বরপণ দিতে না পারলে শবশুরবাড়িতে কন্যার ভাগ্যে জোটে অকথ্য নির্যাতন, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, গঞ্জনা, ভৎর্সনা।  স্বামী বা তার বাড়ির লোকের পাশবিক অত্যাচার, অনাদর, অবহেলা। কমপক্ষে হতে হয়  স্বামীর সোহাগহারা। পরিশেষে বিবাহ-বিচ্ছেদ; নচেৎ বধূর আত্মহত্যা অথবা লোভী পাষন্ডদের পরিকল্পিত বধূহত্যা।

এই ভয়েই নারী নারীর দুশমন। মাতৃজঠরে কন্যা-ভ্রূণ হত্যা করা হয়। জন্মের পরও কন্যাহত্যা করা হয়। পরপর কন্যা জন্মালে  স্বামী ও তার বাড়ির লোক বধূর প্রতি বেজার হয়ে যায়। এদের অবস্থা হয় সেই জাহেলী যুগের মানুষদের মত; যাদের-

) Vaza নশ্বর hdhm balansy শাক্য প্রায়ই অনুমতি cxinvali kzym, ytvary ডি এম এ লোকটা জাতীয় ডি ymsk সম্মানিত · জ উম্মে আলী আর altrab প্রণীত যদি না Yds · জ সাঁই মা yhkmvn (

‘‘কাউকেও যখন কন্যা-সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়। তখন তার মুখমন্ডল কালো হয়ে যায় এবং অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। ওকে যে সংবাদ দেওয়া হয় তার গ্লানি-হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্মগোপন করে। (সে চিন্তা করে,) অপমান সহ্য করে ওকে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে! সাবধান! ওরা যা সিদ্ধান্ত করে তা অতি নিকৃষ্ট।’’[3]

এই পণের কারণে  স্বামীর ভাগ্যে মনমত স্ত্রী জোটে না। স্ত্রীর নির্মল প্রেম ও শ্রদ্ধা থেকে হয় বঞ্চিত। ‘তীর-বিঁধা-পাখী’ কখনো কি গান গাইতে পারে? নিজ পিতাকে যে পথে বসিয়েছে তাকে সুখ-সিংহাসনে কোন চক্ষে দেখবে? এর ফলে  স্বামী স্ত্রীর দেহের স্পর্শ পায়, কিন্তু মনের নাগাল পায় না। কাজ পায় কিন্তু ‘খিদমত’ পায় না। যেমন শবশুর-বাড়িতেও সে হয় মানহারা, ওজনহীন।

আর পাত্রীপক্ষের কথা? কত মেয়ের বাপ এই পণ-বন্যায় হচ্ছে ধবংস, পথের ভিখারী। পণের অভিশাপে নেমে-আসা দারিদ্র ও সহায়-সম্বলহীনতা তাকে ঠেলে দিচ্ছে ভিক্ষাবৃত্তির পথে। বর বা তার বর্বর বাপ নিজের বিলাস-উদ্যান গড়তে উজাড় করে দিচ্ছে কনের বাপের ক্ষুদ্র নীড় খানিকে!

এতে কি ঐ লোভাতুর সংসারে শান্তির কিরণ থাকে? নেমে আসে নিরন্তর অশান্তি ও কলহের ছায়া।

এই সর্বগ্রাসী যৌতুক প্রথার ভয়ানক আক্রমণের ফলে সমাজে কত বিপত্তির সৃষ্টি হয়েছে। পণ দিতে না পারায় বিবাহ না হলে অথবা বিলম্ব হলে বেড়ে চলে অবৈধ প্রণয়, ব্যভিচার, বেশ্যাবৃত্তি। পণ আনে অন্যান্য পাপ। গানবাজনার কথা বলতে গেলে পণের প্রতি ইঙ্গিত করে বলে, ‘গান-বাজনা হারাম, আর পণ নেওয়া হারাম নয়? গান-বাজনা হলে বিয়েতে থাকবে না, আর পণ-নেওয়া বিয়েতে কি করে অংশগ্রহণ করেছ?’

পণপ্রথার মহামারীর কারণেই নারী-শিক্ষার গুরুত্ব যাচ্ছে কমে। কারণ বিয়ের সময় টাকাই যখন লাগবে তখন আবার শিক্ষা-দীক্ষা, আদব দানে কি লাভ? মেয়ের চরিত্র ও ধর্মের দিকটা খেয়াল করার প্রয়োজন কি? বরং টাকার অভাবেই কত শিক্ষিতার বিবাহ হচ্ছে অধম নিরক্ষরের সাথে। তাই বহু মূর্খ অভিভাবকের মন বলে,

‘কন্যা ঘরের আবর্জনা, পয়সা দিয়ে ফেলতে হয়,
রক্ষণীয়া পালনীয়া শিক্ষণীয়া আদৌ নয়।’

পণ থেকে বাঁচার জন্য অভিভাবক মেয়েকে করছে মেহনতী, সবনির্ভরশীলা, ঠেলে দিচ্ছে পর্দাহীনতার পথে। নারী-পুরুষের অবাধ মিলামিশার চাকুরী ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যভিচারের পথে। ঘরে-বাইরে তাকে সুযোগ দিচ্ছে অবৈধ প্রণয়ে; ভাবছে, ‘ঘটে তো ঘটে যাক, পটে তো পটে যাক!’ কারণ, মেয়ে নিজেই  স্বামী নির্বাচন করে নিতে পারলে তাদের রেহাই! কিন্তু ফল তাতে বিপরীত হয়ে কেবলমাত্র দুর্নাম এবং শবশুরবাড়িতে অকথ্য নির্যাতন ও দুঃখ তার সাথী হয়। আর সর্বশেষে পণ বা যৌতুক দিতে না পারলে বিচ্ছেদ ছাড়া আর কি?

পণ চাই। নগদ চাই। ধারের কারবার নাই। এত খরচ, এত কিছুর পর বিয়ে ঘুরে যাবে। বর উঠে যাবে বিবাহ মজলিস থেকে; যদি কিছু টাকা বাকী থেকে যায় আক্দের সময়! এই ধৃষ্টতার ফলে কনে ও তার বাপ-মায়ের মাথায় কত বড় বজ্রাঘাত যে হয় তা অনুমেয়। কিন্তু সে আঘাত সমাজের মুখে কেবল ‘আহা’ হয়েই থেকে যায়। কনের আত্মহত্যার খবর শুনেও মনে আতঙ্ক আসে না। নিস্তেজ জড় সমাজের অভ্যন্তরে কোন চেতনা, কোন অনুভূতি, কোন আন্দোলন আনতে পারে না। এর কারণ অনেকটা এই যে, এই আঘাত যে খায় সেই এর জবাবে আরো বড় আঘাত দেয়। সুতরাং মার খেয়ে ও মার দিয়ে সমাজের অবস্থা হয়েছে মার-প্রতিযোগিতার মারমুখী কুশ্তীগীরদের মত। তাই শক্ত মাশুলে তা কোন আসরই করে না। কিন্তু এই মারে মারা পড়ে তারাই, যারা কুশ্তীগীর নয়। অর্থাৎ যারা কেবলমাত্র কন্যার পিতা অথবা যার কন্যার সংখ্যা তুলনামূলক বেশী।

অনেক ক্ষেত্রে পণ নেওয়ার মত পাপের দায়িত্ব বর অথবা বরের বাপ স্বীকার করতে ইতস্ততঃ করে। একটু দ্বীনদরদী যুবক হলে নিজে পণ চায় না, কিন্তু মা-বাপ চায়। সে যদি তাদের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে মা-বাপের নাকি নাফরমান হয়ে যায়। কারণ, ‘মা-বাপ নারাজ হলে খোদা নারাজ!’ তাদেরকে নারাজ না করে মাতৃ-পিতৃভক্তির পরিচয় দেয় এবং স্রষ্টার অবাধ্য ও সৃষ্টির বাধ্য হয়ে পরের গলায় ছুড়ি চালায়। পক্ষান্তরে অন্যান্য ক্ষেত্রে মা-বাপের কথায় কোন আমলই দেয় না।

আবার মা-বাপকে বললে বলে, ‘ছেলে মানে না, নিতে চায়।’ কিন্তু এই বলে তারা ছেলের কাছে অসহায়তা ও পিতামাতা হবার অযোগ্যতার প্রমাণ দেয়। প্রকৃতপক্ষে এসব কিছুই লুটেরাদের একটা পরিকল্পিত ছলনা মাত্র। পরের টাকা আত্মসাৎ করে সমাজের চোখ থেকে আত্মগোপন করার এক অপকৌশল।

অনেকে এ বড় অঙ্কের অর্থকে ‘পণ’ ব’লে নিতে লজ্জাবোধ করে। তাই ঋণ, সাহায্য  বা ব্যবসার পুঁজি ইত্যাদি নাম দিয়ে সমাজের চোখে ধূলো দিতে চায়। কিন্তু আল্লাহর কাছে তো আর ফাঁকি দেওয়া যায় না।

চিরসাথী, শয্যাসঙ্গিনী ও অর্ধাঙ্গিনীকে  টোপ বানিয়ে তাকে নানারূপ যন্ত্রণা দিয়ে অর্থ শিকারের বুদ্ধি, একটি নারীকে পণবন্দিনী করে সন্ত্রাসীর মত তার বাপের নিকট মুক্তিপণ চাওয়ার কৌশল, নিরীহ নারীকে জুয়ার গুটি করে অর্থলুটার ধান্দা, নির্লজ্জ বেহায়া ভিখারীর মত অন্যের নিকট হাত পেতে অর্থ আদায়ের মত ধৃষ্টতা কি কোন মুসলিম, কোন মানুষের হতে পারে?

শীতের শাল চাই, ঈদের সেলামী চাই, মেলা দেখতে (?!) হাতখরচ চাই, বর্ষায় জামাই ও তার চোদ্দগুষ্ঠির জন্য গামছা চাই, সাতশ পরিবারে বিতরণযোগ্য আম-কাঁঠাল চাই, এ চাই, ও চাই। কোন্ অধিকারে এত চাই-চাই? শুধু এই জন্য নয় কি যে, বিয়াই-বাড়ির একটা মানুষ (বউ)কে খোরপোশ সহ তারা তাদের পদতলে অনুগ্রহ করে আশ্রয় দিয়েছে তাই?!

অথচ একটি জীবন; যে তার যথাসর্বসব, আত্মীয়-সবজন, মা-বাপ সকলকে ছেড়ে তার দৈহিক খিদমতকে শবশুর-শাশুড়ীর এবং তার দেহ-যৌবনকে  স্বামীর পদতলে উৎসর্গ করার কোন মূল্য নেই?

বাকী থাকল যদি কোন মা-বাপ তার মেয়ে-জামাইকে কিছু যৌতুক, কিছু উপহার খুশী হয়ে সেবচ্ছায় দেয়, তবে তা দূষণীয় নয়; না দেওয়া, না নেওয়া। নবী (সাঃ) তাঁর কন্যা ফাতেমাকে কিছু যৌতুক দিয়ে  স্বামীর বাড়ি পাঠিয়েছিলেন। যৌতুক হিসাবে তাঁকে দিয়েছিলেন একটি পশম-নির্মিত সাদা রঙের চাদর বা বিছানা, একটি ইযখির ঘাস-নির্মিত বালিশ এবং একটি চর্ম-নির্মিত পানির মশক।[4]

তবে জামায়ের মনে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং না পেলে অন্তরে ব্যথা বা কারো নিকট অভিযোগ ও কথা যেন না হয়।[5]

মুসলিম সমাজে পণ এক মহামারী। একে রুখবো কিভাবে?

একে রুখার সবচেয়ে বড় ও একমাত্র উপায় হল পাক্কা ঈমান আনা। সমাজ যদি ঈমানের ছায়ায় আশ্রয় নেয় তাহলে এমন আরফার রোদের তাপ হতে সকলেই রেহাই পাবে। পরকালের উপর পূর্ণ বিশ্বাস না এলে এবং আল্লাহর কঠোর শাস্তিকে প্রকৃত ভয় না করলে পণ রুখা সম্ভব নয়। অর্থলোভ বড় মারাত্মক। যত পাওয়া যায় তত পেতে চায় আরো মন। কোন আইন, কোন সংগঠন পারে না এ মনের গতি রোধ করতে। কারণ, আকাশে ফাঁদ পেতে বনের পাখি ধরা অসম্ভব।

দ্বীন ও আল্লাহ-ভীতির মাধ্যমেই সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক শৈথিল্যের প্রগতি (!) বন্ধ হতে পারে। আর তা হলেই মানুষের মন থেকে রিপুর তাড়না দূরীভূত হবে। লোভ ও লিপ্সা কমে গেলে পরের ধনের প্রতি দৃক্পাত হবে না।

আল্লাহর আইন পর্দাপ্রথা প্রচলিত হলে, নারীদেহ নিয়ে অশ্লীল ও নোংরা ছবি, নারীদেহ নিয়ে ব্যবস্যা-বিজ্ঞাপন ইত্যাদি বন্ধ ক’রে, নারী-সৌন্দর্য দুর্লভ ক’রে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করলে নারীকে পুরুষ পণ দিয়ে নয় বরং মন ও ধন দিয়ে খুঁজে আনবে।

সমাজের সকল সদস্যের ঐকান্তিক সত্যাগ্রহ ও প্রচেষ্টা যদি ‘পণ নেব না, পণ দেবও না’ এই শ্লোগানকে কর্মে রূপায়িত করা হয়, তবে  পণ ‘হাড়োল’ এ বন হতে পলায়ন করে বাঁচবে।

সামাজিক যৌথ-বয়কটের মাধ্যমে পণ গ্রহীতাদেরকে অপদস্থ করলে পণপ্রথার বিলোপ সাধন হতে পারে। ‘পণ নেওয়া বিয়েতে অংশ গ্রহণ করব না, সে বিয়ে খাবও না, তার বরযাত্রীও যাব না’ -এই সংকল্প হতে হবে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যতীত তাতেও জয়লাভ সম্ভব নয়।

মসজিদের ইমামগণ পণ নেওয়া বরের বিয়ে না পড়ালে কিছুটা কাজ হতে পারে। তবে এর পরিণাম শুভ নয়। এতেও ভোট হবে আর সে ভোটে জিতে উঠাও কঠিন। কারণ, বর্তমানে সমাজের মানুষ ইমামদের উপদেশ অনুযায়ী চলে খুব কম; পরন্তু ইমামদেরকেই সমাজের নির্দেশ ও আদেশানুসারে বেশীর ভাগই চলতে হয়! তাছাড়া বিয়ে পড়াবার জন্য আরো কত নিম-মোল্লা কাযী বর্তমান।

সুতরাং দ্বীন, দ্বীনদার ও আলেম-ইমামদের যে সমাজে কোন মূল্যায়ন নেই, সে সমাজের ভ্রষ্টতার জন্য কেবল আলেম-ইমামদেরকে দায়ী করা ন্যায্য বিচার হবে না।

এক বড় আশা আছে ভাবী প্রজন্ম কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীর উপর। এদের মধ্যে যদি দ্বীনী চেতনা ফিরিয়ে আনতে পারা যায়, তবে এরা, এই নওজোয়ানেরাই পারবে সমাজের এই দুর্গতির পথ অবরোধ করতে।

) واتقوا الله واعلموا أن الله شديد العقاب)

(হে মানুষ!) ‘‘তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর নিঃসন্দেহে জেনে রাখ যে, আল্লাহর আযাব বড় কঠিন।’’[6]

অতএব হে যুবক বন্ধু! পণ দেখে নয়, বরং দ্বীন ও মন দেখে বিয়ের কথা পাকাপাকি করে ফেল। হ্যাঁ, তবে শুভকাজে দেরী করো না। আর তোমার এই শুভসন্ধিক্ষণে অশুভকে মোটেই স্থান দিও না। তবেই পাবে সেই সঙ্গিনী; যে হবে,

পতিপ্রাণা সতী অনুরাগমতি সবর্গসুষমা-সিক্তা,

প্রীতি-বন্ধনে আসিবে তোমার আপনারে করি রিক্তা।

দেনমোহর


এতক্ষণ এমন এক স্বপ্নজগৎ ও আজব দেশের কথা বলছিলাম যেখানে ‘রাত্তিরেতে বেজায় রোদ, দিনে চাঁদের আলো।’ যে দেশে কিছু কিনতে গেলে ক্রীতবস্ত্তর বিনিময়ে কোন অর্থ দিতে হয় না; বরং বস্ত্তর সাথে ইচ্ছামত অর্থ পাওয়া যায়! এখন বাস্তব-জগতের কথায় আসা যাক।

বিবাহ এক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি।  স্বামী-স্ত্রী উভয়েই একে অন্যের কাছে উপকৃত ও পরিতৃপ্ত। কিন্তু  স্বামীর অধিকার বেশী। তাই স্ত্রীর কর্তব্য অধিক। স্ত্রী তার দেহ-যৌবন সহ  স্বামীর বাড়িতে এসে বা সদা ছায়ার ন্যায়  স্বামী-পাশে থেকে তার অনুসরণ ও সেবা করে। তাই তো এই চুক্তিতে তাকে এমন কিছু পারিতোষিক প্রদান করতে হয় যাতে সে সন্তুষ্ট হয়ে  স্বামীর বন্ধনে আসতে রাজী হয়ে যায়। সৃষ্টিকর্তা সবয়ং মানুষকে এ বিধান দিয়েছেন। তিনি বলেন,

) আমি জানি না আমি কি করছি, কিন্তু আমি জানি না আমি কি করছি।

‘‘উল্লেখিত (অবৈধ) নারীগণ ব্যতীত অন্যান্য নারীগণকে তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে, শর্ত এই যে, তোমরা তোমাদের সবীয় অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে তলব করবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য, ব্যভিচারের জন্য নয়। তাদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা উপভোগ করবে তাদেরকে নির্ধারিত মোহর অর্পণ করবে।’’[1]

তিনি অন্যত্র বলেন,

) وآتوا النساء صدقات نحلة)

‘‘এবং তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্টমনে দিয়ে দাও।’’[2]

আর প্রিয় নবী (সাঃ) বলেন,

সেরা অবস্থার আপনি মুরগি কি করেছেন তা পূরণ করতে হয়।

‘‘সবচেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যা পূরণ করা জরুরী, তা হল সেই বস্ত্ত যার দ্বারা তোমরা (স্ত্রীদের) গুপ্তাঙ্গ হালাল করে থাক।’’[3]

সুতরাং স্ত্রীকে তার ঐ প্রদেয় মোহর প্রদান করা ফরয। জমি, জায়গা, অর্থ, অলঙ্কার, কাপড়-চোপড় ইত্যাদি মোহরে দেওয়া চলে। বরং প্রয়োজনে (পাত্রীপক্ষ রাজী হলে) কুরআন শিক্ষাদান, ইসলাম গ্রহণও মোহর হতে পারে।[4]

মোহর কম হওয়াই বাঞ্ছনীয়। তবে সেবচ্ছায় বেশী দেওয়া নিন্দনীয় নয়। মহানবী (সাঃ) তাঁর কোন স্ত্রী ও কন্যার মোহর ৪৮০ দিরহাম (১৪২৮ গ্রাম ওজনের রৌপ্যমুদ্রা) এর অধিক ছিল না।[5] হযরত ফাতেমা (রাঃ) এর মোহর ছিল একটি লৌহবর্ম।[6] হযরত আয়েশা বলেন, তাঁর মোহর ছিল ৫০০ দিরহাম (১৪৮৭,৫ গ্রাম ওজনের রৌপ্য মুদ্রা)।[7] তবে কেবল উম্মে হাবীবার মোহর ছিল ৪০০০ দিরহাম (১১৯০০ গ্রাম রৌপ্য মুদ্রা)। অবশ্য এই মোহর বাদশাহ নাজাশী মহানবী (সাঃ) এর তরফ থেকে আদায় করেছিলেন।[8]

তাছাড়া তিনি বলেন, ‘‘নারীর বর্কতের মধ্যে; তাকে পয়গাম দেওয়া সহজ হওয়া, তার মোহর সবল্প হওয়া এবং তার গর্ভাশয়ে সহজে সন্তান ধরা অন্যতম।’’[9]

হজরত মূসা (আঃ) তাঁর প্রদেয় মোহরের বিনিময়ে শবশুরের আট অথবা দশ বছর মজুরী করেছিলেন।[10]

মোহর হাল্কা হলে বিবাহ সহজসাধ্য হবে; এবং সেটাই বাঞ্ছিত। পক্ষান্তরে পণপ্রথার মত মোহর অতিরিক্ত বেশী চাওয়ার প্রথাও এক কুপ্রথা।

মোহরের অর্থ কেবলমাত্র স্ত্রীর প্রাপ্য হক; অভিভাবকের নয়। এতে বিবাহের পরে  স্বামীরও কোন অধিকার নেই। স্ত্রী বৈধভাবে যেখানে ইচ্ছা সেখানে খরচ করতে পারে।[11] অবশ্য স্ত্রী সন্তুষ্টচিত্তে সেবচ্ছায়  স্বামীকে দিলে তা উভয়ের জন্য বৈধ।[12]

স্ত্রীকে মোহর না দিয়ে বিবাহ করলে অনেকের নিকট বিবাহ বাতিল।[13]

আক্দের সময় মোহর নির্ধারিত না করলেও বিবাহ শুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু  স্বামী-স্ত্রীর মিলনের পর স্ত্রী সেই মহিলার সমপরিমাণ চলতি মোহরের অধিকারিণী হবে, যে সর্বদিক দিয়ে তারই অনুরূপ। মিলনের পূর্বে  স্বামী মারা গেলেও ঐরূপ চলতি মোহর ও মীরাসের হকদার হবে।[14]

মোহর নির্দিষ্ট না করে বিবাহ হয়ে মিলনের পূর্বেই  স্বামী তালাক দিলে স্ত্রী মোহরের হকদার হয় না। তবে তাকে সাধ্যমত অর্থাদি খরচ-পত্র দেওয়া অবশ্য কর্তব্য।[15]

 বিবাহের সময় মোহর নির্ধারিত করে সম্পূর্ণ অথবা কিছু মোহর বাকী রাখা চলে। মিলনের পর স্ত্রী সে ঋণ মওকুফ করে দিতে পারে। নচেৎ ঋণ হয়ে তা  স্বামীর ঘাড়ে থেকেই যাবে।

মোহর নির্ধারিত করে বা কিছু আদায়ের পর বিবাহ হয়ে মিলনের পূর্বে  স্বামী মারা গেলেও স্ত্রী পূর্ণ মোহরের হকদার হবে। স্ত্রী মারা গেলে  স্বামী মোহর ফেরৎ পাবে না।[16]

মোহর নির্দিষ্ট করে আদায় দিয়ে মিলন করার পর  স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিলে মোহর ফেরৎ পাবে না। মহান আল্লাহ বলেন,

) কিছু লোক আছে যারা নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও পৃথিবী, পৃথিবী, চন্দ্র, চন্দ্র,

‘‘আর যদি এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করা স্থির কর এবং তাদের একজনকে প্রচুর অর্থও দিয়ে থাক, তবুও তা থেকে কিছুই গ্রহণ করো না। তোমরা কি মিথ্যা অপবাদ এবং প্রকাশ্য পাপাচারণ দ্বারা তা গ্রহণ করবে? কিভাবে তোমরা তা গ্রহণ করবে, অথচ তোমরা পরস্পর সহবাস করেছ এবং তারা তোমাদের কাছ থেকে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি নিয়েছে?’’[17]

মোহর ধার্য হয়ে আদায় না করে মিলনের পূর্বেই তালাক দিলে নির্দিষ্ট মোহরের অর্ধেক আদায় করতে হবে। অবশ্য যদি স্ত্রী অথবা যার হাতে বিবাহবন্ধন সে ( স্বামী) মাফ করে দেয়, তবে সে কথা ভিন্ন। তবে মাফ করে দেওয়াটাই আত্মসংযমের নিকটতর।[18]

মিলনের পূর্বে যদি স্ত্রী নিজের দোষে তালাক পায় অথবা খোলা তালাক নেয়, তবে মোহর তো পাবেই না এবং কোন খরচ-পত্রও না।[19] মোহর আদায় দিয়ে থাকলে মিলনের পরেও যদি স্ত্রী খোলা তালাক চায়, তাহলে  স্বামীকে তার ঐ প্রদত্ত মোহর ফেরৎ দিতে হবে।[20]

কোন অবৈধ বা অগম্যা নারীর সাথে ভুলক্রমে বিবাহ হয়ে মিলনের পর তার অবৈধতা (যেমন গর্ভ আছে বা দুধ বোন হয় ইত্যাদি) জানা গেলে ঐ স্ত্রী পূর্ণ মোহরের হকদার হবে। তবে তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ওয়াজেব।[21]

একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে সকল স্ত্রীর মোহর সমান হওয়া জরুরী নয়।[22]

স্ত্রীর মোহরের অর্থ খরচ করে ফেলে  স্বামী যদি তার বিনিময়ে স্ত্রীকে তার সমপরিমাণ জমি বা জায়গা লিখে দেয় তবে তা বৈধ।[23] পক্ষান্তরে অন্যান্য ওয়ারেসীনরা রাজী না হলে কোন স্ত্রীর নামে (বা কোন ওয়ারেসের নামে) অতিরিক্ত কিছু জমি-জায়গা উইল করা বৈধ নয়। কারণ, কোন ওয়ারেসের জন্য অসিয়ত নেই।[24]

পাত্রীর নিকট থেকে ৫০ হাজার (পণ) নিয়ে ১০ বা ২০ হাজার তাকে মোহর দিলে অথবা নামে মাত্র মোহর বাঁধলে এবং আদায়ের নিয়ত না থাকলে অথবা দশ হাজারের দশ টাকা আদায় ও অবশিষ্ট বাকী রেখে আদায়ের নিয়ত না রাখলে; অর্থাৎ স্ত্রীর ঐ প্রাপ্য হক পূর্ণমাত্রায় আদায় দেওয়ার ইচ্ছা না থাকলে এই ধোঁকায় বিবাহ হবে কি না সন্দেহ। অবশ্য একাজ যে আল্লাহর ফরয আইনের বিরুদ্ধাচরণ তাতে কোন সঃন্দেহ নেই।

প্রকাশ যে, মোহর বিজোড় বাঁধা বা এতে কোন শুভলক্ষণ আছে মনে করা বিদআত।

) أيها الذين كفروا ما تذكرون من ربكم ولا تتبعوا من الذين أولياء قليلا ما تذكرون

(হে মানুষ!) ‘‘তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ কর এবং তাঁকে ছাড়া ভিন্ন অভিভাবকদের অনুসরণ করো না। তোমরা খুব অল্পই উপদেশ গ্রহণ করে থাক।’’[25]

বিবাহের পূর্বে দেশাচার


কথা পাকাপাকি হলে বিবাহের দিন হবে। তবে কেবল দিন করার জন্য ঘটা ও আড়ম্বরপূর্ণ মজলিস করা এবং রাজকীয় পান-ভোজনের বিপুল আয়োজন ও ব্যবস্থা করা অপব্যয়ের পর্যায়ভুক্ত। বরপক্ষের উচিৎ, তা খেয়াল রাখা এবং সর্বোত্তম খাওয়ার ব্যবস্থা না হলে দুর্নাম না করা। কেবলমাত্র একজন লোক গিয়ে অথবা না গিয়ে টেলিফোনের মাধ্যমেও বিবাহের দিন ঠিক করা যায়। নিজেদের সুবিধামত যে কোন দিনে যে কোন মাসে দিন স্থির করতে কোন বাধা নেই। আল্লাহর দিন সবই সমান। পঞ্জিকা দেখে শুভাশুভ দিন নির্বাচন বিদআত এবং বিজাতির অনুকরণ।

নিমন্ত্রণ করার সময় নিমন্ত্রণপত্রের কোণে হলুদ লাগিয়ে দেওয়া বিদআত। এতে কোন শুভলক্ষণ আছে বলে মনে করা শির্ক।

এরপর পৃথক করে হলুদ মাখার কাপড় পাঠানো এবং বিবাহ-বন্ধনের  ৫/৭ দিন পূর্বে কনের বাড়ি ‘লগন’ পাঠানোর প্রথা ইসলামী প্রথা নয়। তারপর এর সঙ্গে যায় বরের ভাই-বন্ধু ও বুনাইরা। সাজ-পোশাক, প্রসাধন-সামগ্রীর সাথে পুতুল জরুরী, অনেকে পাঠায় লুডু এবং তাসও! তার সাথে চিনি, পান-সুপারি, মাছ, মুদ্রা, হলুদ মাখার শাড়ি থাকবেই। এই ‘লগন-ধরা’ ও মুখ দেখার অনুষ্ঠান এক ব্যয়বহুল ব্যাপার। এতে যা খরচ হয়, তা একটা ইসলামী বিবাহ মজলিসের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু হায় রে! পরের কান খোলামকুচি দিয়ে মললেও তাতে নিজের ব্যথা কোথায়?

দিনের শেষে অনুষ্ঠিত হয় মুখ দর্শনের অনুষ্ঠান। পাত্রীকে সুসজ্জিতা করে ‘আলম তালা’র (পাত্র-পাত্রীর বসার জন্য বিশেষ সুসজ্জিত বিছানা বা) আসনে বসানো হয়। এরপর অঙ্গরাগে সজ্জিত সেই চেহারা দর্শন করে পাত্রের ঐ ভাই-বন্ধুরা। আঙ্গুলে বা টাকায় চিনি নিয়ে পাত্রীর অধরে স্পর্শ করে! অঙ্গুরীয়র উপহার তার সুসজ্জিত আঙ্গুলে পরিয়ে দেয়, ঘড়ি পরিয়ে দেয় সুদর্শন হাতখানি টেনে! এর ফাঁকে দু’চারটি ঠাট্টা-উপহাস তো চলেই। কারণ, এরা দেওর, নন্দাই, বন্ধু---উপহাসের পাত্র তাই!

অতঃপর সুগোল কব্জিখানিতে সুতো বাঁধে, ললাটে লাগায় হলুদ বাঁটা এবং হাতে দেয় জাঁতি বা কাজললতা! অথচ এদেরকে চেহারা দেখানোও হারাম। প্রিয় নবী (সাঃ) সত্যই বলেছেন,

যদি আপনি লজ্জিত না হন, আপনি যা চান তা করুন।

‘‘লজ্জা না থাকলে যা মন তাই কর।’’[1] অর্থাৎ নির্লজ্জ বেহায়ারাই ইচ্ছামত ধৃষ্টতা প্রদর্শন করতে পারে। পক্ষান্তরে কোন মু’মিন নির্লজ্জ হয় না। কারণ, ‘‘লজ্জা ঈমানের অংশবিশেষ।’’[2]

প্রকাশ যে, এর পর থেকে হাতে বা কপালে সুতো বেঁধে রাখা ও কাজললতা বা জাঁতি সর্বদা সাথে রাখা বিদআত। বরং এর মাধ্যমে যদি কোন মঙ্গলের আশা করা হয়, তবে তা শির্ক।

পাত্র-পাত্রীকে এরপর দিনগুলিতে বাড়ির বাইরে যেতে না দেওয়া। এই দিনে মসজিদ বা পীরের থানে সিন্নি বিতরণ করা প্রভৃতি বিদআত ও শির্ক।

এবার রইল গায়ে হলুদ, তেল চাপানো, সাতুশী ও নাপিতের নখ কাটা প্রভৃতি প্রথা। তেল চাপানোতে সধবা নারী হতে হবে। বিধবা আসতে পাবে না। নির্দিষ্ট কাপড়ে কাবা-মুখে বসিয়ে হলুদ মাখাবে। কাপড়ে লিখা পাত্র-পাত্রীর নাম। পাত্রকে এমন মহিলারা হলুদ মাখাবে যাদের ঐ পাত্রকে দেখা দেওয়া হারাম! পাত্রের এমন অঙ্গে (জাঙ্গে, নাভীর নীচে) হলুদ মাখায় যে অঙ্গ পুরুষকে দেখানোও হারাম। সুতরাং এমন প্রথা ইসলামে কি হতে পারে?

পক্ষান্তরে পুরুষ রঙ ব্যবহার করতে পারে না। তাই হাতে-পায়ে মেহেন্দি লাগাতে পারে না। হলুদ ব্যবহার করাও তার জন্য শোভনীয় নয়। বিশেষ করে হলুদ রঙের পোশাক তার জন্য নিষিদ্ধ।[3]

একদা সাহাবীর গায়ে হলুদ রঙ দেখে নবী (সাঃ) বুঝেছিলেন, তিনি নব-বিবাহিত।[4] সেটা হলুদের রঙ নয়। বরং স্ত্রীর দেহের (মহিলাদের ব্যবহার্য্য একপ্রকার সুগন্ধি) ‘খালুক’এর রঙ; যা তাঁর কাপড়ে লেগে গিয়েছিল।[5]  সুতরাং এটাকে পাত্র-পাত্রীর জন্য হলুদ মাখার বৈধতার দলীল মানা যায় না। হ্যাঁ, তবে যদি কেউ দেহের রঙ ‘কাঁচা সোনার মত উজ্জ্বল’ করার উদ্দেশ্যে নিজ হাতে মেখে ধুয়ে ফেলে, তবে সে কথা ভিন্ন। তাছাড়া বিয়ের পাত্র-পাত্রীর জন্য এই দিয়ে  লগ্ন শুরু করা বিদআত।

অবশ্য পাত্রী হাতে-পায়ে মেহেন্দি ব্যবহার করতে পারে। বরং মহিলাদের হাতে সর্বদা মেহেন্দি লাগিয়ে রাখাই বিধিসম্মত।[6]

এরপর রাত্রে ক্ষীর মুখে দেওয়ার দেশাচার। সাধারণতঃ এ প্রথা পাশর্ববর্তী পরিবেশ থেকে ধার করা বা অনুপ্রবেশ করা প্রথা। আর প্রিয় নবী (সাঃ) বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরণ করে, সে তাদেরই দলভুক্ত।’’[7]

তাছাড়া এমন মহিলারা পাত্রের ওষ্ঠাধর স্পর্শ করে তার মুখে ক্ষীর-মিষ্টি দেয়, যাদের জন্য ঐ পাত্রকে দেখা দেওয়াও হারাম! অনেক সময় উপহাসের পাত্রী (?) ভাবী, নানী হলে হাতে কামড়েও দেওয়া হয়! বরং পাত্রও ভাবীর মুখে তুলে দেয় প্রতিদানের ক্ষীর! অথচ এই ‘‘স্পর্শ থেকে তার মাথায় সুচ গেঁথে যাওয়াও উত্তম ছিল।’’[8]

 অনুরূপ করে পাত্রীর সাথেও তার উপহাসের পাত্ররা! বরং যে ক্ষীর খাওয়াতে যায় তার সাথেও চলে বিভিন্ন মস্করা।

আর তার সাথে চলে ‘গীত-পার্টি’ যুবতীদের গীত। শুধু গীতই নয় বরং অশ্লীল গীত ও হাততালি সহ ঢোল-বাদ্য বাজিয়ে গীত। এর সঙ্গে থাকে ‘লেডি ড্যান্স’ বা নাচ। আর শেষে বিভিন্ন অশ্লীল ও অবৈধ অভিনয় বা ‘কাপ’! এমন পরিস্থিতি দেখে-শুনে প্রত্যেক রুচিবান মুসলিম তা ঘৃণা করতে বাধ্য। কিন্তু বহু রুচিহীন গৃহকর্তা এসব দেখে-শুনেও শুধু এই বলে ভ্রূক্ষেপ করে না যে, ‘আম কালে ডোম রাজা, বিয়ে কালে মেয়ে রাজা।’ ফলে ইচ্ছা করেই অনুগত প্রজা হয়ে তাদেরকে নিজ অবস্থায় ছেড়ে দেয় অথবা মেয়েদের ধমকে বাধ্য হয়েই চুপ থাকে। তাই নিজ পরিবারকে নির্লজ্জতায় ছেড়ে দিয়ে বাড়ির বাইরে রাত কাটাতেও লজ্জা করে না। অথচ ‘‘গৃহের সমস্ত দায়িত্ব সম্পর্কে কিয়ামতে গৃহকর্তার নিকট কৈফিয়ত তলব করা হবে।’’[9]

এই ধরনের অসার ও অশ্লীল মজলিসে কোন মুসলিম নারীর উপস্থিত হওয়া এবং ক্ষীর খাওয়ানো নিঃসন্দেহে হারাম। যেমন মহিলাদের এই কীর্তিকলাপ দর্শন করা বা নাচে ফেরি দেওয়া পুরুষদের জন্য বিশেষভাবে হারাম। এমন নাচিয়েকে ফেরি দেওয়ার বদলে তার কোমর ভেঙ্গে দেওয়া উচিৎ মুসলিমের---বিশেষ করে তার অভিভাবকের। কিন্তু হায়! ‘শাশুড়ী যদি দাঁড়িয়ে মুতে, তাহলে বউ তো পাক দিয়ে দিয়ে মুতবেই!’

আইবুড়ো বা থুবড়া ভাতের (অবিবাহিত অবস্থার শেষ অন্নগ্রহণের) অনুষ্ঠানও বিজাতীয় প্রথা। এই দিনের ক্ষীর-সিন্নি বিতরণও বিদআত। বরং পীরতলায় বিতরণ শির্ক। আর এই দিন সাধারণতঃ পাকান বা বাতাসা বিতরণ (বিক্রয়ের) দিন। যাদেরকে এই পাকান বা মিষ্টি দেওয়া হবে তাদেরকে পরিমাণ মত টাকা দিয়ে ‘ভাত’ খাওয়াতেই হবে। না দিলে নয়। এই লৌকিকতায় মান রাখতে গিয়েও অনেকে লজ্জিত হয়। সুতরাং এসব দেশাচার ইসলামের কিছু নয়।

তারপর আসে তেল নামানোর পালা। ঝোমর ডালা হয় পাত্র বা পাত্রীকে কেন্দ্র করে হাততালি দিয়ে গীত গেয়ে ও প্রদক্ষিণ করে!

এ ছাড়া আছে শিরতেল ঢালার অনুষ্ঠান। সধবাদের হাতের উপরে হাত, স্বার উপর নোড়া, তার উপর তেল ঢালা হয় এবং তা পাত্রীর মাথায় গড়িয়ে পড়ে। এই সঙ্গে আরো কত কি মেয়েলি কীর্তি। তাছাড়া এ প্রথা সম্ভবতঃ শিবলিঙ্গ পূজারীদের। কারণ, অনেকেই এই প্রথাকে ‘শিবতেল ঢালা’ বলে থাকে। তাছাড়া এর প্রমাণ হল শিবলিঙ্গের মত ঐ নোড়া!

সুতরাং যে মুসলিম নারীরা মূর্তিপূজকদের অনুরূপ করে তারা রসুলের বাণীমতে ওদেরই দলভুক্ত। আর এদের সঙ্গে দায়ী হবে তাদের অভিভাবক ও  স্বামীরাও।

এই দিনগুলিতে ‘আলমতালায়’ বসার আগে পাত্র-পাত্রীর কপাল ঠেকিয়ে আসনে বা বিছানায় সালাম বিদআত। কোন বেগানা (যেমন বুনাই প্রভৃতির) কোলে চেপে আলম-তালায় বসা হারাম। নারী-পুরুষের (কুটুম্বদের) অবাধ মিলা-মিশা, কথোপকথন মজাক-ঠাট্টা, পর্দাহীনতা প্রভৃতি ইসলাম বিরোধী আচরণ ও অভ্যাস। যেমন রঙ ছড়াছড়ি করে হোলী (?) ও কাদা খেলা প্রভৃতি বিজাতীয় প্রথা। এমন আড়ম্বর ও অনুষ্ঠান ইসলামে অনুমোদিত নয়।

সুতরাং মুসলিম সাবধান! তুলে দিন ‘আলমতালা’ নামক ঐ ‘রথতালা’কে পরিবেশ হতে। পাত্র-পাত্রীও সচেতন হও! বসবে না ঐ ‘রথতালা’তে। ক্ষীর খাবে না এর-ওর হাতে। কে জানে ওদের হাতের অবস্থা কি? ছিঃ!

বিবাহের দিন


বিবাহ বন্ধন ও মজলিসের জন্য বর, কনে ও অভিভাবক ছাড়া আর মাত্র দুটি লোকের প্রয়োজন। তাও তো মিনিট কয়েকের ব্যাপার। কিন্তু এত বিপুল আয়োজন, এত ঘটা কিসের? এগুলো লোক প্রদর্শন নয় কি? ১০/২০টা ডুলার বিবি, ৮০/১০০টা বরযাত্রী; তাতে অমুসলিমও থাকবে! এত লোকের রাখা ও খাওয়ানোর দায়িত্ব পাত্রীপক্ষের ঘাড়ে। কোন অধিকারে? ‘এত জন পারব না’ বললেও উপায় নেই। সমস্ত কুটুম্বের মান রাখতেই হবে। জোর করে যাবে ১০০ জন বরযাত্রী। পাত্রীপক্ষ বাধ্য হয়েই রাজী হয়। এটা কি যুলুম নয়? যুলুম করে কি কারো বাড়িতে নিমন্ত্রণ খাওয়া চলে? এমন পেটুকেরা কি লুটেরা নয়? কুটুম বুঝাতে নিজে খাওয়াও। পরের ঘাড়ে কেন কুটুমের মান রাখ? নাকি ‘পরের লেজে পা পড়লে তুলোপানা ঠেকে, আর নিজের লেজে পা পড়লে ক্যঁাক করে ডাকে।’ তাই না?

জোরের বরযাত্রী ভোর থেকেই প্রস্ত্তত। গতকাল পাত্র-পাত্রী সোঁদা ও আটা মেখে গায়ের হলুদ তুলে (আমপাতা দেওয়া) পানিতে গোসল করেছে। বর তার দাড়িগুলোকে বেশ তেল পারা করে চেঁছে মসৃণ গাল বের করেছে! আজ তাদের নবজীবনের নতুন প্রভাত। চারিদিক খুশীতে ডগমগ। কিন্তু কার খেয়াল থাকে যে, ‘কারো পৌষমাস, আর কারো বা সর্বনাশ।’ ‘কারো মোজ হয়, কেউ আমাশয় যায়।’

বর সাজানোর ধুম চলছে বাড়ির এক প্রান্তে। (নিজের অথবা সরকারী) ভাবীরা বরকে ঘিরে পরম আদরে কপালে চুন-কুমকুমের ফোটা, মাথায় মুকুট, গলায় ফুলের মালা, আঙ্গুলে সোনার অঙ্গুরীয়, গলায় সোনার হার, জামায় সোনার বোতাম, গায়ে রেশমের বা হলুদ কিংবা জাফরানী রঙের রুমাল বাঁধা হচ্ছে। যার প্রত্যেকটিই হারাম।

অন্য দিকে শাড়ি দেওয়া হয়নি বলে বড় ভাবী রাগ করেছে; তাই ডুলার বিবি যাবে না। ছোট বুনুইকে জামা-প্যান্ট দেওয়া হয়নি বলে রাগ করেছে; তাই বরযাত্রী যাবে না। বন্ধুকে বরযাত্রী না নিয়ে গেলে সেজো ভাইও বিয়েতে যাবে না বলছে। ও পাড়ার সাজু রাগ করেছে, সেও বরযাত্রী যাবে না। কারণ, তার চাচাকে বরযাত্রী বলা হয়নি তাই! ওদের সকলের রাগ মানাবার চেষ্টা চলছে।

বরকে কোলে তুলে পাল্কি বা গাড়িতে বসালো তার বুনাই অথবা চাচাতো ভাই। মা এল তেলের ভাঁড় ও পানির বদনা হাতে ছেলের কাছে। কয়জন মেয়ে মা-বেটাকে দিল কাপড়  ঢেকে। মা ছেলের পায়ে তেল দিয়ে পানি দ্বারা পা ধুয়ে দিল! সস্নেহে জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথায় যাচ্ছ বাবা?’ ছেলে সত্বর জবাব দিল, ‘তোমার জন্য দাসী আনতে যাচ্ছি মা!’ এরপর  গাড়ি বা পাল্কি ছুটে পাত্রীর গ্রাম বা শহরের দিকে।

বলাই বাহুল্য যে, পূর্বের ঐ কীর্তিগুলো ইসলামের কিছু নয়। পরন্তু পয়সা নিয়ে দাসী আনার প্রভাব বহু সংসারেই বহু বধূর উপর পড়ে থাকে।

বরযাত্রীর গাড়ি পূর্বেই ছুটেছিল। থামল গ্রামের বাইরে। কেউ কোত্থাও নেই। ব্যাপার কি? এত অসামাজিক পাত্রীপক্ষ! নিমন্ত্রণ করতে বা আগে বাড়িয়ে (সংবর্ধনা জানিয়ে) নিতে আসে নি কেউ! দাওয়াত না দিলে কি কারো বাড়ি মেহেমান যাওয়া হয়। এত নীচ ও ছোঁচা নয় বরপক্ষ। তবে জালেম নিশ্চয় বটে। কারণ, জোরপূর্বক তো এত লোক সঙ্গে এনেছে তারা। জোর করে মেহেমান এসে আবার দাওয়াতের অপেক্ষা কেন? জালেমের মত ঢুকে পড়, আর লুটেরার মত পেটে ভর। দোষ কি তাতে? দেশাচার তো! নির্মম শোষণ হলেই বা ক্ষতি কি?

রাগ নিয়েই প্রবেশ করে বরযাত্রী। কনেপক্ষ ভুল স্বীকার করে কত কষ্টে রাগ মানায়। তবুও অসংগত মন্তব্য থেকে রেহাই পায় না। আবার এখানে তো ‘বাবু যত বলে, পারিষদ্ দলে বলে তার শতগুণ।’ কে কার মুখে হাত দেবে? যদি বিয়ে ঘুরে যায়!

বরানুগমন হলে সসম্মানে তাকে কোলে করে নামানো হয়। প্রথমে মসজিদে সালাম (?) অথবা দুই রাকআত নামায পড়ানো হয়। (এটি বিদআত, অবশ্য মসজিদে গেলে বা মসজিদে বিয়ে রাখলে সকলকেই তাহিয়্যাতুল মসজিদ দু’রাকআত পড়তে হয়। প্রকাশ যে, মসজিদে বিয়ে রেখে বরযাত্রীদের ধুমপান, অসংগত কথাবার্তা প্রভৃতি দ্বারা তার পবিত্রতা হানি করা অবশ্যই হারাম।) এরপর পীরতলায়, ইমামতলায় সালাম (?) করানো হয়। তারপর (কোন কোন এলাকায়) শবশুরবাড়িতে নিয়ে গিয়ে বরাসন সাত চক্র তওয়াফ করিয়ে বসানো হয়। এই সময় নাকি কনে লুকিয়ে কোন ফাঁক থেকে বরকে দেখে (পছন্দ করে) থাকে। কিন্তু এ সময় অপছন্দ হলেও কি বিয়ে ফিরিয়ে দিতে পারবে?

অতঃপর বর আসে বিবাহ মজলিসের ‘আলম তালায়।’ বড় বিনীত হয়ে রুমাল হাতে নিয়ে ঝুঁকে বিছানায় সালাম (?) করে। কি জানি, ‘আসসালামু আলাইকুম’ ব’লে সালাম হয়তো জানেও না। এরপর কেবলা মুখে নামাযে বসার মত (প্রায় সর্বদাই বসে)।

এই সময় অনেক জায়গায় প্যান্ডেলের গেটে দাঁড়িয়ে দুই প্রসাধিকা যুবতী কপালে  চন্দনের ফোটা দিয়ে এবং গলায় ফুলের মালা পরিয়ে বর ও বরযাত্রী বরণ করে!

তারপর শুরু খাওয়া-দাওয়া ও ভুঁড়িভোজন; অর্ধেক খাওয়া, অর্ধেক ফেলা। মিষ্টিখোরের দল তো গোনা-গাঁথা ৭০/৮০ টা রসগোল্লা খাবেই। না পারলে নিংড়ে-নিচুরে, চুরি করে লঙ্কা কামড়ে বা লেবু চুসেও পেটে ভরবে। পরে বমি হয়ে গেলেও ছাড়বে কেন? পয়সা তো লাগছে না।

এর পরেও যদি কিছু আনতে বা দিতে একটু বিলম্ব হয় তাহলে প্লেট উবুর হবে অথবা ফেলা হবে ছুঁড়ে! আরো কত অশালীন আচরণ এই বদ্যাত্রীদের! কিসের এত দাপ্, কেন এত বাপুত্তি অধিকার ফলানো? কারণ, হয়তো পাত্রীর বাপ চোরের দায়ে ধরা পড়েছে তাই। কন্যাদায় থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বরপক্ষের এত পায়ে ধরা। খাইয়ে-দাইয়েও যদি তারা গালে চড়ও মারে, তবুও গাল পেতে নীরবে সহ্য করে নিতে হবে। নচেৎ যদি বিয়ে ঘুরে যায়! নিহাতই মজবুর পাত্রীপক্ষ!

মহান আল্লাহ বলেন,

</ S> </ s> </ s> </ s> </ s> </ s> </ s> </ s> </ s> </ s> </ s> </ s> </ s> </ s> </ s> </ s>

  ‘‘তোমরা পানাহার কর, কিন্তু অপচয় করো না। তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’’[1]

) ولا تبذر تبذيرا - إن المبذرين كانوا إخوان الشياطان وكان الشيطان لربه كفورا)

‘‘আর তোমরা কিছুতেই অপব্যয় করো না। যারা অপব্যয় করে তারা অবশ্যই শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।’’[2]

) নবুওয়াতের নবুওয়াত হ'ল সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বজ্ঞ। 

‘‘তাদের বিরুদ্ধেই (শাস্তির) ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে যারা মানুষের উপর অত্যাচার করে এবং পৃথিবীতে অহেতুক বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়।’’[3]

) إنه لا يحب الظالمين)

‘‘আর তিনি অত্যাচারীদেরকে পছন্দ করেন না।’’[4]

দয়ার নবী (সাঃ) বলেন,

المسلم أخو المسلم لا يظلمه ولا يخذله ولا يحقره হ্যাঁ, আমি দুঃখিত ... আমি দুঃখিত।

‘‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। কেউ কারো প্রতি যুলুম করবে না এবং কেউ কাউকে অসহায় ছেড়ে দেবে না। তাকওয়া হল হৃদয়ের জিনিস। আর কোন মানুষের মন্দের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে ঘৃণা করে। পরন্তু প্রত্যেক মুসলিমের জান, মাল ও ইজ্জত প্রত্যেক মুসলিমের জন্য হারাম করা হয়েছে।[5]

পাঠকমাত্রেই আশা করি বুঝতে পেরেছেন যে, উপর্যুক্ত কর্মকান্ড ও বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের সপক্ষে কোন সমর্থনই ইসলামে নেই। তাছাড়া পাত্রীপক্ষের প্রতি এমন অভদ্র আচরণ শুধু ইসলাম বিরোধীই নয়; বরং অমানবিকও।

এখানে পাত্রীপক্ষেরও উচিৎ নয় কষ্ট স্বীকার করে নাম কিনতে যাওয়া এবং অপব্যয় করে বিভিন্ন খাদ্যের ভ্যারাইটিজ প্রস্ত্তত করা। কারণ, ‘‘অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।’’[6] যেমন মেহেমানদের অসম্মান হতে না দেওয়াও তাদের কর্তব্য।

ওদিকে ডুলার (দোলার) বিবিরাও পর্দার ডুলি থেকে বের হয়ে বেগানা পুরুষের হাতে খাওয়া-দাওয়ার কর্তব্য (?) পালন করছে। আর মনে মনে চিন্তা করছে ‘কে কেমন কাপড় উপহার পাবে।’ কাপড় খারাপ হলে তো রেহাই নেই।

বিবাহ-বন্ধন


ইসলাম এক সুশৃঙ্খল জীবন-ব্যবস্থা। বিবাহ কোন খেলা নয়। এটা হল দু’টি জীবনের চির-বন্ধন। তাই এই বন্ধনকে সুশৃঙ্খলিত ও শক্ত করার উদ্দেশ্যে ইসলামে রয়েছে বিভিন্ন নিয়ম-নীতি।

ইসলামী বিবাহ-বন্ধনের জন্য প্রথমতঃ শর্ত হল পাত্র-পাত্রীর সম্মতি। সুতরাং তারা যেখানে বিবাহ করতে সম্মত নয় সেখানে জোরপূর্বক বিবাহ দেওয়া তাদের অভিভাবকের জন্য বৈধ নয়। প্রিয় নবী (সাঃ) বলেন, ‘‘অকুমারীর পরামর্শ বা জবানী অনুমতি না নিয়ে এবং কুমারীর সম্মতি না নিয়ে তাদের বিবাহ দেওয়া যাবে না। আর কুমারীর সম্মতি হল মৌন থাকা।[1]

সুতরাং অকুমারীর জবানী অনুমতি এবং কুমারীর মৌনসম্মতি বিনা বিবাহ শুদ্ধ হয় না। এই অনুমতি নেবে কনের বাড়ির লোক।

নাবালিকার বিবাহ তার অভিভাবক দিতে পারে। হযরত আয়েশা (রাঃ) এর বিবাহ হয়েছিল ৬ বছর বয়সে এবং বিবাহ-বাসর হয়েছিল ৯ বছর বয়সে।[2] সম্মতি না নিয়ে অভিভাবক অপাত্র, ফাসেক, শারাবী, ব্যভিচারী, বিদআতী বা কোন অযোগ্য পুরুষের হাতে তুলে দিলে মহিলা সাবালিকা হওয়ার পর নিজে কাজীর নিকট অভিযোগ করতে পারে। ইচ্ছা করলে বিবাহ অটুট রেখে ঐ  স্বামীর সাথেই সংসার করতে পারে, নচেৎ বাতিল করাতেও পারে।[3]

পাত্রীর জন্য তার অলী বা অভিভাবক জরুরী। বিনা অলীতে বিবাহ বাতিল।[4]

এই অলী হবে সাবালক, সুস্থমস্তিষ্ক ও সুবোধসম্পন্ন সচেতন মুসলিম পুরুষ। যেমন পাত্রীর পিতা, তা না হলে দাদো, না হলে ছেলে বা পোতা, না হলে সহোদর ভাই, না হলে বৈমাত্রেয় ভাই, না হলে আপন চাচা, নচেৎ পিতার বৈমাত্রেয় ভাই, না হলে চাচাতো ভাই অনুরূপ নিকটাত্মীয়।

সুতরাং বৈপিত্রেয় ভাই, ভাইপো, নানা, মামা অলী হতে পারে না। অনুরূপ মা বা অন্য কোন মহিলার অভিভাবকত্বে বা আদেশক্রমে বিবাহ হবে না।[5] যেমন, নিকটের অলী থাকতে দূরের অলীর; যেমন বাপ থাকতে দাদোর বা দাদো থাকতে ভায়ের অভিভাবকত্বে নারীর বিবাহ হয় না।

অনুরূপ পালয়িতা বাপ কোন অলীই নয়। যার কোন অলী নেই তার অলী হবে কাজী।[6]

বাপ নাস্তিক বা কবরপূজারী হলে মেয়ের অলী হতে পারে না।[7]

অভিভাবক ছাড়া নারীর বিয়ে হয় না। যেহেতু পুরুষের ব্যাপারে তার মোটেই অভিজ্ঞতা থাকে না। আবেগ ও বিহ্বলতায়  স্বামী গ্রহণে ভুল করাটাই তার স্বাভাবিক, তাই  পুরুষ অভিভাবক জরুরী। তবে অবৈধ অভিভাবকত্ব কারো চলবে না।[8] সাধ্যমত সুপাত্র ও যোগ্য  স্বামী নির্বাচন ছাড়া খেয়াল-খুশী মত যার-তার সাথে মেয়ের বিবাহ দিতে পারে না। যেহেতু  অভিভাবকত্ব এক বড় আমানত। যা নিজের স্বার্থে যেখানে খুশী সেখানে প্রয়োগ করতে বা নিজের কাছে ভরে রাখতে পারে না। যথাস্থানে তা পৌঁছে দেওয়া ফরয। মহান আল্লাহ বলেন,

) أيها الذين آمنوا لا تخونوا الله والرسول وتخونوا أماناتكم)

‘‘হে মুমিনগণ! তোমরা জেনে-শুনে আল্লাহ ও রসূলের খেয়ানত করো না এবং তোমাদের (গচ্ছিত) আমানতেরও নয়।’’[9]

) ঈশ্বর সব জুয়ান Kfour ভালবাসা না (

‘‘তিনি কোন খেয়ানতকারী (বিশ্বাসঘাতক) অকৃতজ্ঞকে ভালোবাসেন না।’’[10]

) ঈশ্বর আপনাকে তার লোকদের কাছে সচিবালয় পরিচালনার নির্দেশ দেন (

‘‘আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আমানত তার যথার্থ মালিককে প্রত্যর্পণ কর---।’’[11]

তাছাড়া ‘‘প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে তার দায়িত্ব প্রসঙ্গে কিয়ামতে কৈফিয়ত দিতে হবে।’’[12]

সুতরাং যেমন অপাত্রে কন্যাদান হারাম। অনুরূপ সুপাত্র পাওয়া সত্ত্বেও কন্যাদান না করাও হারাম। কন্যার সম্মতি সত্ত্বেও নিজস্ব স্বার্থে বিবাহ না  দেওয়া অভিভাবকের অবৈধ কর্তৃত্ব। অলী এমন বিবাহে বাধা দিলে পরবর্তী ওলী বিবাহ দেবে। নচেৎ বিচার-বিবেচনার পর কাজী তার বিবাহের ভার নেবেন।[13]

মহান আল্লাহ বলেন,

) আল-তা'আমাক আল-আলাসা ফাবাবিন-উল-জুয়ালিয়া-ফা-প্রিজলোব-তাদের বংশধরেরা

‘‘আর তোমরা যখন স্ত্রীদের বর্জন কর এবং তারা তাদের ইদ্দত পূর্ণ করে, তখন তাদেরকে তাদের  স্বামী গ্রহণ করতে বাধা দিও না।’’[14]

ইসলামী বিবাহে আকদের সময় ২টি সাক্ষী অবশ্য জরুরী।[15]

পাত্র-পাত্রী যদি বিবাহে কোন শর্ত লাগাতে চায় তাহলে তা লাগাতে পারে। তবে সে শর্ত যেন কোন হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল না করে। এরূপ হলে সে শর্ত পালন ওয়াজেব নয়। সুতরাং পাত্রপক্ষ যদি মোহর না দেওয়ার শর্ত আরোপ করে, তবে তা গ্রহণযোগ্য ও পালনীয় নয়। বরং অনেকের মতে আক্দ শুদ্ধই হবে না। কারণ, মোহর দেওয়া ওয়াজেব, যদিও তা সামান্যই হোক না কেন। অনুরূপ যদি পাত্রীপক্ষের নিকট থেকে কিছু (পণ) পাওয়ার শর্ত লাগিয়ে পাত্র বিবাহ করে, তবে সে শর্ত পালন পাত্রীপক্ষের জন্য ওয়াজেব নয়।[16]

আক্দ কিভাবে হয়?


মোহরাদি ধার্য ইত্যাদি হয়ে থাকলে কাজী বা ইমাম সাহেব সূক্ষ্মভাবে খোঁজ নেবেন যে, অলী কে এবং শরয়ী কিনা? বরের চার স্ত্রীর বর্তমানে এটা পঞ্চম বিবাহ তো নয়? বর মুসলিম তো? পাত্রী ইদ্দতের মধ্যে তো নয়? গর্ভবতী তো নয়? পাত্রের দ্বিতীয় বিবাহ হলে পূর্বের স্ত্রীর বর্তমানে এই পাত্রী তার বোন, ফুফু, বুনঝি বা ভাইঝি তো নয়। এই পাত্রী সধবা হয়ে কারো  স্বামীত্বে নেই তো? পাত্রীর দ্বিতীয় বিবাহ হলে তার পূর্ব স্বামী যথারীতি তালাক দিয়েছে তো? পাত্রী রাজী আছে তো? পাত্রীর কোন বৈধ শর্ত তো নেই? দু’জন সঠিক ও উপযুক্ত সাক্ষী আছে কিনা? ইত্যাদি।

অতঃপর সহীহ হাদীসসম্মত খুৎবা পাঠ করবেন। খুতবায় উল্লেখিত আয়াত আদির অনুবাদ পাত্রকে বুঝিয়ে দেওয়া উত্তম। প্রকাশ যে, এ খুৎবা আক্দের জন্য জরুরী নয়, সুন্নত। অতঃপর অলীকে বলতে বলবেন অথবা তার তরফ থেকে উকীল হয়ে বরের উদ্দেশ্যে একবার বলবেন, ‘এত টাকা দেনমোহরের বিনিময়ে অমুক গ্রামের অমুকের কন্যা অমুকের (স্পষ্ট নাম উল্লেখ করে) তোমার সাথে বিবাহ দিচ্ছি।’

পাত্র বলবে , ‘আমি এই বিবাহ কবুল করছি।’

এরপর সকলে বরের উদ্দেশ্যে একাকী এই দুআ করবে,

بارك الله لك وبارك عليك وجمع بينكما في خير

উচ্চারণঃ- বা-রাকাল্লা-হু লাকা অবা-রাকা আলাইকা অজামাআ বাইনাকুমা ফী খাইর।

অর্থাৎ, আল্লাহ তোমার প্রতি বর্কত বর্ষণ করুন, তোমাকে প্রাচুর্য দান করুন এবং তোমাদের উভয়কে মঙ্গলের মাঝে একত্রিত করুন।[1]

বাহ্যিক আড়ম্বরহীন ইসলামে এইখানে বিবাহের আসল কর্ম শেষ।

জ্ঞাতব্য বিষয় যে, আক্দের সময় কনে মাসিকাবস্থায় থাকলেও কোন ক্ষতি নেই। তবে সেই সময়ে বাসরশয্যায় না পাঠানোই উচিৎ।

বর বোবা হলে ইশারা ও ইঙ্গিতে কবুল গ্রহণযোগ্য।[2] হাতের লিখা পরিচিত হলে চিঠি আদান-প্রদান করে আক্দ সম্ভব। তবে চিঠি দেখিয়ে প্রস্তাব ও কবুলের উপর ২জন সাক্ষী রাখা জরুরী।[3] বর জ্ঞানশূন্য বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকলে আক্দ সহীহ নয়।[4]  টেলিফোনে ধোঁকার আশঙ্কা থাকার জন্য আক্দ শুদ্ধ নয়।[5]

পাত্র-পাত্রী দেখাদেখি না হয়ে কোন ইজতেমায় চোখবন্ধ করে কেবল আবেগবশে বিবাহ যুক্তিযুক্ত নয়।

পাকা দলীল রাখার জন্য বিবাহের বর, কনে, অলী, সাক্ষী প্রভৃতির নাম ও স্বাক্ষর এবং মোহর, শর্ত ইত্যাদি (কাবিল বা কবুলনামা) লিখে নেওয়া দোষের নয়।

বরের দ্বিতীয় বিবাহ হলে প্রথমা স্ত্রীর অনুমতি জরুরী নয়।[6]

এ ছাড়া বর্তমানের ইয্ন নেওয়ার অনুষ্ঠান এবং উকীল ও সাক্ষী সহ কনের ইয্ন আনতে যাওয়ার ঘটার সমর্থন শরীয়তে মিলে না। বিবাহ আক্দের জন্য সাক্ষী জরুরী, কনের ইয্নের জন্য নয়। এর জন্য কনের অভিভাবকই যথেষ্ট। অবশ্য অভিভাবকের পক্ষ থেকে ধোঁকা বা খেয়ানতের আশঙ্কা থাকলে কাযী নিজে অথবা তাঁর প্রতিনিধি পর্দার আড়াল থেকে কনের মতামত জানবে।

এছাড়া ইয্ন নেওয়ার জন্য কনেকে যেখানে বসানো হবে সেখানে লাতা দেওয়া, কনেকে উল্ট করে শাড়ি-সায়া-ব্লাউজ পরানো, কনের হাতে চুড়ি না রাখা, মাথার খোঁপা বা বেণী না বাঁধা, (অনেক এলাকায়) সুতির শাড়ি পরা জরুরী মনে করা, কনেকে পিঁড়ের উপর মহিলা-মজলিসের মাঝে পশ্চিম-মুখে বসানো এবং পর্দার আড়াল থেকে তিন বার ‘হুঁ’ নেওয়া, এই সময় কাঁসার থালায় গোটা পান-সুপারী (দাঁড়া-গুয়া-পান) (!) সহ জেওর-কাপড় বিবাহ মজলিস ও কনের কাছে নিয়ে যাওয়া-আসা, বিবাহ না পড়ানো পর্যন্ত কনের মায়ের রোযা রাখা (না খাওয়া) ইত্যাদি বিদআত ও অতিরিক্ত কর্ম।

যেমন আক্দের পর হাত তুলে জামাআতী (সাধারণ) দুআ। আক্দের পূর্বে বা পরে মীলাদ (জামাআতী দরূদ) পড়া, বরের দুই রাকআত নামায পড়া, উঠে মজলিসের উদ্দেশ্যে সালাম ও মুসাফাহা করা, নিজের হাতে ইমাম, উকীল ও সাক্ষীদেরকে ওলীমাহ (?) দেওয়া, শরবত ও পান হালাল করা, আক্দে তিন-তিন বার কবুল করানো, বরকে পশ্চিমমুখে বসানো, মাথায় টুপী জরুরী মনে করা ইত্যাদি বিদআত।[7]

বিবাহ-বন্ধনের পূর্বে বরকে কলেমা পড়ানোও বিদআত এবং বরের প্রতি কুধারণা। মুসলিম হওয়ায় সন্দেহ থাকলে পূর্বেই খবর নেওয়া দরকার। কারণ, তার সাথে কোন মুসলিম মেয়ের বিবাহ বৈধই নয়। তাছাড়া মুখে কলেমা পড়িয়ে কাজে যেমনকার তেমনি থাকলে মুসলিম হয় কি করে? পক্ষান্তরে পাত্রী কলেমা জানে কি না, তাও তো দেখার বিষয়? কিন্তু তা তো কই দেখা হয় না।

প্রকাশ থাকে যে,  স্বামী-স্ত্রী উভয়ে একই সাথে ইসলাম গ্রহণ করলে অথবা কুফরী বা রিদ্দাহ থেকে তওবা করলে ইসলাম বা তওবার পূর্বের বিবাহ-বন্ধন পরেও বজায় থাকবে। পক্ষান্তরে দুজনের ইসলাম বা তওবা যদি আগে-পরে হয়, তবে সে ক্ষেত্রে স্ত্রীর আগে  স্বামী ইসলাম গ্রহণ বা তওবা করলে তার কিতাবিয়াহ (সাধবী ইয়াহুদী বা খ্রিষ্টান) স্ত্রী ছাড়া বাকী অন্য ধর্মাবলম্বী স্ত্রীর সাথে যে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল, তা ছিন্ন হয়ে যাবে। অতঃপর (বিবাহের পর মিলন হয়ে থাকলে) সে তার ইদ্দতের মাঝে ইসলাম গ্রহণ বা তওবা করলে আর পুনর্বিবাহের প্রয়োজন হবে না। প্রথম বন্ধনেই  স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বজায় থাকবে। কিন্তু স্ত্রী যদি ইদ্দত পার হওয়ার পর ইসলাম গ্রহণ বা তওবা করে, তাহলে  স্বামীর কাছে ফেরৎ যাওয়ার জন্য নতুন আক্দের প্রয়োজন হবে। অন্যথায় স্ত্রী যদি  স্বামীর আগে ইসলাম গ্রহণ বা তওবা করে, তাহলে তার  স্বামী যে ধর্মাবলম্বীই হোক তার পক্ষে হারাম হয়ে যাবে। অতঃপর তার ইদ্দতকালের মধ্যে  স্বামী ইসলাম গ্রহণ বা তওবা করলে তাদের পূর্ব বিবাহ বহাল থাকবে। নচেৎ ইদ্দত পার হয়ে গেলে নতুন আক্দের মাধ্যমেই  স্বামী-স্ত্রী এক অপরকে ফিরে পাবে।

ইমাম বা কাজীকে খুশী হয়ে আক্দের পর কিছু উপহার দেওয়া যায়। এখানে দাবী ও জোরের কিছু নেই।[8] দাই-নাপিত বিদায়ের সময় জোরপূর্বক পয়সা আদায়ের প্রথা ইসলামী নয়।  বিবাহের সময় তাদের কোন কর্ম বা হক নেই।[9]

কাযায়ী গ্রহণও এক কুপ্রথা। বিশেষ করে এ নিয়ে ঝগড়া-কলহ বড় নিন্দার্হ। গ্রাম্য চাঁদা হিসাবে যদি এমন অর্থের দরকারই হয়, তবে নিজের গ্রামের বিয়ে-বাড়ি থেকে কিছু চাঁদা বা ভাড়া নেওয়া যায়। যেটা অন্য গ্রামে দিতে হয় সেটা নিজ গ্রামে দিলে ঝামেলা থাকে না।

বিবাহ মজলিসে বরের বন্ধু-বান্ধবদের তরফ থেকে অশ্লীল প্রশ্নোত্তর সম্বলিত হ্যান্ড্বিল প্রভৃতি বিতরণ করা ঈমানী পরিবেশের চিহ্ন নয়।

আকদের পর দেশাচার


এরপর জামাইকে কোলে তুলে আনা হয় শ্বশুর বাড়িতে। বসানো হয় সুসজ্জিত বরাসনে বা বিছানায়। বসার আগে কপালে হাত ঠেকিয়ে ‘আলমতালায়’ সালাম করে বর।  নিজের শালীর তরফ হতে উপহার আসে দোলাভায়ের গলায় ফুলের মালা, পাড়া-সম্বন্ধে শালী দেয় বিস্কুটের মালার উপহার। শালা দেয় টাকার মালা গলায় পরিয়ে। এরপর একটা একটা করে মেয়েরা আসে এবং বিভিন্ন উপহার দিয়ে ‘জামাই দর্শন’ করে যায়। অবৈধ হলেও দেখা দেয় জামাইকে, জামায়ের ভাই-বন্ধু-বুনাইকে! বাড়ি তখন তো খোলা-মেলা হাসপাতাল। অনেক মহিলা আবার জামাই দেখার সময় জামাইকে চুম্বনও দেয়!

নব পরিণীতা কন্যাকে সুসজ্জিতা করে মশারীর মত পাতলা ওড়নার পর্দায় বরের পাশে বসানো হয়; এত লোক, এত মহিলার মাঝে! চট্ করে শালীরা গাঁটছড়া বাঁধে। চিনি আনা হয়। নানী অথবা দাদী আসে। সামনে বসে কনের ডান হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুল নিয়ে চিনিতে চুবিয়ে বরের অধরে স্পর্শ করায় এবং বরের ঐ আঙ্গুল নিয়ে অনুরূপ কনের অধরে স্পর্শ করায়। অতঃপর আয়নায় এক অপরের মুখ প্রদর্শন করা হয়। বরকে নানী বা দাদী রহস্যচ্ছলে জিজ্ঞাসা করে, ‘কি দেখলে ভাই?’ বর পাকা হলে (অমাবস্যা দেখলেও) বলে ‘চাঁদ দেখলাম।’ কিছু না বললে শিখিয়ে দেয় পাকা বুড়িরা। আর এর মাঝে পাড়ার ডাঁপালীরাও সারা মজলিস হাসিতে ও খুশীতে মুখরিত করে তোলে।

এরপর শাশুড়ী বর-কনের পিছন দিকে এসে দাঁড়ায়। চিনির পাত্রের এক দিকে বরের হাত অপর দিকে কনের হাত সহ নানী বা দাদী শাশুড়ীকে সেই পাত্র তুলে দেয়। সকলে ছেড়ে দেয়, কিন্তু পাকা জামাই ছাড়ে না। উপহার চাই। জামায়ের পাশের্ব তার চতুর বুনাই চোখ টিপে এসব শিক্ষা দেয়। শাশুড়ী কিছু টাকা ফেলে দিলেও জামায়ের পছন্দ না হলে প্লেট না ছাড়লে চলে শাশুড়ী-জামায়ের প্লেট নিয়ে নির্লজ্জ টানাটানি! পুনরায় কিছু টাকা বেশী পড়লে প্লেট ছাড়ে অর্থলোভী জামাই। হাসিতে মজলিস মুখরিত হয়। লজ্জায় মুখ ঢাকে মুসলিমরা। এই নির্লজ্জতা ও ধৃষ্টতা কোন কোন মুসলিম নামধারী ঘরেও ঘটে থাকে।

অতঃপর শাশুড়ী তার জামাই-বেটি, বিয়াই-বিয়ান ও অন্যান্যের হাত একত্রে ধরে ডুকরে কেঁদে কন্যা সঁপে দেয়; ‘উপরে খোদা আর নামোতে দশ, এতদিন মেয়ে আমাদের ছিল। এখন তোমাদের হল। শান্তিতে রেখো। মারধোর করো না। করলে আল্লাহ-আল্লাহর রসূলকে করা হবে----।’ যাতে রয়েছে কথার শির্ক।

এরপর কনে তোলার পালা। কনের দোলাভাই এসে কনেকে তোলে। কিন্তু তার কাপড় বরের কাপড়ের সঙ্গে শালীরা বেঁধে রেখেছে। উপহার ছাড়া খুলবে না। উপহারের জুয়ো খেলায় দোলাভাই একা জিতে যাবে, তা হবে না। টানাটানির পর পছন্দমত টাকা পেলে তবেই গাঁট খোলা হয়। এর মাঝে বিয়াই-বিয়ানে ও আরো অন্যান্য উপহাসের পাত্র-পাত্রীদের মাঝে উপহাসের কত যে ফুলঝুরি ফোটে এবং নজরবাজদের কত যে নজরবাজীর লড়াই চলে, তা তো প্রত্যক্ষদর্শীরাই জানে। একান্ত নির্লজ্জ না হলে এমন পরিবেশ গড়া সত্যই কঠিন।

কোন কোন এলাকায় ঐ মজলিস থেকে বর নিজে নিজ পাত্রীকে কোলে তুলে কোন নির্জন রুমে প্রবেশ করে! আরো কত রকম কীর্তি কত এলাকায় নতুন নতুন রঙে ও ঢঙে দেখতে পাওয়া যায়। যার প্রায় সবগুলিই বিজাতির অনুকরণে অথবা খেয়ালবশে কৃত আচার। পক্ষান্তরে মজলিসের মাঝে বর কনে একঠাঁই করাই নির্লজ্জতা ও হারাম।[1]

অতঃপর কিছু নাস্তা করে জামাই এর হাত ধোয়া নিয়ে উপহার আব্দার করে শালা বা শালী। কি জানি ঐ জুয়াতে কে হারে আর কেই বা জিতে?

এরপর বর-কনে উভয়কে কোলে করে গাড়িতে তুলে বিদায় দেওয়া হয়। এর চেয়ে বড় নির্লজ্জতা আর কি হতে পারে যে, একজন সুসজ্জিতা, সুবাসিতা, নব পরিণীতা, লাবণ্যময়ী যুবতীকে তার কোন বেগানা পুরুষ তার গায়ে হাত রেখে, কোলে ভরে, বাহুতে চেপে গাড়িতে তুলবে বা গাড়ি থেকে নামাবে?! এটা বরেরই বা কি করে রুচি হয়?!

বরকনে নিজে পায়ে হেঁটে গাড়ি চাপবে-নামবে। বিকলাঙ্গ হলে মেয়েরা কেউ কনেকে এবং পুরুষে বরকে তুলবে। একান্ত যদি সম্মানের দরকার হয় তবে এই ভাবেই কনেকে মহিলা এবং বরকে পুরুষে চড়িয়ে দেবে। এ ছাড়া ঐ প্রথা বেহায়ামী ও অবৈধ।

কন্যা বিদায়


কন্যা বিদায় করার পূর্বে পিতা-মাতার উচিৎ, তাকে আল্লাহ-ভীতি ও নতুন সংসারের উপর বিশেষ উপদেশ দান করা। যেমন উচিৎ ছিল তার জীবনকে সুন্দর ও আদর্শময় করে গড়ে তোলা।

এক কন্যাকে তার মাতার উপদেশ নিম্নরূপঃ

‘বেটী! তোমাকে যে শিক্ষা দিয়েছি তাতে অতিরিক্ত উপদেশ নিষ্প্রয়োজন। তবুও উপদেশ বিস্মৃত ও উদাসীনকে স্মরণ ও সজাগ করিয়ে দেয়।

বেটী! মেয়েদের যদি  স্বামী ছাড়া চলত এবং তাদের জন্য মা-বাপের ধন-দৌলত ও স্নেহ-ভালোবাসাই যদি যথেষ্ট হত, তাহলে নিশ্চয় তোমাকে শবশুরবাড়ি পাঠাতাম না। কিন্তু  মেয়েরা পুরুষ ( স্বামী)দের জন্য এবং পুরুষরা মেয়েদের (স্ত্রী)দের জন্য সৃষ্টি হয়েছে।

বেটী! তুমি সেই পরিবেশ ত্যাগ করতে চলেছ, যেখানে তুমি জন্ম নিয়েছ। সেই গৃহ ত্যাগ করতে চলেছ, যাতে তুমি লালিত-পালিত হয়েছ এবং এক  নতুন কুটীরে গমন করতে চলেছ, যেখানে তোমার কেউ পরিচিত নয়। এমন সঙ্গীর সাথে বসবাস করতে যাচ্ছ, যার সাথে তোমার কোনদিন আলাপই হয়নি। সে তোমাকে তার  স্বামীত্বে নিয়ে তোমার তত্ত্বাবধায়ক ও মালিক হয়েছে। সুতরাং তুমি তার সেবিকা হয়ো, সে তোমার সেবক হয়ে যাবে।

বেটী!  স্বামীর জন্য তোমার মায়ের এই ১০টা কথা সর্বদা খেয়াল রেখো, চিরসুখিনী হবে ইনশাআল্লাহঃ-

১- অল্পে তুষ্ট হয়ে সদা তার নিকট বিনীতা থাকবে।

২- খেয়াল করে তার সকল কথা শ্রবণ করবে এবং তার সকল আদেশ পালন করবে।

৩- তার চক্ষে সদাই সুদর্শনা হয়ে থাকবে। তোমার কোন অঙ্গ ও কাজ যেন তার চক্ষে অপ্রীতিকর না হয়।

৪- তার নাকের কাছেও যেন তুমি ঘৃণ্য না হও। বরং সদা সে যেন তোমার নিকট হতে সৌরভ-সুঘ্রাণ গ্রহণ করতে পারে। (নচেৎ, যেন কোন প্রকারের দুর্গন্ধ না পায়।)

৫- তার নিদ্রা ও আরামের কথা সদা খেয়াল রাখবে। কারণ, নিদ্রা ভাঙ্গার ফলে বিরক্তি ও রাগ সৃষ্টি হয়।

৬- তার আহারের কথাও সর্বদা মনে রাখবে। যথাসময়ে খাবার প্রস্ত্তত রাখবে।

৭- তার ধন-সম্পদের হিফাযত করবে, খেয়ানত করো না। অপচয় ও অপব্যয় করো না এবং  স্বামীকে তা করতে বাধ্য করো না।

৮- তার পরিজনের যথার্থ সেবা করবে। শত সতর্কতার সাথে সকলের সাথে সদ্ব্যবহার করবে।

৯- খবরদার! তার কোন কথার অবাধ্য হয়ো না। নচেৎ তার হৃদয় থেকে তোমার ভালোবাসা দূর হতে থাকবে।

১০- তার কোন গোপন রহস্য ও ভেদ কারো নিকট প্রকাশ করো না, নচেৎ তুমি তার নিকট বিশ্বাসঘাতিনী হয়ে যাবে।

আর সাবধান!  স্বামী যদি কোন বিষয়ে চিন্তিত বা শোকাহত থাকে, তবে তার সামনে কোন প্রকার আনন্দ প্রকাশ করো না। আর যদি আনন্দিত ও প্রফুল্ল থাকে, তবে তার সামনে তোমার কোন শোকের কথা প্রকাশ করো না।[1]

আদর্শ মায়ের আদর্শ উপদেশই বটে! মানতে পারলে সুখের দাম্পত্যই লাভ হয় সৌভাগ্যবান দম্পতির।

অতঃপর বেটীজামায়ের উদ্দেশ্যে এই দুআ পঠনীয়ঃ-

  আল্লাহ ইবনে বারাক ফাহমা ওয়ারাক মায়ামা ফায় বিনয়ম

উচ্চারণঃ- আল্লা-হুম্মা বা-রিক ফীহিমা, অবা-রিক লাহুমা ফী বিনা-ইহিমা।

অর্থাৎ, হে আল্লাহ! ওদের দু’জনের জন্য বরকত দান কর এবং ওদের বাসরে মঙ্গল দান কর।[2]

বধু বরণ


নববধূ এল শ্বশুর বাড়িতে। বাড়িতে পড়েছে হৈচৈ। এরই ফাঁকে শাশুড়ি বরণডালায় সিঁদুর, ধান, পান, চিনি, দুর্বাঘাস প্রভৃতি নিয়ে দরজায় হাজির। জামাই (নন্দাই) নববধূকে কোলে তুলে নিয়ে এল। ইতিমধ্যে বাড়ির প্রবেশপথে নতুন শাড়ি বিছানো হয়েছে। নববধূ আলতারাঙা পায়ে তার উপর হেঁটে বাড়িতে শুভাগমন করল। শাশুড়ীকে দেখেই বা চিনতে পেরেই বধূ ঝুঁকে তার পায়ে হাত ঠেকিয়ে সালাম (কদমবুসি) জানাল। শাশুড়ী উপর উপর বলল, ‘আল্লাহকে সালাম কর মা। সুখী হও!’ তারপর সিঁথিতে সিঁদুর ও মুখে চিনি দিয়ে, ধান-ঘাস এদিক ওদিক ছড়িয়ে, বধূর গায়ে  সস্নেহে হাত রেখে বাড়িতে তুলল। এ শুভক্ষণে মুখে চিনি দিলে নাকি বধূ সংসারে চিনির  মত মধুর হয়ে থাকে; যেমন সবজীর বীজ রোপনের সময় মুখে গুড় রেখে রোপন করলে সবজী বা ফল নাকি মিষ্টি হয়!

হয়তো অনেকের বিশ্বাস হবে না যে, মুসলিম পরিবেশেও এমন হয়ে থাকে! কারণ এগুলো নিছক বিজাতীয় আচার।

অতঃপর শরবত-পানির ধুমধাম। কিন্তু প্রথম দিন শ্বশুরবাড়িতে খেতে নেই (?) কোন  আত্মীয়র বাড়িতে খেতে হয়! তাই খাবার সময় খাদ্যের সাথে লোহা বা কাঁচা মরিচ রেখে (?) অন্য বাড়ি হতে নিয়ে আসা হয়?

কোন কোন এলাকায়  স্বামী-স্ত্রীকে এক পাত্রে আত্মীয়-সবজন সকলের সামনে ক্ষীর-মালিদা খাওয়ানোর অনুষ্ঠানও পালিত হয়!

এর পূর্বে বা পরে শুরু হয় ‘বধূদর্শন’ বা ‘মুখ দেখা’র ধুম। উপহার-সামগ্রী সহ ছেলে-মেয়ে, বন্ধু-বান্ধব সকলেই এক এক করে বউ দেখে, দুআ দেয়। বন্ধুরা করে কত রকম রসালাপ, ঠাট্টা ও নোংরা প্রশ্নোত্তর। দেওর এলে ভাবীর সাথে রসালাপ করতে সুযোগ দিয়ে বড় ভাই (বর) সরে যায়!

হায়রে পুরুষ! তোমার দ্বীন, ঈর্ষা ও পৌরুষ কোথায়?

বিবাহের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ভিডিও ক্যামেরা দ্বারা অথবা ফটোগ্রাফী দ্বারা স্মারক ছবি তুলে রাখায় দুই পাপ; ছবি তোলার পাপ এবং বিভিন্ন মহিলাদেরকে দেখা ও দেখানোর পাপ।

ইসলামী প্রথায় এই (বাসরের) দিন বা রাত্রে বিবাহের প্রচার বিধেয়। ‘দুফ্’ (আটা-চালা চালুনের মত দেখতে ঢপ্ঢপে আওয়াজবিশিষ্ট এক প্রকার ঢোলক) বাজিয়ে ছোট ছোট বালিকা মেয়েরা শ্লীলতাপূর্ণ গীত গাইবে। কিন্তু অন্য বাদ্যযন্ত্র দ্বারা অথবা অশ্লীল, প্রেম-কাহিনীমূলক, অসার, অর্থহীন গীত বা গান গাওয়া ও শোনা হারাম। এই দিনে ইসলামী গজল গেয়ে আনন্দ করাই বিধিসম্মত; তবে তাতেও যেন শির্ক ও বিদ্আতের গন্ধ না থাকে। এই খুশীতে রেকর্ডের গান, মাইকের গান, সিডি বা ভিডিওতে অশ্লীল ছবি প্রদর্শন প্রভৃতি ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।[1]

আতশ বা ফটকাবাজীও বৈধ নয়। কারণ, আগুন নিয়ে খেলা অবৈধ, এতে বিপদের আশঙ্কা অনেক, তাছাড়া এতে অপব্যয় হয় অথচ উপকার  কিছু হয় না। উল্টে লোককে ভীত-সন্ত্রস্ত ও বিরক্ত করে তোলে। সুতরাং মুসলিম হুশিয়ার!

উল্লাসে নাচলে কোন বালিকা বা মহিলা নাচতে পারে; তবে তা যেন কেবল মহিলার দৃষ্টিতে বিনা ঘুঙুরে পুরুষ-চক্ষুর অন্তরালে হয় এবং অশ্লীল নাচ না হয়।[2] অবশ্য একাজ সেই মেয়েরাই পারে যাদের আত্মমর্যাদা, গাম্ভীর্য ও শালীনতার অভাব আছে। উলুউলু দেওয়াও (আমাদের দেশে) বিজাতীয় আচরণ। মুসলিমদের জন্য সে হর্ষধ্বনি বৈধ নয়।[3]

শুভ বাসর


শুভ বাসর রজনী। জীবনের মধুরতম রাত্রি। রোমাঞ্চকর পুলকময়ী যামিনী। নব দম্পতির, নব দুই প্রেমিক-প্রেমিকার প্রথম সাক্ষাৎ ও প্রথম মিলনের শুভ সন্ধিক্ষণ। এই বাসর-কক্ষটি হবে মনোরম, সৌরভময়, সুসজ্জিত ও আলোকমন্ডিত। (অবশ্য এতে অপব্যয় করা উচিৎ নয়।) কক্ষের একপাশের্ব থাকবে কিছু ফলফ্রুট, দুধ অথবা মিষ্টান্ন ও পানি। বর ওযু করে বাসরে নব সাথীর অপেক্ষা করবে। নববধূকে ওযু করিয়ে সুসজ্জিতা ও সুরভিতা করে ভাবীরা এবং অন্যান্য মহিলারাও এই দুআ বলবে,

  গুড লাক।

উচ্চারণঃ- আলাল খাইরি অলবারাকাহ, অআলা খাইরিন তবা-ইর।

অর্থাৎ, মঙ্গল ও বর্কতের উপর এবং সৌভাগ্যের সাথে (তোমার নবজীবনের সূচনা হোক)।[1]

অতঃপর তাকে বাসর ঘরে ছেড়ে আসবে। পূর্ব হতেই  স্বামী বাসরে থাকলে স্ত্রী সশ্রদ্ধ সালাম করে কক্ষে প্রবেশ করবে।  স্বামী সস্নেহে উত্তর দেবে এবং উঠে মুসাফাহা করে শয্যায় বসাবে। কুশলাদি জিজ্ঞাসাবাদের পর  স্বামী-স্ত্রী মিলে ২ রাকআত নামায পড়বে। তবে স্ত্রী দাঁড়াবে  স্বামীর পশ্চাতে। মুসলিম দম্পতির নবজীবনের শুভারম্ভ হবে আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের মাধ্যমে।  স্বামীর পশ্চাতে দাঁড়িয়ে স্ত্রীর নামায পড়াতে তার (বৈধ বিষয়ে) আনুগত্য করার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। সুতরাং প্রথমতঃ আল্লাহর ইবাদত ও দ্বিতীয়তঃ  স্বামীর আনুগত্য ও খিদমত হল নারীর ধর্ম।

অতঃপর  স্বামী দুআ করবে,

আল্লাহ্, পরম করুণাময়, দয়ালু, করুণাময়।

গুড লাক।

উচ্চারণঃ- আল্লা-হুম্মা বা-রিকলী ফী আহ্লী, অবা-রিক লাহুম ফিইয়্যা, আল্লা-হুম্মাজমা’ বাইনানা মা জামা’তা বিখাইর, অফার্রিকব বাইনানা ইযা ফাররাকব্তা ইলা খাইর।

অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমাকে আমার পরিবারে বর্কত ও প্রাচুর্য দান কর এবং ওদের জন্যও আমার মাঝে বর্কত ও মঙ্গল দান কর। হে আল্লাহ! যতদিন আমাদেরকে একত্রিত রাখবে ততদিন মঙ্গলের উপর আমাদেরকে অবিছিন্ন রেখো এবং বিছিন্ন করলে মঙ্গলের জন্যই আমাদেরকে বিছিন্ন করো।[2]

অতঃপর উঠে শয্যায় বসে  স্বামী স্ত্রীর ললাটে হাত রেখে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে এই দুআ পাঠ করবে;

أم أنا ألكألك من خيرها وخير ما جبلتها,

وأعوذ بك من شرها وشر ما جبلتها

উচ্চারণঃ- আল্লা-হুম্মা ইন্নী আস্আলুকা মিন খাইরিহা অখাইরি মা জাবালতাহা আলাইহি, অআঊযু বিকা মিন শার্রিহা অশার্রি মা জাবালতাহা আলাইহ।

  অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট এর মঙ্গল এবং এর মধ্যে তোমার সৃষ্ট প্রকৃতির মঙ্গল প্রার্থনা করছি। আর তোমার নিকট এর অমঙ্গল এবং এর মাঝে তোমার সৃষ্ট প্রকৃতির অমঙ্গল হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।[3]

অতঃপর সপ্রেমে কোলে টেনে নিয়ে একটা চুম্বন দিয়ে  স্বামী স্ত্রীকে বলবে, ‘আমাকে পেয়ে খুশী হয়েছ তো প্রিয়ে?’

স্ত্রী লজ্জা ও ভয় কাটিয়ে বলবে, ‘আলহামদু লিল্লাহ, খুব খুশী হয়েছি। আপনি খুশী তো?’

স্বামী বলবে, ‘আলহামদু লিল্লাহ, শত খুশী।’

তারপর দুধ, ফল বা মিষ্টি নিয়ে একে অপরকে খাইয়ে দেবে। এই ভাবে নববধূর মন থেকে ভয় ও লজ্জা ধীরে ধীরে দূরীভূত হবে। উদ্বেলিত হবে প্রেমের তরঙ্গমালা।

প্রকাশ যে, একজনের পাত্রে হাত রেখে অপরজনের খাওয়া কুপ্রথা।

এই সময় শুধু যৌন চিন্তাই নয় বরং ভাবী জীবনের বহু পরিকল্পনার কথাও উভয়ে আলোচনা করবে। একে অপরকে বিশেষ উপদেশ ও পরামর্শ দেবে।

আবু দারদা তাঁর স্ত্রীকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘যখন আমাকে দেখবে যে, আমি রেগে গেছি, তখন তুমি আমার রাগ মিটাবার চেষ্টা করবে। আর তোমাকে রেগে যেতে দেখলে আমিও তোমার রাগ মিটাব।’[4]

আবুল আসওয়াদ তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘প্রিয়ে আমি ভুল করে ফেললে আমার কাছে বদলা নেবার চেষ্টা না করে আমাকে ক্ষমা করে দিও। আর আমি ক্রোধাw¦বত হয়ে কথা বললে তুমি আমার মুখের উপর মুখ দিও না। এতে আমাদের ভালোবাসা চিরস্থায়ী ও মধুর হবে।’

এক স্ত্রী বলেছিল, ‘প্রিয়! মেয়েদের মন ঠুনকো কাঁচের পাত্র। সামান্য (কথার) আঘাতে তাই ভেঙে যায়। তাই হয়তো  স্বামীর উপরেও মুখ চালায়। তাই একটু মানিয়ে চলবেন।’

 স্বামী বলল, ‘তা ঠিক, তাই কাঁচের টুকরা  স্বামীর মর্যাদায় বিঁধে কষ্ট দেয়। তাছাড়া মেয়েদের মন কাঁচের হলেও মুখখানা কিন্তু পাকা ইস্পাতের। তাই সব ভেঙে গেলেও মুখ অক্ষত অবস্থায় সবেগে চলমান থাকে। অথচ মুখখানা কাঁচের ও মনখানা লোহার হলে আগুনে ঘি পড়ে না। দাম্পত্যও হয় মধুর।’

‘‘বিবাহের রঙে রাঙা আজ সব; রাঙা মন, রাঙা আভরণ,

বল নারী ‘এই রক্ত আলোকে আজ মম নব জাগরণ।’

পাপে নয় পতিপুণ্যে সুমতি

থাকে যেন হয়ো পতির সারথি

পতি যদি হয় অন্ধ হে সতী!

বেঁধোনা নয়নে আবরণ;

অন্ধ পতিরে আঁখি দেয় যেন তোমার সত্য আচরণ।’’

সতর্কতার বিষয় যে, এই রাত্রে বা অন্য কোন সময়েও পরস্পরের পূর্বেকার ইতিহাস জানতে না চাওয়াই উভয়ের জন্য উত্তম। নচেৎ মধুরাত্রি বিষরাত্রিতে পরিণত হবে।

উল্লেখ্য যে, বাসরে বর-কনের কথোপকথনে কানাচি পাতা হারাম। কানাচি পেতে গোপন কথা যে শোনে, কিয়ামতে তার কানে গলিত সীসা ঢালা হবে।[5]

নব-দম্পতির প্রেমের জোয়ার পল্লবিত করুক তাদের জীবন ও যৌবনের উভয় কুলকে;  এতে অপরের কাজ কি?

‘বাতি আনে রাতি আনার প্রীতি,

বধূর বুকে গোপন সুখের ভীতি।

বিজন ঘরে এখন যে গায় গীতি।।

একলা থাকার গানখানি সে গা’বে

উদাস পথিক ভাবে।’

কিন্তু মিলন-তৃষ্ণার্ত  স্বামী কি ধৈর্য রাখতে চাইবে? মন তার গাইবেঃ-

‘গুণ্ঠন খোল এই নির্জনে আফোটা প্রেমের গুঞ্জ,

এনেছি পরাতে অলকে তোমার আলো ক’রে হূদিকুঞ্জ।

রত্ন প্রবাহ আনিয়া সবপনে,

 সপিব তোমারে দখিনা পবনে-

মন ফাগুনের ফাগ মেখে সই নাচিবে কামনাপুঞ্জ।’