এসো হাদিস পড়ি ?
এসো হাদিস পড়ি ?
হাদিস অনলাইন ?

পুরুষ ও নারীর নামাযের পদ্ধতিতে কোন পার্থক্য নেই

পুরুষ ও নারীর নামাযের পদ্ধতিতে কোন পার্থক্য নেই


ebadat0282

“তোমরা আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখ সেভাবে নামায আদায় কর।” (সহীহ বুখারী)

প্রশ্ন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: 

“তোমরা আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখ সেভাবে নামায আদায় কর”। এ হাদিস থেকে আমরা যা বুঝি তা হচ্ছে— নারী ও পুরুষের নামাযের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। না দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে, না বসার ক্ষেত্রে, না রুকু করার ক্ষেত্রে, না সেজদা করার ক্ষেত্রে। প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর থেকে আমি এভাবে আমল করে আসছি।

কিন্তু, আমাদের কেনিয়াতে এমন কিছু মহিলা আছেন যারা এ নিয়ে আমার সাথে বাকবিতণ্ডা করেন। তারা বলেন: তোমার নামায সহিহ নয়। কারণ তোমার নামায পুরুষদের নামাযের ন্যায়। তারা এমন কিছু স্থানের কথা উল্লেখ করেন তাদের দৃষ্টিতে সে স্থানগুলোতে মহিলাদের নামায পুরুষের নামায থেকে ভিন্ন। যেমন— বুকের ওপর হাত বাঁধা, কিংবা হাতদুটিকে ছেড়ে দেয়া। রুকু করাকালে পিঠ সোজা রাখা ইত্যাদি; তবে আমি এখনো এগুলোতে প্রভাবিত হইনি। আমি আশা করব, আপনারা পরিস্কার করবেন যে, পুরুষের নামায ও মহিলার নামাযের মাঝে কোন পার্থক্য আছে কি?

উত্তর: আলহামদুলিল্লাহ।

সঠিক মতানুযায়ী মহিলাদের নামায ও পুরুষের নামাযের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। কিছু কিছু ফিকাহবিদ যে পার্থক্যগুলো উল্লেখ করেছেন সেগুলোর পক্ষে কোন দলিল নেই। প্রশ্নে আপনি যে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন “তোমরা আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখ সেভাবে নামায আদায় কর” এর বিধান সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করবে। ইসলামী বিধি-বিধানগুলো নারী-পুরুষ উভয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। তবে, দলিল যদি বিশেষ কোন বিধানকে খাস করে সেটা ভিন্ন কথা। অতএব, সুন্নাহ হল— রুকু, সেজদা, ক্বিরাত ও বুকে হাত রাখা ইত্যাদি সবক্ষেত্রে মহিলার নামায পুরুষের নামাযের মত। অনুরূপভাবে রুকুকালে হাঁটুতে হাত রাখার পদ্ধতিও একই। সেজদাকালে কাঁধ বরাবর কিংবা কান বরাবর জমিনে হাত রাখার পদ্ধতিও একই। রুকুকালে পিঠ সোজা রাখার পদ্ধতিও অভিন্ন। রুকু ও সেজদাতে যা পড়া হবে সেগুলো এক। রুকু ও প্রথম সেজদা থেকে উঠে যা বলবে সেটাও এক। এ সব ক্ষেত্রে নারীর নামায পুরুষের নামাযের ন্যায়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বোক্ত হাদিসের ভিত্তিতে:

“তোমরা আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখ সেভাবে নামায আদায় কর”[সহিহ বুখারী]

আর ইক্বামত ও আযান: এ দুইটি নামাযের বাহিরের বিষয়। ইক্বামত ও আযান পুরুষের জন্য খাস। এই মর্মে দলিল উদ্ধৃত হয়েছে। পুরুষেরা ইক্বামত ও আযান দিবে। আর নারীদের ইক্বামত ও আযান নেই। উচ্চস্বরে ক্বিরাত পড়া: মহিলারা ফজর, মাগরিব ও এশার নামাযে উচ্চস্বরে ক্বিরাত পড়তে পারেন। ফজরের দুই রাকাতে উচ্চস্বরে ক্বিরাত পড়বেন। মাগরিবের প্রথম দুই রাকাতে উচ্চস্বরে ক্বিরাত পড়বেন। এশার প্রথম দুই রাকাতে উচ্চস্বরে ক্বিরাত পড়বেন, যেভাবে পুরুষেরা করে থাকে।[সমাপ্ত]

মহামান্য শাইখ আব্দুল আযিয বিন বায (রহঃ)

উৎস: ইসলামকা.ইনফো

.......................................

সালাতে বুকে হাত বাঁধা

সালাতে  বুকে হাত বাঁধা

১৬-০১-২০১৪

দুই হাতের আংগুল সমূহ ক্বিবলামুখী খাড়াভাবে কাঁধ অথবা কান পর্যন্ত উঠিয়ে দুনিয়াবী সবকিছুকে হারাম করে দিয়ে স্বীয় প্রভুর মহত্ত্ব ঘোষণা করে বলবে ‘আল্লা-হু আকবার’ (আল্লাহ সবার চেয়ে বড়)। তারপর বাম হাতের উপরে ডান হাত, বুকের উপরে বেঁধে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সম্মুখে নিবেদিত চিত্তে সিজদার স্থান বরাবর দৃষ্টি রেখে দাড়াতে হবে।

মহানআল্লাহ বলেন,

‘আর তোমরা আল্লাহর জন্য নিবিষ্টচিত্তে দাঁড়িয়ে যাও’।বাকারাহ– ২/২৩৮

হাত বাঁধার সময় দুই কানের লতি বরাবর দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলী উঠানোর হাদীস যঈফ। আবু দাউদ-৭৩৭

#  ইবনে হুজাইফা(রাঃ) মুরসাল হাদীসে বলেন,  “নবীজি(সঃ) সালাতের সময় বুকের উপর হাত বাধতেন”।-নাসিরউদ্দিন আলবানী। জাকির নায়েক বক্তৃতা সামগ্রী-৫ম খন্ড- পৃষ্ঠা- ৮৫ 

#  “তোমরা হাত বাধো নাভীর নীচে” আবু দাউদ- ১ম খন্ড-৭৫৫,৭৫৭। তবে আবু দাউদ নিজেই এই দুটোকে যয়ীফ হাদীস বলেছেন। “তোমরা  নাভীর উপর হাত বাধো”আবু দাউদের- ১ম খন্ড-৭৫৬।তারপর আবার মুরসাল হাদীসে(কিছু বাদ দেয়া হয়েছে,এমন হাদীস) বলা হয়েছে, “সালাত আদায় করার সময়, তোমরা হাত বাধবে, তোমাদের বুকের উপর”। আবু দাউদ-৭৫৮ । জাকির নায়েক বক্তৃতা সামগ্রী-৫ম খন্ড- পৃষ্ঠা- ৮৫  

#   সাহল বিন সা‘দ (রাঃ) বলেন, ‘লোকদেরকে নির্দেশ দেওয়া হ’ত যেন তারা সালাতের সময় ডান হাত বাম হাতের উপরে রাখে। আবু হাযেম বলেন যে, সাহাবী সাহল বিন সা‘দ এই আদেশটিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে সম্পর্কিত করতেন বলেই আমি জানি’।বুখারী (দিল্লী ছাপা) ১/১০২ পৃঃ, হা/৭৪০, ‘আযান’ অধ্যায়-১০, অনুচ্ছেদ-৮৭; ঐ, মিশকাত হা/৭৯৮, ‘ছালাতের বিবরণ’ অনুচ্ছেদ-১০। উল্লেখ্য যে,ইসলামিকফাউন্ডেশন (১৯৯১), আধুনিক প্রকাশনী (১৯৮৮) প্রভৃতিবাংলাদেশের একাধিক সরকারী ও বেসরকারী প্রকাশনা সংস্থা কর্তৃক অনুদিত ওপ্রকাশিত বঙ্গানুবাদ বুখারীশরীফে উপরোক্ত হাদীছটির অনুবাদে ‘ডান হাত বাম হাতের কব্জিরউপরে’ –লেখা হয়েছে। এখানে অনুবাদের মধ্যে ‘কব্জি’ কথাটি যোগ করার পিছনে কিকারণ রয়েছেবিদগ্ধ অনুবাদক ও প্রকাশকগণই তা বলতে পারবেন। তবে হাদীসেরঅনুবাদে এভাবে কমবেশী করা ভয়ংকর গর্হিত কাজ বলেই সকলে জানেন।

# ‘যেরা‘ অর্থ কনুই থেকে মধ্যমা আঙ্গুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত দীর্ঘ হাত’ (আল-মু‘জামুল ওয়াসীত্ব)।একথা স্পষ্ট যে, বাম হাতের উপরে ডান হাত রাখলে তা বুকের উপরেই চলে আসে। নিম্নোক্ত রেওয়ায়াত সমূহে পরিষ্কারভাবে যার ব্যাখ্যা এসেছে। যেমন-

#  সাহাবী হুল্ব আত-ত্বাঈ (রাঃ) বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বাম হাতের জোড়ের (কব্জির) উপরে ডান হাতের জোড় বুকের উপরে রাখতে দেখেছি’।আহমাদ হা/২২৬১০, সনদ হাসান,আলবানী, আহকামুল জানায়েয, মাসআলা নং-৭৬, ১১৮পৃঃ; তিরমিযী (তুহফা সহ, কায়রো : ১৪০৭/১৯৮৭) হা/২৫২, ‘সালাত’অধ্যায়-২, অনুচ্ছেদ-১৮৭, ২/৮১, ৯০; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১০৯।

#  ওয়ায়েল বিন হুজর (রাঃ) বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সলাত আদায় করলাম। এমতাবস্থায় দেখলাম যে, তিনি বাম হাতের উপরে ডান হাত স্বীয় বুকের উপরে রাখলেন’।

বুখারী ১০২, মুসলিম-মুসলিম-১৭৩ পৃষ্ঠা,  আবু দাউদ-১ম খন্ড-১১০-১২১-১২৮,  তিরমিযী-৫৯ পৃষ্ঠা,নাসাঈ-১৪১ পৃষ্ঠা, ইবনু মাজা- ৫৮-৫৯ পৃষ্ঠা , মেশকাত ৭৫ পৃষ্ঠা, মুয়াত্তা মালিক- ১৭৪ পৃষ্ঠা, মুয়াত্তা মুহাম্মাদ-১৬০ পৃষ্ঠা, যাদুল মায়াদ-১২৯ পৃষ্ঠা,হিদায়া দিরায়া-১০১ পৃষ্ঠা, কিমিয়ায়ে সাআদাত- ১ম খন্ড-১৮৯ পৃষ্ঠা,বুখারী আযিযুল হক-১ম খন্ড-৪৩৫ , বুখারী আধুনিক প্রকাশনী-১ম খন্ড-৬৯৬ , বুখারী ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ২য় খন্ড-৭০২ , মুসলিম- ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২য় খন্ড-৮৫১, আবু দাউদ ইসলামিক ফাইন্ডেশন- ১ম খন্ড-৭৫৯, তিরমিযী ইসলামিক ফাউন্ডেশন-১ম খন্ড-২৫২,  মেশকাত-নূর মোহাম্মাদ আযমী- ২য় খন্ড-৭৪২ ও মাদ্রাসা পাঠ্য দ্বিতীয় খন্ড- ৭৪২,  বুলুগুল মারাম বাংলা- ৮২ পৃষ্ঠা,  সহীহ ইবনু খুযায়মা হা/৪৭৯-পৃষ্ঠা ২০; আবুদাঊদ হা/৭৫৫, ইবনু মাস‘ঊদ হ’তে; ঐ,হা/৭৫৯, ত্বাঊস বিন কায়সান হ’তে; ‘ছালাত’ অধ্যায়-২, ‘ছালাতে বাম হাতের উপর ডানহাত রাখা’ অনুচ্ছেদ-১২০।

“বুকের উপর এমন ভাবে হাত বাধতে যেন,  ডান হাত উপরে ও বাম হাত নীচে থাকে”।মুসলিম,আহমদ ,ইবনে খুজায়মা

#  ডাঃ জাকির নায়েক  বলেন, “তাই আমি যখন সালাত আদায় করি,তখন আমার হাত রাখি, বুকের উপর” ‘বুকের উপর হাত’ রাখার হাদীসগুলোই হচ্ছে মযবুত”। জাকির নায়েক বক্তৃতা সামগ্রী- ৫ম খন্ড-পৃষ্টা-৮৫,৮৬

# ইমাম শাওকানী বলেন, ‘হাত বাঁধা বিষয়ে সহীহ ইবনু খুযায়মাতে ওয়ায়েল বিন হুজর(রাঃ) বর্ণিত হাদীছের চাইতে বিশুদ্ধতম কোন হাদীছ আর নেই’।উল্লেখ্য যে, বাম হাতের উপরে ডান হাত রাখা সম্পর্কে ১৮ জন ছাহাবী ও ২ জন তাবেঈ থেকে মোট ২০টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ইবনু আব্দিল বার্র বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে এর বিপরীত কিছুই বর্ণিত হয়নি এবং এটাই জমহূরসাহাবা ও তাবেঈনের অনুসৃত পদ্ধতি। নায়লুল আওত্বার ৩/২২; ফিক্বহুস সুন্নাহ (কায়রো : ১৪১২/১৯৯২) ১/১০৯।

# বুকে হাত বাঁধার তাৎপর্য : ত্বীবী বলেন, ‘হৃৎপিন্ডের উপরে বুকে হাত বাঁধার মধ্যে হুঁশিয়ারী রয়েছে এ বিষয়ে যে, বান্দা তার মহা পরাক্রান্ত মালিকের সম্মুখে দাঁড়িয়েছে হাতের উপর হাত রেখে মাথা নিচু করে পূর্ণ আদব ও আনুগত্য সহকারে, যা কোনভাবেই ক্ষুণ্ণ করা যাবে না’।

#  আধুনিক প্রকাশনীর ৬৯৬ নম্বরে ভুল অর্থ করা হয়েছে। সালাতে ‘নাভীর নীচে হাত বাধা’র

কোন সহীহ হাদীস নাই। ‘বুকে হাত বাধার কথা’ সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমানিত। আধুনিক প্রকাশনী আরবী ইবারতে ‘যেরা’  শব্দের অর্থ করেছেন, ‘কব্জি’। আর আরবী অভিধানগুলোতে এর অর্থ হচ্ছে, পূর্ন হাত।

#  আল্লামা হায়াত সিন্ধীর রিসালা “ফতহুল গফুর কি তাহকীক” ওযয়িল ইয়াদায়নে আলাস সুদুর” পুস্তিকা ০৮ পৃষ্ঠারঃ-

ক)  ইমাম আহমাদ স্বীয় মসনদে কবীসহা বিন হোলবঃ  তিনি নিজের পিতা হোলব হতে বলেন যে, “আমি রাসুলুল্লাহ(সঃ)-কে (সালাত হতে ফারেগ হতে মুসল্লীদের দিকে) ডান ও বাম দিকে ফিরতে দেখেছি।আর দেখেছি তাকে বুকের উপর হাত বাধতে”। উক্ত হাদীসে ইয়াহইয়া নামক রাবী ‘নিজের ডান হাত, বাম হাতের কব্জির উপর রেখে দেখালেন। হাফিজ আবু উমর ইবনু আবদুল বার নিজের “আল ইসতিআব ফী মাআরিফাতিল আসহাব” বইতে এই হাদীস “হোলব” সাহাবী তার পুত্র কবীসা রিওয়ায়াতে সহীহ বলেছেন।

খ)  ইমাম আবু দাউদ তাউস(তাবেঈ) হতে, বুকের উপর হাত বাধার হাদীস উদ্ধৃত করেছেন।

গ)  ইমাম ইবনু আবদুল বার “আত তামহীদ লিমা ফীল মুয়াত্তা মিনাল মাআনী ওয়াল আসানীদ”  বইয়ে উক্ত ‘তাউস’ তাবিঈর হাদীস উল্লেখ করে, হাত বাধার কথা বলেছেন।

ঘ)  ইমাম বায়হাকী ‘আলী’ “ফাসল্লি লি রব্বিকা ওয়ানহার” এর অর্থ করেছেন,”তুমি সালাতের সময় ডান হাত বাম হাতের উপর রাখ”। জওহারুন নকীসহ সুনানে কুবরা-২৪-৩২ পৃষ্ঠা 

ঙ)  ইমাম বুখারী  স্বীয় “তারিখে উকবাহ বিন সহবান,তিনি(উকবাহ) “আলী(রাঃ) হতে উদ্ধৃত করেছেন, বাম হাতের উপর ডান হাত রেখে(হস্তদ্বয়) বুকের উপর বেধে “ফাসলি লি রব্বিকা ওয়ানহার” (আয়াতের) অর্থ বুঝালেন।

চ)  নাসিরউদ্দিন আলবানী তার “সিফাতু স্বলাতুন্নাবী” গ্রন্থে লিখতে গিয়ে শিরোনাম দেন “বুকের উপর হাত বাধা”  এবং বলেনঃ

“নবী(সঃ) বাম হাতের পিঠ,কব্জি ও বাহুর উপর ডান হাত রাখতেন”।আবু দাউদ,নাসাঈ,১/৪/২ সহীহ সনদে, ইবনু হিব্বান- ৪৮৫। “এ বিষয়ে স্বীয় সাহাবাদেরও আদেশ প্রদান করেছেন”।মালিক,বুখারী, আবু আ ওয়ানাহ

তিনি কখনো ডান হাত দিয়ে, বাম হাত আকড়ে ধরতেন। নাসাঈ, দারাকুৎনী-সহীহ সনদসহ। এই হাদীস প্রমান করছে যে, হাত বাধা সুন্নাত।আর প্রথম সহীহ হাদীস প্রমান করেছে যে, হাত রাখা সুন্নাত।অতএব, উভয়টাই সুন্নাত।কিন্তু হাত বাধা ও হাত রাখার মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে, পরবর্তী হানাফি আলেমগন যে পদ্ধতি পছন্দ করেছেন, তা হচ্ছে বিদয়াত।

  “তিনি হস্তদ্বয়কে বুকের উপর রাখতেন”।আবু দাউদ,ইবনু খুজায়মাহ নিজ গ্রন্থ -১/৫৪/২-আহমদ,আবুশ শাইখ”স্বীয় “তারীখু আসবাহান” গ্রন্থে-পৃষ্ঠা-১২৫।ইমাম তিরমিযীর একটি সনদকে হাসান বলেছেন। চিন্তা করলে, এর বক্তব্য মুয়াত্তা মালিক ও বুখারীতে পাওয়া যাবে। আলবানী বলেন, এই হাদীসের বিভিন্ন বর্ননাসূত্র নিয়ে আমি কিতাবের ১১৮ পৃষ্ঠায় আলোচনা করেছি।বুকের উপর হাত রাখাটাই সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমানিত। অন্য কোথাও হাত রাখার হাদীস হয় দূর্বল নয় ভিত্তিহীন।

  এই সুন্নাতের উপর আমল করেছেন, ইমাম ইসহাক বিন রাহভিয়া। “আল-মারওয়াযী” গ্রন্থে ২২২ পৃষ্ঠাতে তিনি বলেন,”ইসহাক আমাদের নিয়ে বিতরের সালাত পড়তেন এবং তিনি কুনুতে হাত উঠাতেন  আর রুকুর পূর্বে কুনুত পড়তেন।তিনি বক্ষদেশের উপরে হাত রাখতেন। কাযী ইয়াযও “আল-আ’লাম” কিতাবের ১৫ পৃষ্ঠায় (রিবাত্ব তৃতীয় সংস্করন)-এ  সালাতের মুস্তাহাব কাজ বর্ননার ক্ষেত্রে অনুরুপ কথা বলেছেন, ডান হাতকে বাম হাতের পৃষ্ঠের উপর রাখা। আবদুল্লাহ ইবনু আহমদের বক্তব্যও এর কাছাকাছি। তিনি তার “আল-মাসায়েল” বইয়ের ৬২ পৃষ্ঠায় বলেন, আমার পিতা সালাত আদায়ের সময়, তার এক হাতকে আরেক হাতের উপর নাভীর  উপরে রাখতেন। “সিফাতু সলাতুন্নবী(সঃ)”-  নাসির উদ্দিন আলবানী(রহঃ) এছাড়াও আলোচনা রয়েছে “ইরওয়াউল গালীল” এর ৩৫৩ পৃষ্ঠায়।

   

২।  নাভীর নীচে হাত বাধা

 

#  ইমাম বায়হাকী আলী হতে “নাভীর নীচে হাত বাধা”র একটি হাদীস উল্লেখ করে তাকে যয়ীফ বলেছেন। 

# ‘নাভির নীচে হাত বাঁধা’ সম্পর্কে আহমাদ, আবুদাঊদ, মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে, ৪ জন ছাহাবী ও ২ জন তাবেঈ থেকে যে চারটি হাদীস ও দু’টি ‘আসার’ বর্ণিত হয়েছে, সেগুলি সম্পর্কে মুহাদ্দেছীনের বক্তব্য হ’ল- ‘(যঈফ হওয়ার কারণে) এগুলির একটিও দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়’।মির‘আতুল মাফাতীহ (দিল্লী: ৪র্থ সংস্করণ, ১৪১৫/১৯৯৫) ৩/৬৩; তুহফাতুল আহওয়াযী ২/৮৯

#  সালাতে দাঁড়িয়ে মেয়েদের জন্য বুকে হাত ও পুরুষের জন্য নাভীর নীচে হাত বাঁধার যে রেওয়াজ চালু আছে, হাদীছে বা আসারে এর কোন প্রমাণ নেই মির‘আত (লাহোর ১ম সংস্করণ,১৩৮০/১৯৬১) ১/৫৫৮; ঐ, ৩/৬৩; তুহফা ২/৮৩ ।বরং এটাই স্বতঃসিদ্ধ যে, সলাতের মধ্যকার ফরয ও সুন্নাত সমূহ মুসলিম নারী ও পুরুষ সকলে একই নিয়মে আদায় করবে।মির‘আত ৩/৫৯ পৃঃ; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১০৯; নায়লুল আওত্বার ৩/১৯

#  মালিকীরা নামায পড়ার সময় ‘হাত দুটোকে ঝুলায়ে’ রাখে।জাকির নায়েক বক্তৃতা সামগ্রী-৫ খন্ড-পৃষ্ঠা-৮৫

কেবল কাসেম বিন কাতলুবাগা এটা বলেছেন।তিনি “তামহীদ” কিতাবের কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে,(আহলে হাদীসদের মধ্যে প্রথম) ইবনু আব্দুল বার উক্ত কিতাবে বলেছেন যে, সওরী  ও ইমাম আবু হানিফা নাভীর নীচের কথা বলেছেন। আর সেটা “আলী ও ইবরাহীম নখয়ী” থেকে বর্নিত হলেও, ঐ দুইজন প্রমানিত না।

“নাভীর নীচে হাত বাধার কোন সহীহ দলীল নাই”– আল্লামা সিন্ধী ও নীচে উনার বক্তব্য দেয়া হোলঃ-

ইবনু আবী শায়বার “মুসান্নাফ(হাদীস বই) থেকে শায়খ কাসিম বিন কাতলুবাগা “তাখরীজু আহাদিসিল এখতিয়ার” বইয়ে “ওকী”  মুসা বিন ওমায়রাহ হতে মুসা আলকামা  বিন ওয়াযিল বিন হুজর হতে যে রিওয়ায়াত করেছেন, সেটাতে  নাভীর নীচে হাত বাধার কথা উল্লেখ আছে।তবে “নাভীর নীচে হাত বাধার হাদীস ভুল”। “মুসান্নাফ”-এর সহীহ গ্রন্থে উক্ত সনদের উল্লেখ আছেকিন্তু “নাভীর নীচে” এই কথাটি উল্লেখ নাই।উক্ত হাদীসের পরে, (ইবরাহীম) ‘নখয়ী’ এর আসার(সাহাবা ও তাবেঈদের আচরনকে ‘আসার’ বলে) উল্লেখ আছে।উক্ত ‘আসার’ ও হাদীসের শব্দ প্রায় কাছাকাছি। উক্ত ‘আসার’ এর শেষ ভাগে”ফিসসলাতে তাহতাস সুররাহ”তে নাভীর নীচে হাত বাধার কথা উল্লেখ আছে।মনে হয় লেখক ভুলে  ‘মওকুফ হাদীসকে’ মরফু লিখে দিয়েছেন(সাহাবা থেকে বর্নিত হলে ‘মওকুফ’ ও রাসুলের(সঃ) থেকে হলে ‘মরফু’ হাদীস বলে)। মুসান্নাফের সব হাদীসে “নাভীর নীচে হাত বাধার” কথা বলা নাই। অনেক মুহাদ্দিস ‘মুসান্নাফের’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। কিন্তু “নাভীর নীচের কথা” কেউ বলেনি।

  কেবল কাসেম বিন কাতলুবাগা এটা বলেছেন।তিনি “তামহীদ” কিতাবের কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে,(আহলে হাদীসদের মধ্যে প্রথম) ইবনু আব্দুল বার উক্ত কিতাবে বলেছেন যে, সওরী  ও ইমাম আবু হানিফা নাভীর নীচের কথা বলেছেন। আর সেটা “আলী ও ইবরাহীম নখয়ী” থেকে বর্নিত হলেও, ঐ দুইজন প্রমানিত না। যদি সেটা হাদীস হোত, তাহলে ইবনু আব্দুল বার সেটা “মুসান্নাফ” থেকে উল্লেখ করতেন।কেননা সেখান থেকে তিনি বহু উদ্ধৃতি দিয়েছেন।২য় ইবনু হাজার আসকালানী(আহলে হাদীস),  ৩য় মুজাদদ্দীন ফিরোজাবাদী(আহলে হাদীস), ৪র্থ আল্রামা সুয়ুতী(আহলে হাদীস), ৫ম আল্লামা যয়লয়ী(আহলে হাদীস), মুহাককিক ৬ষ্ঠ আল্লামা  আয়নী, ৭ম আল্রামা ইবনু আমিরিল হাজ্জ(আহলে হাদীস)  প্রভৃতির উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, যদি “নাভীর নীচে” থাকতো তাহলে এরা সেটা উল্লেখ করতেন।কেননা এদের সমস্ত কিতাব ইবনু আবী শায়বার হাদীস দ্বারা পরিপূর্ন।

মূলতঃ  “নাভীর নীচে হাত” বাধার দলীল অকাট্য না বরং ধারনা/কল্পনাপ্রসূত। 



শেষ সালাত বিতর

শেষ সালাত বিতর

১)  ‘বিতির’ শব্দের  অর্থ  ও  উদ্দেশ্য 

   ‘বিতর’ শব্দের অর্থ বিজোড়। মূলতঃ এই শব্দের অর্থের সাথে, এই সালাতের লক্ষ্য বুঝা যায়।  রাতের সালাতকে বিজোড় করার জন্য বিতর পড়ানো হয়।বিতরকে মহান আল্লাহ পছন্দ করেন।কারন মহান আল্লাহ বিতর।

এক যোগ না করলে, কোন সালাতই “বিজোড়” হয় না। বিতর বা বিজোড় সংখ্যা অনেকগুলো।যার মধ্যে তিন সংখ্যায়ও বিজোড় আছে। কিন্তু মহানআল্রাহ ১ সংখ্যায় বিজোড় বলে, বিতর ১ সংখ্যা বিজোড় অনুসারে পড়তে হয়। যেমনঃ৩ , কিন্তু শুধু ৩ সংখ্যাটিই যে, এক সংখ্যার বিজোড় তা নয়। বরং ১,৩,৫,৭,৯ এই পাচটি সংখ্যাই , একমাত্র  ১ সংখ্যার বিজোড়। কাজেই এই সংখ্যাগুলোর যে কোন একটি অনুসারে বিতর পড়া যেতে পারে।

   কিন্তু মহান আল্লাহ ১  সংখ্যায় বিজোড় ও একজনই। ৩ ,৫ , ৭ বা ৯ জন নন। সুতরাং ১ রাকাত ‘বিতর’ উত্তম। কিন্তু  অনান্য সংখ্যার বিতর পড়া হাদিস থেকে প্রমানিত।  

২) বিতির সালাত  সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, ওয়াজিব নয় 

বিতর’  সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। (ফিকহুস সুন্নাহ ১/১৪৩,নাসাঈ-১৬৭৬,মিরআত-২/২০৭- ৪/২৭৩-৭৪ , শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ-২/১৭ , আবু দাউদ– ।

তথ্যঃ বুখারী/তাওহীদ পাবলিকেশন্স, মুসলিম/  ,  আবু দাউদযাদুল মা’আদ/ হাফিয ইবনুল ক্বইয়্যিম আল-জাওযী (রহঃ) ,

বিতির পড়তে হয় এশার ফরয সালাতের পর থেকে ফজর পর্যন্ত, এবং সুন্নাত ও নফল সালাতগুলোর শেষে।( ফিকহুস সুন্নাহ-১/১৪৪,সহীহ- আত-তারগীব—৫৯২-৯৩)। বিতর ফরজ বা ওয়াজিব সালাতের মত বাধ্যতামূলক নয়। বরং তা সুন্নত, যেটা প্রবর্তন করেছেন, রসূলুল্লাহ (সঃ) –

আলী(রাঃ) হতে বর্নিত, তিনি বলেন, “বিতরের সালাত ফরয সালাতের ন্যায় অপরিহার্য নয়। কিন্তু নবী(রাঃ) এটাকে প্রচলিত করেছেন (অর্থাৎ এটি সুন্নত)। তিনি বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ বিতর (বিজোড়)। সেহেতু তিনি বিজোড় ভালবাসেন। অতএব হে কুরআনের ধারক-বাহকগন! তোমরা বিতর পড়।” আবু দাউদ-১৪১৬,তিরমিযী-৪৫৩, নাসায়ী-১৬৭৫,ইবনু মাজাহ- ১১৬৯, তিরমিযী-৪৫৩, নাসাঈ- ১৬৫৮, মুসান্নাম ইবনু আবী শাইবাহ-২/২৯৬, মুসান্নাফ ইবনু আব্দুর রাজ্জাক-৩/৩,-৪৫৬৯ ,সহীহ নাসাঈ- ১/৩৬৮ ।

আল কানাবী(র)…….. আবু মুহাম্মাদ(র) হতে বর্নিত হতে বর্নিত। তিনি বলেন, বিতিরের নামায ওয়াজিব।রাবী মাখদাযী বলেন, তখন উবাদাহ ইবনুস সামিত(র)-এর নিকট  উপস্থিত হয়ে বলি, আবু মুহাম্মাদ(র) এরুপ বর্ননা করেছেন। তিনি বলেন, আবু মুহাম্মাদ(র) ভুল করেছেন।  আমি রাসুলুল্লাহ(সঃ) কে বলতে শুনেছি, মহান আল্লাহ তার বান্দাদের উপর ৫ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। যে ব্যাক্তি তা সঠিক ভাবে আদায় করবে ও অলসতা হেতু কিছুই পরিত্যাগ করবেনা, মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবার অংগীকার করেছেন। আর যে ব্যাক্তি তা সঠিক ভাবে আদায় করবে না, তার জন্য আল্লাহর অংগীকার নাই।তিনি ইচ্ছা করলে তাকে,শাস্তি  প্রদান করবেন এবং ইচ্ছা করলে জান্নাতেও দিতে পারেন। আবু দাউদ-১৪২০,নাসাঈ,ইবনে মাজা 

#   রাসুল বলেন(সঃ), “বিতর  রাত্রির শেষে, এক রাকাত মাত্র” । মুসলিম-মিশকাত-১২৫৫

তালহা ইব্‌ন উবাইদুল্লাহর হাদিস, তিনি বলেন: নজদ থেকে এক ব্যক্তি বিক্ষিপ্ত কেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হল, আমরা তার আওয়াজের গুঞ্জন শুনতে ছিলাম, কিন্তু সে কি বলছে বুঝতে ছিলাম না, অবশেষে নিকটে এসে ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করে, বলে: হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে বলুন আল্লাহ আমার ওপর কোন কোন সালাত ফরয করেছেন? তিনি বললেন: “পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, তবে তুমি যদি নফল পড়তে চাও”। সে বলল: আমাকে বলুন আমার ওপর আল্লাহ কোন কোন সিয়াম ফরয করেছেন?তিনি বললেন: রমযান মাসের সিয়াম, তবে তুমি যদি নফল পড়তে চাও”। সে বলল: আমাকে বলুন আমার ওপর আল্লাহ কি পরিমাণ যাকাত ফরয করেছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে যাকাতের কথা বললেন। সে বলল: এ ছাড়া আর কিছু আছে? তিনি বললেন: না, তবে তুমি যদি নফল আদায় করতে চাও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শরীয়তের নিদর্শন ও মৌলিক বিধানগুলো বললেন। তালহা বলেন: লোকটি চলে গেল, যাওয়ার সময় বলতে ছিল: “তার কসম, যে আপনাকে সম্মানিত করেছে, আমি কোন নফল আদায় করব না, আল্লাহ আমার ওপর যা ফরয করেছেন তার থেকে কমও করব না”। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “লোকটি সফল হল, যদি সত্য বলে থাকে, অথবা জান্নাতে প্রবেশ করল, যদি সত্য বলে থাকে”।

ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়ায ইব্‌ন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়ামানে প্রেরণ করেন, তাকে উপদেশ দিয়ে তিনি বলেন: “… তুমি তাদের জানাবে যে, আল্লাহ তাদের ওপর দিন-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন…”।

৩)  ওয়াজিবের দলিল

৪)  ‘বিতিরে’র পড়ার সময় 

# আবদুল্লাহ বিন উমার(রাঃ)  হতে বর্নিত, তিনি বলেন ,”রাসুলুল্লাহ(সঃ) বলেছেন, বিতর হল এক রাকাত, রাতের শেষাংশে”।

#  মুহাম্মাদ  ইবনে আহমদ(র)……..  কাতাদা থেকে বর্নিতঃ তিনি বলেনঃ-  রাসুল(সঃ) হযরত আবুবকর(রাঃ)কে ডেকে বলেন, আপনি কখন বিতর পড়েন ? তিনি বলেন রাত্রির প্রথম আংশে। অতঃপর ওমরকে(রঃ) জিজ্ঞসা করেন, আপনি কখন বিতর আদায় করেন ? তিনি বলেন রাত্রির শেষ অংশে । আবু বকরকে(রাঃ)  বলেন,  আপনি সতর্কতার সাথে আমল করতে থাকুন আর  ওমর(রাঃ)কে বলেন, আপনি সাধ্যনুযায়ী আমল করতে থাকুন। আবু দাউদ-১৪৩৪ 

বিতর সালাত এশার সালাতের পর থেকে ফজরের সালাতের ওয়াক্তের পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত পড়া যায়।এটা দিন,প্রথম রাত ও শেষ রাতের শেষ সালাত।এটা সমস্ত বছর ‘তাহাজ্জুদ’ নামাজ ও রমজানে ‘তারাবীর পরে হিসাবে পড়তে হয়।  তারপর শুরু হয় ফজর সালাত।রমজানে  “কিয়ামুল লাইলের” সাথে যোগ হয়, ‘তারাবী’র সালাত। আর ‘কিয়ামুল লাইলের’ কোন সালাতই ওয়াজিব নয়, সুন্নত  কিংবা নফল।কেউ রাতে বিতর পড়তে ভুলে কিংবা বিশেষ কোন কারনে পড়তে না পারলে, সকালে বিতর পড়ে নিবে(তিরমিযী, আবু দাউদ,ইবনে মাজা, মিশকাত-১২৬৮-১২৭৯, নায়ল-৩/২৯৪,৩১৭-১৯,মির আত-৪/২৭৯

৫) বিতির  সর্বোচ্চ কত রাকাত ও  কত বার পড়া যায় ?

বিতর সর্বোচ্চ ০৯ রাকাত। বিতর এশার সালাতের পর থেকে ফজর সালাতের, পূর্ব পর্যন্ত ১ বার পড়া যাবে।

হযরত কায়েস ইবনে তুলক(রা:) বলেন, ‘রমযান মাসে আমার পিতা তুলক ইবনে আলী(রা:) আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে। তিনি আমাদের সাথে রাতে থাকেন। তিনি ঐ রাতে আমাদের নিয়ে তারাবীর নামায ও বিতরের নামায পড়েন’।তারপর তিনি এক মসজিদে যেয়ে তার সাথীদের সাথে নামায পড়েন। শেষে বিতরের নামায বাকী থাকলো। তিনি এক ব্যাক্তিকে সামনে ঠেলে দিয়ে বলেন,তুমি তাদেরকে নিয়ে বিতিরের নামায পড়ো।নিশ্চয় আমি রাসুল্লাহকে(রা:) বলতে শুনেছি, এক রাতে ২ বার বিতিরের নামায পড়তে নাই নাসায়ী-১৬৮০

৬) বিভিন্ন ধরনের বিতর পড়ার নিয়ম ও হাদিস

বিতর ৩ ভাবে পড়া যায়ঃ-

ক)  ১ রাকাত বিতরঃ

নিয়ত(মনে বিতর ও মুখে ‘আল্লাহু আকবর’) বিতরের। ১ রাকাত পড়া হচ্ছে, দিন,প্রথম রাত ও শেষ রাতের শেষে,  মহান আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষী দেয়া। 

খ)  ৩ ও ৫ রাকাত বিতরঃ

সরাসরি ৩/৫ রাকাত পড়া, কোন  বৈঠক/সালাম ফিরানো  ছাড়া। উভয় ক্ষেত্রেই  শেষ রাকাতে দোয়া কুনুত পড়া। অথবা

(২+১)  কিংবা  (২+২+১) করে ২ রাকাতগুলোতে  নফল/বিতরের  নিয়ত করা ও ১ রাকাতগুলোতে  বিতরের নিয়ত করা। ১ রাকাত বিতর ২ রাকাত নফলগুলোতে  বিতর বা বিজোড়ে  পরিনত করবে। এই  পদ্ধতির হাদিসগুলো  সবচেয়ে শক্তিশালী ও রাবী/সনদ সবচেয়ে বেশী বিশ্বাসযোগ্য।পড়তে ও হিসাবে সুবিধা, যখন কেউ বেশী সংখ্যক বিতর পড়বে।

গ)  ৭ ও ৯ রাকাত  বিতরঃ

বিতরের নিয়ত করে, ৬ রাকাত পড়ার পর বৈঠক করা ও পরের রাকাতে সালাত শেষ করা।একই ভাবে  ৮ রাকাতে বৈঠক করে ৯ রাকাতে সালাত শেষ করা। অথবা 

  (২+২+২+১) এবং  (২+২+২+২+২+১)  করে  খ-এর নিয়মে পড়া।

 

#  উম্মে সালমা(রা:) থেকে বর্নিত,’ রাসুলুল্লাহ(স:) ৭ কিংবা ৫ রাকাত বিতরের নামায পড়তেন এবং মাঝখানে সালামও ফিরাতেন না এবং কোন কথাও বলতেন না’। ইবনে মাজাহ- ১১৯২

#  দুই রাকাত দুই রাকাত করে ০৮ রাকাত সালাত পড়তেন।অতঃপর মাঝখানে না বসে, এক সালামে ৫ রাকাত বিতর পড়তেন। বুখারী,মুসলিম

#   হযরত আয়েশা(রাঃ) থেকে বর্নিত, “একত্রে ০৯ রাকাত পড়তেন। ক্রমাগত ০৮ রাকাত পড়ে, ৮ম রাকাতে বসতেন এবং সেই বসায় আল্লাহর জিকির ও হামদ করতেন এবং দুয়া করতেন।তারপর দাড়িয়ে নবম রাকাত(বিতর) পড়ে সালাম ফিরাতেন”।

 মুসলিমমিশকাত-১২৫৭,বায়হাকী-৩/৩০,মিরআত-৪/২৬৪-৬৫

# তিনি বিতরের নামায যখন ৩ রাকাত পড়তেন, তখন প্রথমে ২ রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে নিতেন।তারপর ১ রাকাত পড়ে ,সালাম ফিরিয়ে নামায সমাপ্ত করতেন।

# হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকে বর্নিত, তিনি বিতরের ২ রাকাত এবং ১ রাকাতের মধ্যে (সালাম ফিরিয়ে) পৃথক করে নিতেন এবং তিনি বলেছেন, নবী(স:) এই রকমইকরতেন। ইবনে হিব্বান-২৪৩০

৭) সালাতে না বসার উদাহরন

#  তিনি বিতরের নামাজ যখন ৩ রাকাত পড়তেন, তখন দুই রাকাত পড়ে বসতেন না কিংবা তাশাহহুদও পড়তেন না। বরং একসাথে ৩ রাকাত শেষেই বসতেন।হযরত আয়েশা(রা:) থেকে বর্নিত, ‘নবী(স:) ৩ রাকাত বিতর পড়তেন, যার শেষ রাকাত ছাড়া তিনি কোথাও বসতেন না’।   বায়হাকী,হাকেম

#  হযরত আয়েশা(রা:) থেকে বর্নিত,’রাসুলুল্লাহ(স:) রাতের বেলা তের রাকাত নামায পড়তেন। এর মধ্যে ৫ রাকাত পড়তেন বিতর এবং তাতে একবারে শেষে ছাড়া আর কোন বৈঠক করতেন না’।  মুসলিম- ১৫৯৭, নাসায়ী-১৭১৮

#   রাসুলুল্লাহ(স:) বলতেন,’তোমরা বিতরের ৩ রাকাত নামাজকেমাগরিবের নামাযের সদৃশ করো না

# হযরত আবু হুরায়রা(রা:) থেকে বর্নিত,’ রাসুলুল্লাহ(স:) বলতেন,’তোমরা মাগরিবের মত করে  ৩ রাকাত বিতরের নামায পড়ো না। বরং ৫ রাকাত, ৭ রাকাত, ৯ রাকাত কিংবা ১১ রাকাত দ্বারা বিতর পড়ো’। ত্বাহাবী,দারু কুত্বনী,ইবনে হিব্বান,হাকেম  

#  নবী রাসুলুল্লাহ (স:) বিতরের নামায ৯, ১১ কিংবা ১৩ রাকাত পড়তেন।তবে এ সব বর্ননায় সাধারনত: রাতের নফল নামায পড়ার সময় ৮ রাকাতের শেষে ১ রাকাত বিতর, ১০ রাকাতের শেষে ১ রাকাত বিতর কিংবা ১২ রাকাতের শেষে ১ রাকাত বিতর পড়তেন।

#  ‘রাসুলুল্লাহ(স:) রাতে ৮ রাকাত নামায পড়তেন।তারপর ১ রাকাত বিতির পড়তেন। এরপর বসে বসে ২ রাকাত (শাফিউল বিতরের) নামায পড়তেন’।  আহমদ,মুসলিম-১৬০১

#  হযরত কায়েস ইবনে তুলক(রা:) বলেন, ‘রমযান মাসে আমার পিতা তুলক ইবনে আলী(রা:) আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে। তিনি আমাদের সাথে রাতে থাকেন। তিনি ঐ রাতে আমাদের নিয়ে তারাবীর নামায ও বিতরের নামায পড়েন’।

৮। হাদীস ও ১ রাকাত বিতির

# আবদুল্লাহ বিন উমার(রাঃ)  হতে বর্নিত, তিনি বলেন ,”রাসুলুল্লাহ(সঃ) বলেছেন, বিতর হল এক রাকাত, রাতের শেষাংশে”।

# হযরত আবু আইয়ুব থেকে বর্নিত, ‘নবী(সঃ) বলেছেন, বিতরের নামায আবশ্যকীয়।যে ব্যাক্তি ৫ রাকাত পড়তে চায় সে ৫ রাকাত পড়বে, যে ৩ রাকাত পড়তে চায় ৩ রাকাত পড়বে এবং যে ১ রাকাত পড়তে চায় ১ রাকাত পড়বে।বুখারী- ১৩৫,১৫৩  মুসলিম-২৫৩-২৫৬  – ইবনে মাজাহ-১১৯০,নাসায়ী-২৪৬,২৪৭ ,১৭১২,  আবু দাউদ-১৪১২,২০১ পৃষ্ঠা  তিরমিযী-প্রথম খন্ড- ১০৬ পৃষ্ঠা,  মিশকাত- ১১১,১১২,  বুখারী- ইসলামিক ফাউন্ডেশন-১ম খন্ড-হাদীস নং- ৯৩২,৯৩৪,৯৩৬  বুখারী আজিজুল হক- ৫৪০,  বুখারী আধুনিক প্রকাশনী- ১ম খন্ড হাদীস নং- ৯৩২,৯৩৪,৯৩৬  মিশকাত – নূর মোহাম্মাদ আযমী- ৩য় খন্ডো মাদরাসা পাঠ্য – ২য় খন্ড- ১১৮৫, ১১৮৬,১১৯৬ 

#  ইবনু উমার থেকে বর্নিত, “এক ব্যাক্তি নবী(সঃ) এর নিকট রাতের সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞসা করল। আল্লাহর রাসুল(সঃ) বলেন, রাতের সালাত দুই দুই রাকাত করে।আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি ফজর হবার আশংকা করে, সে যেন ১ রাকাত সালাত আদায় করে নেয়। আর সে যে সালাত আদায় করলো, তা তার জন্য ‘বিতর’ হয়ে যাবে”।

নবী(স:) রাতের তাহাজ্জুদের নামায দুই দুই রাকাত করে আদায় করতেন এবং ১ রাকাত বিতর পড়তেন।  বুখারী –  ৯৩৪, ৯৩৬

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাবা ইবনে সু’আইর(রা) থেকে বর্নিত (নবী উনার মাথায় হাত বুলায়ে দিয়েছিলেন), ‘তিনি সাদ বিন আবিওয়াক্কাসকে বিতরের নামায ১ রাকাত পড়তে দেখেছেন’।  বুখারী-৬৯১০,৯৩২,৯৩৫

 হযরত আয়েশা থেকে বর্নিত, ‘রাসুলুল্লাহ রাতে ১১ রাকাত নামায পড়তেন।তার মধ্যে ১ রাকাত বিতর পড়তেন। নামায শেষ করে তিনি ডান পাশে ফিরে শুতেন।অত:পর ভোরে আজান হলে, তিনি উঠে, সংক্ষিপ্ত ২ রাকাত(ফজরের সুন্নাত) নামায পড়তেন’।

মুসলিম – ১৫৯৪,১৫৯৫,১৬০৪,১৬২৫,১৬২৬,১৬২৭,১৬২৮,১৬৩৪-১৬৪০

# হযরত ইবনে উমর বলেন, ‘নবী বলেছেন, রাতের নামায(নফল) পড়বে ২ রাকাত করে।আর বিতরের নামায হলো ১ রাকাত।  নাসা্য়ী- ১৬৯৪,১৬৬৮-১৬৭৫,১৬৯০-৯৩,১৬৯৫-৯৭

হযরত আয়েশা(রাঃ) থেকে বর্নিত,উবাই ইবনু কাব(রাঃ) বলেন,রসুলুল্লাহ(স:)  (রাতে নামাযে) প্রতি ২ রাকাতে সালাম ফিরাতেন এবং বিতর নামায ১ রাকাত পড়তেন।  ইবনে মাজাহ-১১৭৪- ১১৭৭

#  ‘রসুল(স:) ১ রাকাত বিতর নামায পড়তেন’।  তিরমিজীতে- ৪৩৩  (বুখারী ও মুসলিমের উদ্ধৃতি)

#  ‘বিতরের  সালাত  ১ রাকাত’।   আবু দাউদ – ১৪২১(মুসলিম ও নাসায়ীর উদ্ধৃতি)

হযরত ইবনে আব্বাস(রা:) বলেছেন, ‘রসুলুল্লাহ রাতের বেলায় ৮ রাকাত(তাহাজ্জুদ) নামায পড়তেন। ৩ রাকাত বিতরের নামায পড়তেন ও ফজর নামাযের আগে ২ রাকাত(সুন্নাত) নামায পড়তেন।  নাসায়ী -১৬৯৮,১৭০০-১৭০৬,১৭০৮

#  আবু আইয়ুব(রা:) থেকে বর্নিত,  ‘নবী(স:) বলেছেন, কিতরের নামায আবশ্যকীয়। অতএব যা ইচ্ছা সে ৭ রাকাত, ৫ রাকাত, ৩ রাকাত কিংবা ১ রাকাত পড়ুক’।  নাসায়ী- ১৭১১

৯। সাহাবীদের ১ রাকাত বিতির পড়া 

#  চার খলিফাসহ অধিকাংশ সাহাবী, তাবেঈ ও মুজতাহিদগন ১ রাকাত বিতরে অভ্যস্ত ছিলেন।

 নায়লুল আওতার-৩/২৯৬, মিরআত-৪/২৫৯

হযরত ওসমান(রাঃ)  এক রাত্রে এক রাকাত দিয়ে বিতর পড়েছেন। সাদ(রাঃ) ও মুয়াবিয়া(রাঃ) ১ রাকাত দ্বারা বিতর পড়েছেন। (ফাতহুল বারী)

#  আবু  তালিব(রাঃ) বলেন, আমি  আবু আবদুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনি কোন হাদিসকে অগ্রাধিকার দেন। তিনি বলেন, মাঝখানে না বসেম একাধারে  ৫,৭,৯ রাকাত বিতর ঠিক আছে। তবে ১ রাকাত দিয়ে বিতর পড়ার হাদিসগুলো  বেশী শক্তিশালী।আমি সেটাই করি।

যাদুল মা’আদ–  হাফিজ ইবনুল কাইয়ুম আল যাওযী(র) 

১০। ৩ রাকাত বিতর ও মাগরিবের সালাত  

#  আবু হুরায়রা(রাঃ) থেকে বর্নিত,” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তোমরা মাগরিবের ছালাতের ন্যায় (মাঝখানে বৈঠক করে) বিতর আদায় করো না’। দারা কুৎনী-১৬৩৪-৩৫, আবু হাতিম, ইবনু হিব্বান

# ৩  রাকাত বিতর  একটানা ও এক  সালামে  আদায় করাই উত্তম

  মিরাত-৪/২৭৪ ,  হাকেম-  ১/৩০৪  পৃষ্ঠা

১১।  ‘বিতরে’র  দোয়া-কু’নুত  রুকুর  আগে/পরে

‘কুনু’ত অর্থ বিনম্র আনুগত্য।  দোয়া কু’নুত ২ প্রকারঃ-  কুনুতে রাতেলা ও  কুনুতে নাযেলা।

#  কুনুতে  রাতেলাঃ   

ক)  এটি বিতরে সালাতে পড়তে হয়।এটি সারা বছর পড়া চলে(প্রাগুক্ত,মিশকাত-১২৭৩,মির আত-৪/২৮৩,ফিকহুস সুন্নাহ-১/১৪৬)।

খ)  তবে মাঝে মাঝে ছেড়ে দেয়া ভাল। কারন এটি বিতরের জন্য ওয়াজিব না(আবু দাউদ,নাসাঈ,তিরমিযী,মিশকাত-১২৯১-৯২-অনু-৩৬,মিরআত-৪/৩০৮)।

গ)  দোয়া কু’নুত রুকুর আগে/পরে দু’ভাবেই পড়া জায়েজ আছে।(মুত্তাফাক আলাইহেমিশকাত-১২৮৯,ইবনু মাজা-১১৮৩-৮৪,মিশকাত-১২৯৪,মির আত-৪/২৮৬-৮৭,ফিকহুস সুন্নাহ-১/১৪৭,আলবানী- কিয়ামু রমজান-পৃষ্ঠা-২৩।

ঘ)  আবু  হুরায়রা(রাঃ) বলেন,”রাসুলুল্লাহ(সঃ) যখন কারো পক্ষে/বিপক্ষে দোয়া করতেন, তখস রুকুর পরে  কুনুত পড়তেন” (মুত্তাফাক আলাইহে-মিশকাত- ১২৮৮)।কু’নুত শেষে ৩ বার ‘সুবহা-নাল মালিকিল কুদ্দুস’ বলতে হবে।  নাসাঈ- ১৬৯৯ সনদ সহী

ঙ) আমাদের দেশে কু’নুত পড়ার জন্য রুকুর আগে, ‘তাকবীরে তাহরীমার’ মত দুই হাত তুলে আবার বাধার কোন বিশুদ্ধ দলিল নাই। ইরওয়াউল গালীল-২৪৭,মিরআত-৪/২৯৯, অনু কুনুত-৩৬

চ)   “আল্লা-হুম্মা ইন্না নাস্তানুকা ওয়া নাস্তাগফিরুকা” বলে, বিতরে যে কু’নুত পড়ানো হয়, সেটা মুরসাল বা যঈফ। মারাসীলে আবু দাউদ-৮৯,বায়হাকী-২/২১০, মিরকাত-৩/১৭৩-৭৪,মিরআত-৪/২৮৫।আবার এটা কুনুতে নায়েলা হিসাবে বর্নিত হয়েছে, রাতেবাহ হিসাবে নয়(ইরওয়া-৪২৮-শেষে-২/১৭২ পৃষ্ঠা)।“কুনুতে নাযেলাহ” থেকে মধ্যম অংশটুকু “ইন্না নাস্তানুকা” নিয়ে সেটাকে কুনুতে বিতর হিসাবে চালু করা হয়েছে,যেটা ভুল। আলবানী বলেন, এই দুয়াটি ওমর(রাঃ) ফজরের সালাতে “কুনুতে নাযেলাহ” হিসাবে পড়তেন। ইরওয়াউল গালীল 

বিতরের জন্য সর্বোত্তম দোয়া হচ্ছেঃ

“উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাহ্দিনী ফীমান হাদায়তা, ওয়া ‘আ-ফিনী ফীমান ‘আ-ফায়তা, ওয়া তাওয়াল্লানী ফীমান তাওয়াল্লায়তা, ওয়া বা-রিক্লী ফীমা ‘আ’ত্বায়তা, ওয়া ক্বিনী শার্রা মা ক্বাযায়তা; ফাইন্নাকা তাক্বযী ওয়া লা ইয়ুক্বযা ‘আলায়কা, ইন্নাহূ লা ইয়াযিল্লু মাঁও ওয়া-লায়তা, ওয়া লা ইয়াইয্ঝু মান্ ‘আ-দায়তা, তাবা-রক্তা রববানা ওয়া তা’আ-লায়তা, ওয়া ছাল্লাল্লা-হু ‘আলান্ নাবী’।

অনুবাদ : হে আল্লাহ! তুমি যাদেরকে সুপথ দেখিয়েছ, আমাকে তাদের মধ্যে গণ্য করে সুপথ দেখাও। যাদেরকে তুমি মাফ করেছ, আমাকে তাদের মধ্যে গণ্য করে মাফ করে দাও। তুমি যাদের অভিভাবক হয়েছ, তাদের মধ্যে গণ্য করে আমার অভিভাবক হয়ে যাও। তুমি আমাকে যা দান করেছ, তাতে বরকত দাও। তুমি যে ফায়ছালা করে রেখেছ, তার অনিষ্ট হতে আমাকে বাঁচাও। কেননা তুমি সিদ্ধান্ত দিয়ে থাক, তোমার বিরুদ্ধে কেউ সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। তুমি যার সাথে বন্ধুত্ব রাখ, সে কোনদিন অপমানিত হয় না। আর তুমি যার সাথে দুশমনী কর, সে কোনদিন সম্মানিত হ’তে পারে না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি বরকতময় ও সর্বোচ্চ। আল্লাহ তাঁর নবীর উপরে রহমত বর্ষণ করুন।”  সুনানু আরবা’আহ, দারেমী, মিশকাত হা/১২৭৩ ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫; ইরওয়া হা/৪২৯, ২/১৭২। উল্লেখ্য যে, কুনূতে বর্ণিত উপরোক্ত দোআর শেষে ‘দরূদ’ অংশটি আলবানী ‘যঈফ’ বলেছেন। তবে ইবনু মাসঊদ, আবু মূসা, ইবনু আববাস, বারা, আনাস প্রমুখ ছাহাবী থেকে বিতরের কুনূত শেষে রাসূলের উপর দরূদ পাঠ করা প্রমাণিত হওয়ায় তিনি তা পাঠ করা জায়েয হওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন -ইরওয়া ২/১৭৭, তামামুল মিন্নাহ ২৪৬; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৪৭। এটি রাসুলুল্লাহ(সঃ) হযরত হাসান(রাঃ)-কে শিখায়েছিলেন ও ইমাম তিরমিযী কুনুতের জন্য এটাকে শ্রেষ্ঠ দোয়া হিসাবে বলেছেন।

   তবে দো’আয়ে কুনূতের শেষে ইস্তেগফার সহ যেকোন দোয়া পড়া যায়।কেননা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) কুনূতে কখনো একটি নির্দিষ্ট দোয়া পড়তেন না, বরং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দোয়া পড়েছেন (দ্রঃ আলী (রাঃ) বর্ণিত হাদীছ আবুদাঊদ, তিরমিযী প্রভৃতি, মিশকাত হা/১২৭৬; মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনে তায়মিয়াহ ২৩/১১০-১১; মির‘আত ৪/২৮৫; লাজনা দায়েমাহ, ফৎওয়া নং ১৮০৬৯; মাজমূ‘ ফাতাওয়া উছায়মীন, ফৎওয়া নং ৭৭৮-৭৯)।তাছাড়া যেকোন দোয়ার শুরুতে হাম্দ ও দরূদ পাঠের বিষয়ে ছহীহ হাদীছে বিশেষ নির্দেশ রয়েছে (আহমাদ, আবুদাঊদ হা/১৪৮১; ছিফাত পৃঃ ১৬২)।অতএব আমরা ‘ইস্তেগফার’ সহ যেকোন দোয়া ও ‘দরূদ’কুনূতের শেষে পড়তে পারি।

#  কুনুতে  নাযেলাঃ  বিপদসহ বিশেষ কোন জরুরী কাজে পড়া হয়।

   উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগফির লানা ওয়া লিল মু’মিনীনা ওয়াল মু‘মিনা-তি ওয়াল মুসলিমীনা ওয়াল মুসলিমা-তি, ওয়া আল্লিফ বায়না কুলূবিহিম, ওয়া আছলিহ যা-তা বায়নিহিম, ওয়ান্ছুরহুম ‘আলা ‘আদুউবিকা ওয়া ‘আদুউবিহিম। আল্লা-হুম্মাল‘আনিল কাফারাতাল্লাযীনা ইয়াছুদ্দূনা ‘আন সাবীলিকা ওয়া ইয়ুকায্যিবূনা রুসুলাকা ওয়া ইয়ুক্বা-তিলূনা আউলিয়া-আকা। আল্লা-হুম্মা খা-লিফ বায়না কালিমাতিহিম ওয়া ঝালঝিল আক্বদা-মাহুম ওয়া আনঝিল বিহিম বা’সাকাল্লাযী লা তারুদ্দুহূ ‘আনিল ক্বাউমিল মুজরিমীন।

অনুবাদ : হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এবং সকল মুমিন-মুসলিম নর-নারীকে ক্ষমা করুন। আপনি তাদের অন্তর সমূহে মহববত পয়দা করে দিন ও তাদের মধ্যকার বিবাদ মীমাংসা করে দিন। আপনি তাদেরকে আপনার ও তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! আপনি কাফেরদের উপরে লা‘নত করুন। যারা আপনার রাস্তা বন্ধ করে, আপনার প্রেরিত রাসূলগণকে অবিশ্বাস করে ও আপনার বন্ধুদের সাথে লড়াই করে। হে আল্লাহ! আপনি তাদের দলের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করে দিন ও তাদের পদসমূহ টলিয়ে দিন এবং আপনি তাদের মধ্যে আপনার প্রতিশোধকে নামিয়ে দিন, যা পাপাচারী সম্প্রদায় থেকে আপনি ফিরিয়ে নেন না’।বায়হাকী-২/২১০-১১

আসিম হতে বর্নিত, “তিনি বলেন,আমি আনাস ইবনু মালিক(রাঃ)-কে কুনুত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বলেন, কুনুত অবশ্যই পড়া হত। আমি জিজ্ঞাসা করলাম,রুকুর পূর্বে না পরে ? তিনি বলেন, রুকুর পূর্বে।আসিম(রহ) বললেন,’ অমুক ব্যাক্তি আমাকে আপনার বরাত দিয়ে বলেছেন যে, আপনি বলেছেন,রুকুর পরে। তখন আনাস(রাঃ) বলেন সে ভুল বলেছে। রাসুলুল্লাহ(সঃ)  রুকুর পরে ১ মাস ব্যাপী কুনুত পড়েছেন। আমার জানা মতে, তিনি ৭০ জন সাহাবীর একটি দল, যাদের ‘কুররা’(অভিজ্ঞ কারী) বলা হোত, মুশরিকদের কোন একটি দলের কাছে পাঠান। এরা সেই কউম নয়,যাদের বিরুদ্ধে আল্রাহর রাসুল(সঃ) বদ্দোয়া করেছিলেন।বরং যাদের সাথে তার চুক্তি  ছিল,(তারা চুক্তি ভংগ করে কারীদের হত্যা করেছিল) তিনি এক মাস ব্যাপী কুনুতে সে সব কাফিরদের অভিসম্পাৎ করেছিলেন।   বুখারী-১০০১,আ,প্র-৯৪৩,ই.ফা-৯৪৮ 

১২) অন্য সালাতে দুয়া কু’নুত

#  মুহাম্মাদ ইবনু শিরিন হতে বর্নিত, তিনি বলেন,আনাস ইবনু মালিক(রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ফজরের সলাতে কি নবী(সঃ) কুনুত পড়েছেন ? তিনি বললেন, কিছু সময় রুকুর পরে পড়েছেন। বুখারী- ১০০২,১০০৩,১৩০০,২৮০১,২৮১৪,৩০৬৪,৩১৭০,৪০৮৮-৪০৯২,৪০৯৪,৪০৯৫,৪০৯৬,৬৩৯৪,৭৩৪১  মুসলিম- ৫/৫৪-হা-৬৭৭ , আহমদ-১৩৬০২ , আ-প্র- ৯৪২,  ই-ফা- ৯৪৭ 

#  আনাস ইবনু মালিক(রাঃ)  হতে বর্নিত, তিনি বলেন, মাগরিব ও ফজরের সালাতে দুয়া কু’নুত পড়ানো হত। বুখারী-৭৯৮, আ.প্র- ৯৪৫,  ই.ফা- ৯৫০

১৩। ইসলামী ব্যাক্তিত্বের মন্তব্য  ও  বইয়ের উদাহরন

তথ্যঃ  বুখারী/তাওহীদ পাবলিকেশন্স, মুসলিম/  ,  আবু দাউদ/সফট-কপি, যাদুল মা’আদ/ হাফিয ইবনুল কাইয়ুম আল-যাওযী(র) ,আলবানী ,

=====

 ইমাম, মাযহাবী ফিৎনা,মুসলিম ঐক্য ও মহান আল্লাহ

১।  মুসলিম ঐক্য

(‘মুসলিম ঐক্য’  এই  আর্টিকলেটি জনাব জাকির নায়েকের “বক্তৃতা সামগ্রী-৫ম খন্ড” থেকে নেয়া হয়েছে ও এখানের প্রয়োজনে  ব্যাপক পরিবর্তন করে, এখানে  দেয়া হয়েছে।  

#  হযরত মুহাম্মাদ(সঃ)

জন্মগ্রহন- ৫৭০/৫৭১ খৃষ্টাব্দের  ২/২২ এপ্রিল।

#  হযরত ওসমান(রাঃ)

মৃত্যু- ৩৫  হিজরী,১৮ই জিলহজ্জ।

ইমাম আবু হানিফা(র)

জন্মগ্রহন ৮০ হিজরী(৬৯৯খৃষ্টাব্দ)ও মৃত্যু ১৫০ হিজরী(৭৬৭ খৃষ্টাব্দ)।

#  ইমামা মালিক(র)

জন্মগ্রহন- ৯৫ হিজরী(৭১৪ খৃষ্টাব্দ) ও মৃত্যু-  ১৭৯ হিজরী(৭৯৮ খৃষ্টাব্দ)।

#  ইমামা  শাফেয়ী(র)

জন্ম- ১৫০ হিজরী(৭৬৭ খৃষ্টাব্দ)) ও  মৃত্যু- ২৪০ হিজরী(৮৫৪ খৃষ্টাব্দ)

#  ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল(র)

জন্ম- ১৬৪ হিজরী(৭৮০ খৃষ্টাব্দ)

#  ইমাম বুখারী(রহ)

জন্ম- ১৯৪ হিজরীর ১৩ শাওয়াল, জুমুয়ার পরে  ও মৃত্যু ২৫৬ হিজরী, গ্রাম-খারতাংগ,১লা শা য়াল,ঈদুল ফিৎর, বয়স-৬২ । হাদীস সংকলনের পূর্বে তিনি গোসল করতেন ও ২ রাকাত সালাত পড়তেন। ৬ লক্ষ হাদীস থেকে ১৬ বছর যাচাই করে তিনি ৪০০০ হাজার হাদীস লিপিবদ্ধ করেন। 

#  ইমাম  মুসলিম(রহ)

ইমাম মুসলিম(রহ)  ২০২ হিজরীতে মতান্তরে ২০৬/২০৮ হিজরীতে খোরাসানের নায়সাবুরে জন্মগ্রহন করেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল(রহ)  ও ইমাম বুখারী(রহ) উনার শিক্ষক ছিলেন।ইমাম মুসলিম(রহ) ২৬১/৮৭৫ সনে নায়সাবুরে ইন্তেকাল করেন। তিনি ১৬ বছরে ৪ হাজার হাদিস লিপিবদ্ধ করেন। 

# ইমাম গাজ্জালী(র)

জন্ম- ৪৫০ হিজরী(১০৫৫ খৃষ্টাব্দ)  ও মৃত্যু- ৫০৫ হিজরী(১১১১ খৃষ্টাব্দ)।

#  ইমাম ইবনে তাইমিয়া(র)

জন্ম- ৬৬১ হিজরী(১২৬২ খৃষ্টাব্দ) ও মৃত্যু- ৭২৮ হিজরী(১৩২৭ খৃষ্টাব্দ)

#  শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী(র)

জন্ম- ১১১৪ হিজরী(১৭০৩)  ও মৃত্যু (১১৭৬ খৃষ্টাব্দ)

ইমাম আবু হানিফা(র) থেকে ইমাম মালেক(র) ১৫ বছর, ইমামা মালিক(র) থেকে ইমাম শাফেয়ী(র) ৫৩ বছর ও ইমাম শাফেয়ী(র) থেকে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল(র) ১৩ বছর পরে জন্মগ্রহন করেন। অর্থাৎ  ইমাম আবু হানিফা(র) থেকে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের(রা) জন্মগ্রহনের তফাৎ হচ্ছে  ৮১ বছর।

 যখনই কোন মুসলিমকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ভাই আপনি কিভাবে সালাত,জানাযা, ‘আমিন জোরে/আস্তে বলা,সালাতে সুরা ফাতেহা পড়া/না পড়া ইত্যাদি পালন করেন ? উত্তর আসে, আমি/আমরা হানাফি। এভাবে গড়ে উঠেছে হানাফি, মালেকী, হাম্বলী, শাফেয়ী, শিয়া, ওয়াহাবী, আহলে হাদিস, সালাফি ইত্যাদি মুসলিম মতবাদ।এই পরিচয় দিয়ে আপনি মুসলিম মিল্লাতে বিভেদ সৃষ্টি করছেন।যদিও আপনি নিজেকে একনিষ্ঠ মুসলিম মনে করেন। এই বিভেদ সৃষ্টির জন্য মহান আল্লাহ হাশরের দিনে, আপনার বিচার করতে পারেন কারন আমি জেনেই এটা করছি ও ফিৎনার প্রবক্তার ভূমিকায় অবতীর্ন হচ্ছি।  সালাত,জানাযা, ‘আমিন জোরে/আস্তে বলা,সালাতে সুরা ফাতেহা পড়া  ইত্যাদিসহ  ধর্মের বিভিন্ন পালন করার সময়, প্রথমে দেখছেন, মাযহাব কি বলে ? কিন্তু তারপরই আপনার দেখা উচিৎ ছিল, সহীহ হাদীস কি বলে ? সেটা আপনি করছেন না।ব্যাপক সংখ্যক বিশেষজ্ঞ বলে, আমরা অমুক মাযহাবের অনুসারী।আর এ জন্যই আপনি দায়ী। এটা কি আশ্চর্য না, আপনি সহীহ হাদীসের অনুসারী না হয়ে, মাযহাবের অনুসারী। যদি মাযহাবের সেই হাদীসটা ভুলও হয় ! খুব অল্প সংখ্যক বিশেষজ্ঞ আছেন, যারা হাদীসের রাবী,সনদ(সহীহ হবার পরও), নিজ মাযহাবকে ঠিক রাখার জন্য মানুষকে সঠিক কথা বলেন না।আবার কিছু ইমাম আছেন, যারা চাকুরী যাবার দুঃশ্চিন্তায়  মাযহাবের ফিৎনায় অংশগ্রহন করেন। আপনি কি সমস্ত মাযহাবের আসল বইগুলো পড়েছেন ? পড়া থাকলে মাযহাব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে আপনার সুবিধা হবে। 

  আপনার কাছে কি এমন কোন নীতি আছে যেটা দিয়ে এই বিভেদ দূর করা যায় ? সমস্ত মতবাদের মধ্যে যেটা, সহীহ হাদিসকেই অনুসরন করে কিংবা সহীহ হাদীসের সবচেয়ে কাছে, সেটাকেই অনুসরন করলেই, এই বিভেদ দূর করা সম্ভব।  হতে পারে সহীহ-হাদীসকে জানা সবার পক্ষে সম্ভব না। তবে ধর্মের চর্চা বাড়ালেই এই সমস্যা চলে যাবে। এই কারনে মহান আল্লাহ জ্ঞ্যান অর্জন ফরয করে দিয়েছেন। যেসব শিক্ষিতের পক্ষে এটা সম্ভব, তারা এটা বুঝলেই, অন্যরা এটা অনুসরন করবে।

#  “যারা দ্বীন সম্পর্কে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোন দায়িত্ব তোমার নয়।“ আনআম-১৫৯

#  “মুশরিকদের অন্তভূর্ক্ত হইও না,যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার শরীক  বানায়ে পূজা করে,আর তাদের মত হইও না, যারা দ্বীনে মতভেদ সৃষ্টি করে।বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয় আর প্রত্যেক দল উল্লাস করে যে, তারা সত্যের পথে আছে। রোম-৩১,৩২

 “তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর আর কোন রকম মতেদ সৃষ্টি কোর না। শুরা-১৩,১৪

“যদি তোদের মধ্যে মতভেদ থাকে তাহলে, আল্লাহ ও তার রাসুলের কাছে কাছে ফিরে যাও। যদি তেমরা আল্লাহ ও তার রাসুলের  উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক।” নিসা- ৫৯  

  মহান আল্লাহ  আমাকে শেষ  রাসুল(সঃ), কুরআন ও সহীহ হাদীসের অনুসরন করতে বলেছেন ও মাযহাবী পরিচয় না দিয়ে, ‘মুসলিম’ বলে পরিচয় দিতে বলেছেন।তবে আমাদের সম্মানিত  মাযহাবেরর কাছে যেতে হবে ও আর সঠিকটা গ্রহন করে, ভুলটা বাদ দিতে হবে।তারপরেও সিদ্ধান্ত ভুল হলে হয়তো, মহান আল্লাহ ক্ষমা করবেন। কারন আমরা চেষ্টা করেছি।   

  সবার আগে রাসুল(সঃ),তারপর ৪ খলিফাসহ “আশারায়ে মুবাশ্বেরা”র  এবং অন্য সাহাবীরা। “বেহেশতের সংবাদপ্রাপ্তদের” মহান আল্লাহ নিজে ঠিক করেছেন। তালহা(রাঃ) ওহুদের যুদ্ধে ৩০ টা তীর নিজের শরীরে নিয়েছিলেন,রাসুল(সঃ)কে রক্ষার জন্য।উনার নাম ছিল “জীবন্ত শহীদ”। তারপরও তো তালহাকে(রাঃ) কিংবা ৪ খলিফাকে অন্ধ-ভাবে অনুসরনের কথা বলা হয়নি। একমাত্র নবী(সঃ)  ছাড়া কাউকে অন্ধ-ভাবে অনুসরন করতে মহান আল্লাহ বলেননি।

 আপনি তো একমাত্র রাসুল(সঃ) ছাড়া কাউকে অন্ধ-ভাবে অনুসরন করতে পারেন না। মাযহাব তো দূরের কথা। নবী/রাসুলরা যে সিদ্ধান্ত দিয়ে গেছেন, সেটার বিপরীতে ইজমা হতে পারে না।  ইজমা হয় নূতন সমস্যায়।

  আমাদের লক্ষ্য, সমস্ত  সাহাবী ও ইমামদের  থেকে  সঠিক জিনিসটাই গ্রহন করা  ও ভুলটা বাদ দেয়া।কারন নবী/রাসুল ছাড়া কেউই ভুলের উর্ধ্বে না। এজন্য আমাদের অনুসরন করতে  হবে, সহীহ হাদীস।ইমামদের সময়ে সামান্য একটা হাদীস/তথ্য পাবার জন্য  মাইলকে মাইল হাটতে/ঘোড়ায় যেতে হয়েছে। আর এখন জানার জন্য শুধু একটা ফোন যথেষ্ট।আরও আছে পত্রিকা,টিভি,সিনেমা, ইন্টারনেট,বই,ভিডিও ক্যাসেট। চারিদিকে শুধু তথ্য, কারন এটা তথ্য-প্রযু্ক্তির যুগ। সমস্যা হচ্ছে, সঠিক তথ্যের পাশাপাশি ভুল তথ্যওআপনার কাছে আসছে। এর মধ্যে থেকে সঠিকটা বেছে নিতে হবে।মহান আল্লাহ জ্ঞ্যানীদের কাছে যাবার জন্য বলেছেনঃ-

#  “আল্লাহকে মানো এবং তার রাসুলকে(সঃ) মানো এবং যারা তোমাদের মধ্যে ক্ষমতার অধিকারী এবং জ্ঞ্যানের অধিকারী তাদেরকে।“  নিসা-৫৯

  কারন সম্মানিত ইমামরা বলে গেছেন, “সঠিক হাদিসই আমার মাযহাব। এর চেয়ে ভাল হাদিস পেলে, আমারটা দেয়ালে ছুড়ে মার”।হাশরের মাঠে  সম্মানিত ইমামরা আপনার দায়িত্ব নিবেন না/নিতে পারবেনও না। কারন উনাদের বক্তব্য পরিষ্কার। খৃষ্টানদের মতো চিন্তা করার সুযোগ নাই। এরা বলে হযরত ঈশা(আঃ)  খৃষ্টানদের সমস্ত পাপ/ভুলের দায়িত্ব নিয়েছে। কাজেই  খৃষ্টানরা যাই করুক না কেন,তাদের কোন সমস্যা নাই।কারন আল্লাহ আর দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে পাঠাবেন না।সব মাযহাব যে পরিশ্রম করেছেন, এটা বিরল দৃষ্টান্ত।মহান আল্লাহ উনাদের ‘জান্নাতুল ফেরদাউস’ দিবেন, এটাই আমাদের দোয়া।মহান আল্লাহ উনাদের শান্তিতে রাখুন।

#  রাসুল(সঃ)  বলছেন, “আমার উম্মত ৭৩ দল হবে। এর থেকে এক দল ছাড়া সবাই দোযখে যাবে”।অর্থাৎ রাসুল(সঃ) আপনাকে সতর্ক করছেন।  

#  “শেষ জামানায় বিভিন্ন রকম ফেৎনা/মতবাদ  আসবে। এগুলো  থেকে বেচে, যে সঠিক পথে থাকতে পারবে,  মহান আল্লাহ তাকে ৫০ শহীদের মর্যাদা দিবেন। এখানেও রাসুল(সঃ) আপনাকে সতর্ক করছেন।

দ্বীনে বিভেদ সৃষ্টিকারীর সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাসুলকে(সঃ) বলেন,

#  “ফেৎনা হত্যার চেয়েও মারাত্নক”। বাকারা-১৯১

#  “যারা দ্বীন সম্পর্কে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে,তাদের কোন দায়িত্ব তোমার নয়” আনআম- ১৫৯ 

“যে রাসুলের আনুগত্য করে, সে মূলতঃ আল্লাহরই আনুগত্য করে”। আন-নিসা- ৮০

#  “তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে তোমাদের প্রতি যা কিছু অবতীর্ন হয়েছে,তার অনুসরন কর,তা বাদ দিয়ে তোমাদের নেতাদের অনুসরন কোর না।“ আল-আরাফ-৩

#  “আয়েশা থেকে  বর্নিত, রাসুলুল্লাহ(সঃ) বলেন, “যে ব্যাক্তি আমার এই দ্বীনে(নিজের পক্ষ থেকে)  কোন নূতন কথা  উদ্ভাবন করলো,-যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যান যোগ্য। বুখারী,মুসলিম।  

#  “যে  ব্যাক্তি জেনো-শুনে  আমার নামে মিথ্যা হাদীস বর্ননা করে, সে মিথ্যাবাদীদের  একজন”। মুসলিম

#  রিবঈ ইবনে হিরাস থেকে বর্নিত, তিনি আলীকে এক ভাষনে বলতে শুনেছেন,”রাসুলুল্লাহ(সঃ) বলেছেন,তোমরা আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ কোর না।কেননা যে ব্যাক্তি আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করবে, সে জাহান্নামে যাবে”। মুসলিম

  মূলতঃ  হানাফি,সুন্নী,আহলে হাদীস,শাফেয়ী,হাম্বলী,মালেকী,শিয়া, সালাফি,সালাফির বিভিন্ন দল ,আহলে সুন্নাত আল জামায়াত,ওহাবী প্রভৃতি ফিৎনাগুলো এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে।প্রতিটা দলই সঠিক পথে আছে বলে দাবী করছে। কিন্তু মহান আল্লাহ বলেন,

মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত হইও না।যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার শরিক বানিয়ে উপাসনা করে। আর তাদের মতো হইও না, যারা দ্বীনে মতভেদ সৃষ্টি করে, বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয় আর প্রত্যেক দল উল্লাস করে যে, তারা সত্যের পথে আছে।“ রোম-৩১,৩২

  এভাবে চিন্তাকে মহান আল্লাহ দ্বীনে বিভেদকারী ও ফিৎনা সৃষ্টিকারী হিসাবে, আখ্যায়িত করছেন। এর সাজা থেকে আমদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।কারন মহান আল্রাহ আমাদের মুসলিম হিসাবে পরিচয় দিতে বলেছেন।আর আমরা নিজের পরিচয় দিচ্ছি, হাম্বলী,শাফেয়ী হিসাবে।  এই ফিৎনা থেকে বাচার জন্য কুরআন ও সহীহ হাদীস ছাড়া কি আর কোন উপায় কারো কাছে আছে ?

#  “ ইবরাহীম(আঃ) ইহুদী অথবা খৃষ্টান ছিলেন না, তিনি ছিলেন আত্নসমর্পনকারী মুসলিম।“ আল-ইমরান-৬৭

#  “তিনি তোমাদের জন্য যে, দ্বীন মনোনীত করেছেন, সে দ্বীন হচ্ছে ইবরাহীমের আর তিনি তোমাদের নাম দিয়েছেন মুসলিম,আগের সকল কিতাবে এবং এই কিতাবেও। সুতরাং নামায আদায় করো এবং যাকাত দাও।“ হজ্জ-৭৮

সম্মানিত ইমামগন যতগুলো হাদীস পেয়েছিলেন, পাওয়া হাদীসের ভিত্তিতে ঐ সমস্ত রায়গুলো দিয়েছিলেন।ফলে উনাদের দেয়া বিভিন্ন রকম হয়েছে। উনারা পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগও পান নাই,দূরত্বতো প্রধান সমস্যা আছেই। উনারা জানতেন উনারা অবশ্যই সমস্ত হাদীস পাননি।ফলে রায় কম-বেশী হতে পারে। তাই উনারা বলেন,

#  “সহীহ হাদীসই আমার মাযহাব।যদি তোমরা  সহীহ হাদীস পাও, তাহলে সেটাই আমার মাযহাব।যদি তোমরা একটা সহীহ হাদীসও পাও,তাহলে সেটাই আমার জীবন-দর্শন।“ 

#  “যদি আমার কোন ফতওয়া আমার কোন একটা মতামত আল্লাহর কিতাবের বিরুদ্ধে যায় এবং রাসুল(সঃ)এর কথার বিরুদ্ধে যায়,তাহলে আমার সে মতামত বাতিল করে দাও।“

#  “যদি তোমাদের মধ্যে মতভেদ  থাকে, তাহলে আল্লাহ ও তার রাসুলের(সঃ) কাছে ফিরে যাও।যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের  উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক।“  নিসা-৫৯

#  “৭৩ টা দল হবে আর ১টা দল বাদে সবাই দোযখে যাবে।এবং নাযাতপ্রাপ্ত দলে তারাই থাকবে, যারা নবীজি এবং তার সাহাবাগনকে অনুসরন করবে।“

#   “তোমাদের মধ্যে কিছু লোক থাকবে, যারা এমন কিছু জিনিস প্রচার করবে,যেগুলো আমার সুন্নাহ নয়”।

#  “একটা সময় আসবে যখন সমাজে অনেক খারাপ কাজ হবে।আর কখনো কেউ যদি মুসলিম উম্মাহর একতা নষ্ট করতে চায়, তাকে তরবারী দিয়ে আঘাত কর।আর তাতেও যদি সে ক্ষান্ত না হয়, তাহলে তাকে মেরে ফেল”। মুসলিম-৩য় খন্ড- ৪৫৬৫


..................................................................................................................................................................................................................................

তারাবীহ ৮ রাকাত, কোন ক্রমেই তা ২০ রাকাত নয়।

তারাবীহ ৮ রাকাত, কোন ক্রমেই তা ২০ রাকাত নয়।

রাত্রির বিশেষ নফল ছালাত তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ নামে পরিচিত।রামাযানে এশার পর প্রথম রাতে পড়লে তাকেতারাবীহ’ এবং রামাযান ও অন্যান্যসময়ে শেষরাতে পড়লে তাকে ‘তাহাজ্জুদ’ বলা হয়।

তারাবীহ : মূল ধাতু رَاحَةٌ (রা-হাতুন) অর্থ : প্রশান্তি। অন্যতম ধাতু رَوْحٌ(রাওহুন) অর্থ : সন্ধ্যারাতে কোন কাজ করা। সেখান থেকে ترويحة (তারবীহাতুন)অর্থ :সন্ধ্যারাতের প্রশান্তি বা প্রশান্তির বৈঠক; যা রামাযান মাসেতারাবীহর ছালাতে প্রতি চার রাক‘আত শেষে করা হয়ে থাকে। বহুবচনে (التراويح) ‘তারা-বীহ’ অর্থ :প্রশান্তির বৈঠকসমূহ(আল-মুনজিদ)

তাহাজ্জুদ :  মূল ধাতু هُجُوْدٌ (হুজূদুন) অর্থ : রাতে ঘুমানো বা ঘুম থেকে উঠা।সেখান থেকেتَهَجُّدٌ (তাহাজ্জুদুন) পারিভাষিক অর্থে রাত্রিতে ঘুম থেকেজেগে ওঠা বা রাত্রিজেগে ছালাত আদায় করা(আল-মুনজিদ)

উল্লেখ্য যে, তারাবীহ, তাহাজ্জুদ, ক্বিয়ামে রামাযান, ক্বিয়ামুললায়েল সবকিছুকে এক কথায়‘সালাতুল লাইল’ বা ‘রাত্রির নফল ছালাত’ বলা হয়।রামাযানে রাতেরপ্রথমাংশে যখন জামা‘আত সহ এই নফল ছালাতের প্রচলন হয়, তখন প্রতি চার রাক‘আতঅন্তর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া হ’ত। সেখান থেকে ‘তারাবীহ’ নামকরণ হয়(ফাৎহুল বারীআল-ক্বামূসুল মুহীত্ব)।এই নামকরণের মধ্যেই তাৎপর্য নিহিত রয়েছে যে, তারাবীহ প্রথম রাতে একাকী/জামা‘আত সহ এবং তাহাজ্জুদ শেষরাতেএকাকী পড়তে হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রামাযানের রাতে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদদুটিই পড়েছেন মর্মে ছহীহ বা যঈফ সনদে কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। মির‘আত ৪/৩১১ পৃঃ, ‘ছালাত’অধ্যায়-৪, ‘রামাযান মাসে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭

রাত্রির ছালাতের ফযীলত :  রাত্রির ছালাত বা ‘ছালাতুল লায়েল’ নফল হ’লেও তা খুবই ফযীলতপূর্ণ। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

‘ফরয ছালাতের পরে সর্বোত্তম ছালাত হ’ল রাত্রির (নফল) ছালাত’। মুসলিম, মিশকাত হা/২০৩৯ ‘ছওম’ অধ্যায়-৭, ‘নফল ছিয়াম’ অনুচ্ছেদ-৬

তিনি আরও বলেন,

‘আমাদের পালনকর্তা মহান আল্লাহ প্রতি রাতের তৃতীয় প্রহরে দুনিয়ারআসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, কে আছ আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়াদেব? কে আছ আমারকাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আছ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমিতাকে ক্ষমা করে দেব? এভাবে তিনি ফজর স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত আহবান করেন’।

মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২২৩, ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘রাত্রি জাগরণে উৎসাহ দান’ অনুচ্ছেদ-৩৩; মুসলিম হা/১৭৭৩

০১। তারাবীহর জামা‘আত :রাসূলুল্লাহ (সঃ) রমযান মাসের ২৩২৫ ও ২৭ তিন রাত্রি মসজিদেজামাআতের  সাথে তারাবীহরসালাত আদায় করেছেন। প্রথম দিন রাত্রির এক-তৃতীয়াংশপর্যন্ত, দ্বিতীয় দিন অর্ধ রাত্রি পর্যন্ত এবং তৃতীয় দিন নিজের স্ত্রী-পরিবার ওমুসল্লীদের নিয়ে সাহারীর আগ পর্যন্ত দীর্ঘ সালাত আদায় করেন।

আবুদাঊদ, তিরমিযী প্রভৃতি, মিশকাত হা/১২৯৮ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘রামাযান মাসে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭

পরের রাতে মুছল্লীগণ তাঁর কক্ষের কাছে গেলে তিনি বলেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছি যে, এটি তোমাদের উপর ফরয হয়ে যায়কি-না । আর যদি ফরয হয়ে যায়, তাহ’লে তোমরা তা আদায় করতে পারবে না’…। মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৯৫ ‘রামাযান মাসে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭

তারাবীহর ফযীলত :রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তিরামাযানের রাত্রিতে ঈমানের সাথেও ছওয়াবের আশায় রাত্রির ছালাত আদায় করে, তার বিগত সকল গোনাহ মাফকরা হয়’।মুসলিম,মিশকাত হা/১২৯৬ ‘রামাযান মাসে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭

০২। বন্ধ হবার পরে তারাবী পুনরায় চালু হওয়া

সম্ভবত: নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী খেলাফতের উপরে আপতিত যুদ্ধ-বিগ্রহ ওঅন্যান্য ব্যস্ততার কারণে ১ম খলীফা হযরত আবুবকর ছিদ্দীক্ব (রাঃ)-এরসংক্ষিপ্ত খেলাফতকালে (১১-১৩ হিঃ) তারাবীহর জামা‘আত পুনরায় চালু করা সম্ভবপর হয়নি। ২য়খলীফা হযরত ওমর ফারূক (রাঃ) স্বীয় যুগে (১৩-২৩ হিঃ) রাজনৈতিক স্থিতিশীলতারকারণে এবং বহুসংখ্যক মুছল্লীকে মসজিদে বিক্ষিপ্তভাবে উক্ত ছালাত আদায় করতে দেখেরাসূল (ছাঃ)-এর রেখে যাওয়া সুন্নাত অনুসরণ করে তাঁর খেলাফতের ২য় বর্ষে ১৪হিজরী সনে মসজিদেনববীতে ১১ রাকআতে তারাবীহর জামা‘আত পুনরায় চালু করেন। মির‘আত ২/২৩২ পৃঃ; ঐ, ৪/৩১৫-১৬ ও ৩২৬ পৃঃ

০৩। রাকআত সংখ্যা

সহীহ ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ(সঃ)  থেকে ৩ ধরনের সংখ্যা বর্ননা করা হয়েছে।

ক)  ১১ রাকাতঃ-  আয়িশাহ(রাঃ) থেকে বিভিন্ন সনদে ও ভংগিতে বর্নিত হয়েছে যে, নাবী(সঃ) রাত্রিকালে ইশার পরের ২ রাকাত ও ফাজরের পূর্বের ২ রাকাত সুন্নাত ছাড়া মোট ১১ রাকাত সলাত আদায় করতেন।এক বর্ননায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ(সঃ) রমাযান ও অন্যান্য মাসেও রাত্রে ১১ রাকাতের বেশী নফল আদায় করতেন না। বুখারী-১১৪৭,১১৩৯,৯৯৪,২০১৩  মুসলিম- সলাতুল্লাইল ওয়াল বিতর-৬/১৬, ১৭ ,২৭

বুখারী ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩য় খন্ড- হাদীস নং- ১৫৯২-১৫৯৭,  বুখারী আজিজুল হক- ১ম খন্ড-হাদিস নং-৬০৮,  বুখারী আধুনিক প্রকাশনী-১ম খন্ড-হাদিস-১০৭৬-দ্বিতীয় খন্ড-হাদীস-১৮৭০,  মিশকাত-নূর মোহাম্মাদ আযমী-৩য় খন্ড ও মাদ্রাসা পাঠ্য বই-২য় খন্ড হাদিস নং-১২২৮,  হাদিস শরীফ  মওলানা আবদুর রহীম-২য় খন্ড-৩৯০ পৃষ্টা,  বুখারী-১ম খন্ড-১৫৪-২৬৯ পৃষ্ঠা,  মুসলিম-২৫৪ পৃষ্ঠা,আবু দাউদ-১ম খন্ড-১৮৯ পৃষ্ঠা,নাসাঈ-১৪৮ পৃষ্ঠা,  তিরমিযী-৯৯ পৃষ্ঠা,  ইবনু মাজা-৯৭-৯৮ পৃষ্ঠা,  মুয়াত্তা মালিক-১৩৮ পৃষ্ঠা, সহীহ ইবনে খুজায়মা-৩য় খন্ড-৩৪১ পৃষ্ঠা,যাদুল মাআদ- ১ম খন্ড-১৯৫ পৃষ্ঠা, মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ,  মিশকাত হা/১১৮৮ ‘রাত্রির ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১,  বুখারী ১/১৫৪ পৃঃ, হা/১১৪৭;  মুসলিম ১/২৫৪ পৃঃ, হা/১৭২৩;  তিরমিযী হা/৪৩৯;   আবুদাঊদ হা/১৩৪১;   নাসাঈ হা/১৬৯৭;   মুওয়াত্ত্বা, পৃঃ ৭৪, হা/২৬৩;  আহমাদ হা/২৪৮০১;  ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/১১৬৬;   বুলূগুলমারাম হা/৩৬৭;   তুহফাতুল আহওয়াযী হা/৪৩৭;   বায়হাক্বী ২/৪৯৬ পৃঃ, হা/৪৩৯০;   ইরওয়াউল গালীল হা/৪৪৫-এর ভাষ্য, ২/১৯১-১৯২;   মির‘আতুল মাফাতীহ হা/১৩০৬-এর ভাষ্য, ৪/৩২০-২১

খ)   ১৩ রাকাতঃ-  ইবনু আব্বাস(রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাত্রিকালে রসুলুল্লাহ(সঃ) ১৩ রাকাত নফল সলাত আদায় করতেন। বুখারী-১১৩৮, তিরমিযী-(তুহফাসহ)-৪৪০

ইবনু আব্বাসের(রাঃ) হাদীসে ১১ রাকাতের চেয়ে ২ রাকাত বেশী পাওয়া যায়।বাড়তি এই ২ রাকাতের  ব্যাখ্যা বিভিন্ন ভাবে পাওয়া যায়।নাসাঈ গ্রন্থে ইবনু আব্বাসের(রাঃ) হাদীসের ১৩ রাকাতের বর্ননা এসেছে। ৮রাকাত রাতের সলাত , ৩ রাকাত বিতর ও ২ রাকাত ফজরের পূর্বের সুন্নাত। (নাসাঈ-৩/২৩৭,ফাতহুল বারী-২/৫৬২)। ফজরের ২ রাকাত সুন্নাত ধরে আয়েশাও(রাঃ) ১৩ রাকাতের কথা বর্ননা করেছেন। বুখারী-১১৪০, মুসলিম- সলাতুল লাইলি ওয়াল বিতর-৬/১৭-১৮ ,ফাতহুল বারী-২/৫৬২,  বুখারীতে আয়েশা(রাঃ)এর  কোন কোন বর্ননায় ১১ ও ২ রাকাতকে পৃথক করে দেখানো হয়েছে। বুখারী-৯৯৪,১১৪০

  যে সমস্ত বর্ননায় ১৩ রাকাতের বিস্তারিত বিবরন আসেনি, সেগুলো  এশার ২ রাকাত কিংবা ফজরের সুন্নাত উদ্দেশ্যে। ফাতহুল বারী-২/৫৬২ কোন কোন বর্ননায় এসেছে রাসুলুললাহ(সঃ) রাত্রের সলাত উদ্বোধন করতেন, হালকা ২ রাকাত সলাত আদায়ের মাধ্যমে।হতে পারে এই ২ রাকাত নিয়ে ১৩ রাকাত।কিন্তু এই ২ রাকাত সলাত বিভিন্ন হাদিসের মাধ্যমে এশার সলাত বলেই মনে হয়(‘সালাতুত তারাবী-আলবানী১৭ নং টীকা)।

গ)   ১৫ রাকাতঃ-  ঈশার পরের ও ফজরের পূর্বের ২ রাকাত সুন্নাত সলাতসহ আয়েশা ও ইবনু আব্বাস(রাঃ) উভয়েই ১৫ রাকাত বর্ননা করেছেন। সহীহ হাদিস সমূহের মাধ্যমে ও পূর্বাপর সকল মুহাদ্দিস ও ফকীহগনের মতে রাসুলুল্লাহ(সঃ) ১১ বা এশা/ফজরের সুন্নাত  মিলিয়ে ১৫ রাকাতের বেশী রাতের সলাত পড়েননি। রমজান সম্পর্কিত রিসালাহ – আকরামুজ্জামান বিন আবদুস সালাম

ঘ) সায়েব বিন ইয়াযীদ (রাঃ) বলেন,  ‘খলীফা ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হযরত উবাই ইবনু কা‘ব ও তামীমদারী (রাঃ)-কে রামাযানের রাত্রিতে ১১ রাক‘আত ছালাত জামা‘আত সহকারে আদায়েরনির্দেশ প্রদানকরেন। এই ছালাতফজরের প্রাক্কাল (সাহারীরপূর্ব) পর্যন্ত দীর্ঘ হ’ত’।

 মুওয়াত্ত্বা (মুলতান, পাকিস্তান: ১৪০৭/১৯৮৬) ৭১ পৃঃ, রামাযানে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ; মুওয়াত্ত্বা, মিশকাত হা/১৩০২ ‘রামাযান মাসেরাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭; মির‘আত হা/১৩১০, ৪/৩২৯-৩০, ৩১৫ পৃঃ;   বায়হাক্বী ২/৪৯৬, হা/৪৩৯২; ত্বাহাভী শরহ মা‘আনিল আছার হা/১৬১০

০৪। ৮ রাকাত  বনাম ২০ রাকাত তারাবী  

কেউ বলতে পারেন, যদি ১১ বা ১৩-এর অধিক রাকাত তারাবীহ পড়া সহীহ হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত না হয়, বরং সহীহ সাব্যস্ত হাদীসের বিপরীত হয়, তবে সউদী আরবে মক্কা-মদীনার মসজিদ দুটোতে কেন ২০ রাকাত পড়ানো হয় ? এটা সত্য কথা। তবে মক্কার মসজিদুল হারাম,মাসজিদে আয়েশাসহ ২/৩ টা মসজিদ ও মদীনার মসজিদে নব্বী,কুবা ও কিবলাতাইন এবং বিভিন্ন শহরে ২/১ টা মসজিদ করে মসজিদ ছাড়া সৌদী আরবের হাজার হাজার মসজিদে সহীহ হাদীস অনুযায়ী ১১ রাকাত পড়ানো হয়। ২০ রাকাত সহীহ হাদীসে না থাকলে, বাইতুল্লাহ /মসজিদে নব্বীতে কিভাবে পড়ানো হয় ?

  জবাব হল, ৮০১ হিজরী থেকে শুরু করে, ১৩৪৩ হিজরী পর্যন্ত মোট  ৫৪২ বছর ধরে মক্কার “মসজিদুল হারামে”  “১ সালাত ৪ জামাতে” আদায় করার  বিদ’য়াত যদি এতদিন চলতে পারে, তবে তারাবীর  ক্ষেত্রে সহীহ হাদিসের বিপরীত আমল চালু থাকা কোন ব্যাপার না। এখন থেকে  মাত্র ৭০ বছর আগে “৪ জামাত” উঠে গেছে, সহীহ হাদীস অনুযায়ী “১ জামাত”  আদায় করা হচ্ছে। তেমনি হঠাৎ হয়তো এমন একজন সংস্কারক আসবেন, যিনি  সঠিকটা চালু করবেন।কিন্তু  ৫৪২ বছরে কি বিশাল পরিমান মানুষ, এই বিদ’য়াতী আমল করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। কাজেই আমাদের সঠিক হাদীস অনুসরন করা উচিৎ, মক্কা-মদীনা নয়।

০৫। ২০ রাকাত কিভাবে চালু হোল ?

২০ রাকাত চালু হবার পিছে প্রধানতঃ ৩ টা কারন ছিলঃ-

ক)   দীর্ঘ কিয়ামে কষ্ট ও রাকাত বাড়ানো।

 বর্ধিত রাক‘আত সমূহ পরবর্তীকালে সৃষ্ট। ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ)বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাত্রির ছালাত ১১ বা ১৩ রাক‘আত আদায়করতেন। পরবর্তীকালে মদীনার লোকেরা দীর্ঘ ক্বিয়ামে দুর্বলতা বোধ করে। ফলেতারা রাকআত সংখ্যাবৃদ্ধি করতে থাকেযা ৩৯ রাকআত পর্যন্ত পৌঁছে যায় ইবনু তায়মিয়াহমাজমূ‘ ফাতাওয়া (মক্কা: আননাহযাতুল হাদীছাহ ১৪০৪/১৯৮৪),২৩/১১৩।

খ)  বেশী নেকীর আশায় ‘রাতের সালাত দুই দুই করে’ এই হাদীসের অন্য ব্যাখ্যা।

   অনেক  বিশেষজ্ঞ, ২৩ রাক‘আত পড়েন ও বলেন শত রাক‘আতের বেশীও পড়াযাবে,যদি কেউ ইচ্ছাকরে। দলীল হিসাবে ইবনু ওমর (রাঃ) বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদীছটি পেশ করেনযে, ‘রাত্রির সালাত দুই দুই (مَثْنَىمَثْنَى) করে। অতঃপর ফজর হয়ে যাবারআশংকা হ’লে একরাক‘আত পড়। তাতে পিছনের সব ছালাত বিতরে (বেজোড়ে) পরিণত হবে’।

এখানে,  ২ রাকাত করে মোট ৮ রাকাত পড়ার কথা বলা হয়েছে, মহানবী(সঃ) যতটুকু পড়েছেন। ২ রাকাত করে অসীম রাকাত নামাজ পড়ার কথা বলা হয়নি। আর পরবর্তীতে মদীনার মানুষই এটাকে  সবোর্চ্চ রাকাতে নিয়ে যায়। পরে বর্তমান রাজতন্ত্র  এটাকে  ২০ রাকাতে পরিনত করেন। কারন এটা হতে পারে,  ৩৯ কিংবা ৪১ রাকাত এমন ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল যে, সেখান থেকে ৮ রাকাতে প্রত্যাবর্তন হয়তো তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল।  তবে রাজতাতান্ত্রিক শাসক গোষ্ঠি যে এটা খারাপ উদ্দেশ্যে করেছে, এমন না(মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৫৪, ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫)।উপরের ব্যাখ্যা সঠিক হলে, রাকআতের কোনসংখ্যাসীমা নেই এবং যত রাকআত খুশী পড়া যাবে, এটা সঠিক না

গ)  ’২০ রাকাত তারাবী’  ও কিছু তথ্য ।

  সমস্ত তথ্য এক করার পর এটা বুঝা যায় যে, রাসুল(সঃ)  তারাবী প্রথম ওয়াক্তে আদায় করেছিলেন ও সেটা ছিল ৮ রাকাত । ২০ রাকাতের সমস্ত হাদীস অত্যন্ত দূর্বল।সেই বর্ননা মতে, তারপরও লোকেরা বাসায় ফিরে গিয়ে নিজে নিজে কিছু সালাত আদায় করতেন,তবে সেটা পরিমান বুঝার উপায় নাই।তার আগে, মসজিদে নিজে নিজে অথবা ছোট ছোট করে জামাতের মাধ্যমে তারাবী পড়ে নিতেন। হযরত উমর(রাঃ) ২০ রাকাত পড়ার প্রচলন করেন ও সবাই তার সাথে ঐক্যমত পোষন করেন।

  এটা হযরত ওমর(রাঃ),ওসমান(রাঃ) ও হযরত আলী(রাঃ) এই ৩ খলীফার সময় পর্য্যন্ত চলতে থাকে। এই কারনে ইমাম আবু হানিফা(রহ),ইমাম(শাফেয়ী), ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল(রহ) ২৯ রাকাত সমর্থন করেছিলেন।ইমাম মালিকের একটি রায় এর সপক্ষে রয়েছে।হযরত উমার ইবনে আব্দুল আজীজ(রহ) ২০ রাকাতের পরিবর্তে ৩৬ রাকাত পড়া শুরু করেছিলেন, যদিও সেটা,খলিফা ও সুন্নাহ অনুযায়ী সঠিক ছিল না। বরং তাদের উদ্দেশ্য ছিল, মক্কার বাহিরের লোকেরা যেন, মক্কার সমান  সওয়াবের অধিকারী হয়। মক্কার লোকদের নিয়ম ছিল, তারা তারাবীর ৪ রাকাতের পর, তারা কাবা ঘর তাওয়াফ করে নিত।এই দুজন বুজুর্গ তাওয়াফের পরিবর্তে, সালাত শুরু করে দিল।এই নিয়ম যেহেতু মদীনায় চালু ছিল,আর ইমাম মালেক(রাঃ) মক্কাবাসীদের কাজকে সনদ মনে করতেন, তাই তিনি ৩৬ রাকাতকে সমর্থন জানান।যেখানে তারাবী হয় না,সেই স্থানের মুসলিম জনপদ সবাই গুনাহগার হবে, কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন।   

ঘ)  হযরত উমার(রাঃ)এর সময়ে সাহাবাদের মধ্যে ২০ রাকাতের ইজমার প্রচার।

 ২০ রাক‘আত তারাবীহর উপরে ওমরেরযামানায় ছাহাবীগণের মধ্যে ‘ইজমা’ বা ঐক্যমত হয়েছে বলে যে দাবী করা হয়, তাএকেবারেই ভিত্তিহীন ও বাতিল কথা মাত্র।হযরত উমার(রাঃ)

৮ রাকাত ও জামায়াতে পড়া পুনরায় চালু করেছিলেন।  

তুহফাতুল আহওয়াযী হা/৮০৩-এর আলোচনা দ্রঃ ৩/৫৩১ পৃঃমিরআত ৪/৩৩৫

 

০৭। মাযহাবী ফিৎনা,মুসলিম ঐক্য ও মহান আল্লাহ।

   মাযহাব শব্দের অর্থ পথ।সুন্নাহ শব্দের অর্থও পথ। সুন্নাহর প্রতিশব্দ হচ্ছে মাযহাব। সমস্ত মাযহাবের পথ হচ্ছে  রাসুলের(সঃ) মাযহাব বা রাসুলের(সঃ) সুন্নাহ।মূলতঃ সঠিক সুন্নাত  অনুসরনের জন্যই  সম্মানিত সমস্ত ইমাম নিজের জীবন বাজী রেখে, হাদীস সংগ্রহ করেছিলেন। ফলে আমাদের জন্য সহীহ হাদীসের অনুসরন সহজ হয়েছে। তখন যোগাযোগ একটা বিশাল ব্যাপার ছিল।উনাদের সংগৃহীত হাদীসগুলো আমাদের জন্য মহামূল্যবান সম্পদ।এই ধরনের একটা বিরাট ও দুংসাহসিক কাজে,ভুল সাধারন ব্যাপার।কারন উনাদের জন্য পারস্পরিক যোগযোগ একটা কঠিন ব্যাপার ছিল।উল্লেখ্য যে, আবু হানীফা(রহঃ) ৮০ হিজরী, ইমাম মালেক(রহ) ৯৩/৯৪ হিজরী, ইমাম শাফেয়ী(রহঃ) ১৫০ হিজরী এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল(রহঃ) ১৬৪ হিজরীতে  জন্মগ্রহন করেন। ইমামদের জন্মের বহু আগেই রাসুল(সঃ) মৃত্যুবরন করেন।

   এখন তথ্য-প্রযুক্তির যুগ হবার ফলে আমরা সমস্ত হাদীস মিলায়ে দেখার ও কার কোথাও ভুল হাদীস এসেছে, এটা দেখার সুযোগ পাচ্ছি। আমাদের অবশ্যই সহীহ হাদীসকে অনুসরন করতে হবে, ভুল/দূর্বল হাদীসকে বাদ দিতে হবে। এটা না করলে ‘আমলে’ বিরাট পরিবর্তন আসবে ও দ্বীনে বিভেদ সৃষ্টি  হবে।

মূলতঃ  হানাফি,সুন্নী,আহলে হাদীস,শাফেয়ী,হাম্বলী,মালেকী,শিয়া, সালাফি,সালাফির বিভিন্ন দল ,আহলে সুন্নাত আল জামায়াত,ওহাবী প্রভৃতি ফিৎনাগুলো এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে।সহীহ হাদীস অনুসরন করা ছাড়া আমরা এই বিভেদ নিরসন কিংবা  মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে পারবো না।প্রতিটা দলই সঠিক পথে আছে বলে দাবী করছে। কিন্তু মহান আল্লাহ বলেন,

#  “ যারা দ্বীন সম্পর্কে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে,তাদের কোন দায়িত্ব তোমার নয়”। আনআম- ১৫৯ 

#  “যদি তোমাদের মধ্যে মতভেদ  থাকে, তাহলে আল্লাহ ও তার রাসুলের(সঃ) কাছে ফিরে যাও।যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের  উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক।“  নিসা-৫৯

#  “মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত হইও না।যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার শরিক বানিয়ে উপাসনা করে। আর তাদের মতো হইও না, যারা দ্বীনে মতভেদ সৃষ্টি করে, বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয় আর প্রত্যেক দল উল্লাস করে যে, তারা সত্যের পথে আছে।“ রোম-৩১,৩২

#  “ ইবরাহীম(আঃ) ইহুদী অথবা খৃষ্টান ছিলেন না, তিনি ছিলেন আত্নসমর্পনকারী মুসলিম।“ আল-ইমরান-৬৭

#  “তিনি তোমাদের জন্য যে, দ্বীন মনোনীত করেছেন, সে দ্বীন হচ্ছে ইবরাহীমের আর তিনি তোমাদের নাম দিয়েছেন মুসলিম,আগের সকল কিতাবে এবং এই কিতাবেও। সুতরাং নামায আদায় করো এবং যাকাত দাও।“ হজ্জ-৭৮

রাসুল(সঃ)  বলেনঃ-

#  “রিবঈ ইবনে হিরাস থেকে বর্নিত, তিনি আলীকে এক ভাষনে বলতে শুনেছেন,”রাসুলুল্লাহ(সঃ) বলেছেন,তোমরা আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ কোর না।কেননা যে ব্যাক্তি আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করবে, সে জাহান্নামে যাবে”। মুসলিম

#  “৭৩ টা দল হবে আর ১টা দল বাদে সবাই দোযখে যাবে।এবং নাযাতপ্রাপ্ত দলে তারাই থাকবে, যারা নবীজি এবং তার সাহাবাগনকে অনুসরন করবে।“

#  “তোমাদের মধ্যে কিছু লোক থাকবে, যারা এমন কিছু জিনিস প্রচার করবে,যেগুলো আমার সুন্নাহ নয়”।

#  “একটা সময় আসবে যখন সমাজে অনেক খারাপ কাজ হবে।আর কখনো কেউ যদি মুসলিম উম্মাহর একতা নষ্ট করতে চায়, তাকে তরবারী দিয়ে আঘাত কর।আর তাতেও যদি সে ক্ষান্ত না হয়, তাহলে তাকে মেরে ফেল”।  মুসলিম-৩য় খন্ড- ৪৫৬৫

সব মাযহাব বলেনঃ-

#  “সহীহ হাদীসই আমার মাযহাব।যদি তোমরা  সহীহ হাদীস পাও, তাহলে সেটাই আমার মাযহাব।যদি তোমরা একটা সহীহ হাদীসও পাও,তাহলে সেটাই আমার জীবন-দর্শন”।ইমাম আবু হানিফা(রহ) 

#  “যদি আমার কোন ফতওয়া আমার কোন একটা মতামত আল্লাহর কিতাবের বিরুদ্ধে যায় এবং রাসুল(সঃ)এর কথার বিরুদ্ধে যায়,তাহলে আমার সে মতামত বাতিল করে দাও”।ইমাম আবু হানিফা(রহ)

“আমিতো একজন মানুষ।আমার ভুল হতে পারে।তবে মাঝে মাঝে আমার কথা সঠিক। তবে আমার কোন মতামত যদি আল্লাহর কুরআন ও রাসুলের(সঃ) এর হাদীসের বিরুদ্ধে যায়, আমার ফতওয়া বাতিল করে দিও।  ইমাম মালিক(রহ)

০৬) ২০ রাকাত তারাবী ও জাল হাদীস প্রসংগে

#   ইবনে আব্বাস(রাঃ)  বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ(সঃ) রমাযান মাসে (জামায়াত ছাড়া) ২০ রাকাত তারবী পড়তেন।তারপর বিতর পড়তেন’।

এটা জাল হাদিস। হাদীসটি বর্নিত হয়েছে, ইবনে আবি শায়বা ‘মুসান্নাফ’ ২/৯০/২। আবদ বিন হামিদ মুনাতাখাব মিনাল মুসনাদ, তাবারানী ‘মু’জামুল কাবীর’ ৩/১৪৮/২ ও আওসাত ইবনে আলী ‘কামেল’ ১/২৩, খতীব  “মুওয়াজ্জেহ” গ্রন্থ ১/২১৯, বাইহাকী ও অন্যান্যরা । এদের প্রত্যেকেই আবী শায়বার সনদে এটা বর্ননা করেছেন।

ক)  ইমাম তাবারানী বলেন, ইবনে আব্বাস(রাঃ) হতে এই সনদ ব্যাতীত অন্য সনদে এটি বর্নিত হয়নি।

খ)  ইমাম বায়হাকী বলেন, এটি আবু শায়বার একক বর্ননা, আর সে হল যঈফ রাবী।

গ)  আল্লামা আলবানী(রহঃ) ও হাইসামী(রহঃ) বলেন, এখানে আবু শায়বা হল যয়ীফ।

ঘ)  হাফিজ(রহঃ) বলেন, ইবনে আবু শায়বার সম্পৃক্ততার কারনে সনদটি দূর্বল।

গ)  হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত হাদিস বিশেষজ্ঞ আল্লামা জালালুদ্দীন যায়লায়ী হানাফী(রহঃ)-ও এই সনদকে দূর্বল বলেছেন।তিনি হাদীসের  “মতন”কে অস্বীকার করে বলেন, এটি আয়েশা(রাঃ) বর্নিত “১১ রাকাত তারাবীর” বিশুদ্ধ হাদিসের বিপরীত।

ঘ)  অতঃপর দেখুন, নাসবুর রায়া ২/১৫৩, হাফিজ ইবনু হাজার(রহ)-ও একই কথা বলেছেন। ফকীহ আহমদ বিন হাজার(রহঃ) ‘ফাতাওয়া কুবরা’ গ্রন্থ বলেন,-নিশ্চয় ওটি চরম দূর্বল হাদিস।ইরোয়া গালীল-৪৪৫

ঙ)  ইমাম নাসাঈ(রহঃ) বলেন, সে পরিত্যক্ত। ইমাম শুবা(রহঃ) বলেন,  সে মিথ্যাবাদী।ইমাম দারেমী(রহঃ) বলেন, তার বর্নিত তথ্য দলিল হিসাবে গন্য নয়(মিযানুল ইতিদাল ১ম খন্ড)

চ)  আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী(রহঃ) বলেন, আমার দৃষ্টিতে ৩ টা কারনে হাদীসটা জালঃ-

১)  এটি “আয়েশা(রাঃ) ও জাবের(রাঃ)” বর্নিত হাদীসের বিপরীত।

২)  সনদে আবু শায়বার দূর্বলতা চরম।ইমাম বায়হাকীসহ অন্যদে উদ্ধৃতি থেকে সেটা বুঝা গেছে।ইবনে মাঈন বলেছেন, সে নির্ভরযোগ্য নয়। জাওযাযানী বলেছেন, সে বর্জিত।শুবা তাকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। ইমাম বুখারী বলেছেন, তার ব্যাপারে কেউ মত ব্যাক্ত করেনি। ইমাম বুখারী যখন কারো ব্যাপারে বলেন, তখন তার অবস্থান হয় নিকৃষ্টতর ও তার নিকট অধিকতর খারাপ। 

৩)  আবু শায়বার হাদীসে বলা হয়েছে যে, নবী(সঃ) রমাযানে জামায়াত ছাড়া নামায পড়েছেন।এটি জাবের(রাঃ) হাদীসের বিরোধী। তাছাড়া আয়েশার(রাঃ) নবী(সঃ)-এর পর পর ৩ দিন তারাবী জামাতে পড়ার কথা আছে। তারপরে জাবের(রাঃ)এর হাদিসঃ-

“ বরং আমি ভয় করেছিলাম, তোমাদের উপর ফরয হয়ে যাবার। ফলে তা পালনে তোমরা অপারগ হয়ে পড়বে(বুখারী,মুসলিম)। এগুলো প্রমান করে যে, আবু শায়বার হাদিস বানোয়াট। সিলসিলাতুল আহাদীসিয যঈফা আল মাওযু-৫৬০ 

ইয়াহহিয়া বিন সাঈদ হতে বর্নিত- ‘নিশ্চয় উমার(রাঃ) এক ব্যাক্তিকে তাদের সাথে ২০ রাকাত সালাত পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন”। 

হাদীসটা মুনকাতে। ইবনে আবি শায়বা-মুসান্নাফ ২য় খন্ড-১৬৩ পৃষ্ঠা-হাদীস-৭৬৮২ । এই বর্ননাটি মুনকাতি।

ক)  আল্লামা মুবারকপুরী ‘তুহফাতুল আহওয়াযী’  গ্রন্থ বলেছেন, আল্লামা নিমভী(রঃ) “আসার আস-সুনান” গ্রন্থ বলেছেন,ইয়াহহিয়া বিন সাঈদ আনসারী  হযরত উমার(রাঃ) এর সময় পান নাই।

খ)  আল্লামা নাসিরউদ্দিন আলবানী(রহ) বলেন, তার সিদ্ধান্ত নিমভী-এর অনুরুপ। এই আসারটি মুনকাতে, যেটা দলিল গন্য হবার জন্য শুদ্ধ নয়। তাছাড়া এটি হযরত উমার(রাঃ) হতে বিশুদ্ধ সনদে বর্নিত প্রতিষ্ঠিত হাদীসের বিপরীত।

হাদীসটি হলঃ

উমার(রাঃ) দুজন সাহাবী, ‘উবাই বিন কাব(রাঃ) ও তামীমদারীকে(রাঃ)কে (রমযান মাসে) ১১ রাকাত পড়ার  নির্দেশ প্রদান করেছিলেন’। মুয়াত্তা মালিক-২৫৩

হাদিসটি  ‘মুয়াত্তা মালিক গ্রন্থে বর্নিত হয়েছে।এমনি ভাবে ইয়াহহিয়া বিন সাঈদের হাদীস ভুল।

 গ)  তাছাড়া ইয়াহহিয়া বিন সাইদকে কেউ কেউ মিথ্যাবাদী বলেছেন। যেমন ইমামহাতিম(রহ) বলেন, ইয়াহহিয়া বিন সাইদ বর্নিত কোন কথাই সত্য নয়। কারন সে হোল মিথ্যাবাদী। জবহে আততাদীল ৯ম খন্ড,  তাহযীবুত তাহযীব- ৬ষ্ঠ কন্ড 

আবুল হাসান বলেন, আলী এক ব্যাক্তিকে ২০ রাকাত তারাবী পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন

এই হাদীসের সনদ যঈফ।মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা-২য় খন্ড-বাইহাকী-২/৪৯৬  ।

ক)  ইমাম বায়হাকী বলেন, এর সনদে দূর্বলতা রয়েছে।

খ)  নাসির উদ্দীন আলবানী(র) বলেন, এতে আবুল হাসানা ত্রুটিযুক্ত।তার সম্পর্কে ইমাম যাহাবী বলেছেন, সে কে, তা জানা যায় নি।

গ)  হাফিয(রঃ) বলেন, সে অজ্ঞাত।আবুল হাসানা কর্তৃক বর্নিত হাদীস প্রত্যাখ্যাত। মিযানুল ইতিদাল- ১ম খন্ড,  যঈফ সুনানুল কুবরা-২য় খন্ড, বায়হাকী 

আব্দুল আযীয বিন রাফে বলেন, উবাই ইবনে কাব(রাঃ) রমজানে মদীনায় লোকদের সাথে ২০ রাকাত নামায় পড়েছেন ও বিতর পড়েছেন ৩ রাকাত। 

হাদীসটি  মুনকাতে। মুসান্নাফ আবী শায়বা ২/৯০/১। এখানে আব্দুল আজীজ ও উবাই এর মধ্যে ‘ইনকিতা’ আছে। কেননা, উভয়ের মৃত্যুর ব্যবধান ১০০ বা তারও বেশী(তারাবুক তাহযীব)। এজন্যই আল্লামা নিমভী হিন্দী(রহঃ) বলেছেন, আব্দুল আজীজ বিন রাফে ইবাই ইবনে কাবের সময় পান নাই।আল্লামা আলবানী(র) বলেন , এখানে উবাই বিন ‘আসারটি’ মুনকাতে। সাথে সাথে এটি উমার(রাঃ) ও  উবাই(রাঃ) এর প্রমানিত ৮ রাকাত তারাবীর হাদীসের বিরোধী।

একই ভাবে আবু ইয়ালায় বর্নিত,উবাই বিন কাব(রাঃ), “রাসুলুল্লাহ(সঃ)এর নিকট এসে বললো, হে আল্লাহর রাসুল(সঃ) রমযানের রাত্রিতে একটা ব্যাপার ঘটে গেছে। রাসুলুল্লাহ(সঃ) বললেন, তা কি হে  উবাই(রাঃ) !সে বললো, আমার ঘরের নারীরা বলে যে,আমরা কুরআন পড়বো না, বরং আপনার সাথে নামায পড়বো। আমি তাদের নিয়ে ৮ রাকাত নামায পড়লাম ও বিতর পড়লাম”। 

নাসিরউদ্দিন আলবানী(র) ও  হাইসামী(রঃ) বলেন, এর সনদ হাসান।

সায়িদ বিন ইয়াযীদ বলেন, আমরা উমার ইবনুল খাত্তাব(রাঃ) এর সময়ে ২০ রাকাত তারাবী ও বিতর পড়লাম। নাসবুর রায়ালি আহাদীসে-২য় খন্ড-৯৯ পৃষ্ঠা

হাদীসটা যয়ীফ। হাদীসের সনদে আবু ওসমান বাসরী আছে, সে হাদীসের ক্ষেত্রে অস্বীকৃত।খালিদ বিন মুখাল্লাদ রয়েছে, সে যয়ীফ। তার বর্ননা প্রত্যাখ্যাত, তার বর্ননা দলিল হিসাবে গ্রহনযোগ্য না।তদুপরি সে ছিল শিয়া ও মিথ্যাবাদী তাহযীব ২য় খন্ড। ইয়াযীদ বিন খুসাইফা আছে, তার সকল বর্ননা প্রত্যাখ্যাত। মিযানুল ইতিদাল,তাহযীবুত তাহযীব-২য় খন্ড

 # ইয়াযীদ বিন রুমান বলেন, উমার(রাঃ)এর সময় লোকেরা(রমযানে) ২৩ রাকাত নামায পড়তো

এটির সনদ যয়ীফ।

ক)  মালিক ১/১৩৮,ফিরইয়াবী ৭৬/১, বাইহাকী তার ‘সুনান’ ২/৪৯৬ এবং ‘মারেফা’ গ্রন্থে হাদিসটাকে ‘যয়ীফ’ বলেছেন। কারন ইয়াজিদ বিন রুমান হযরত উমার(রাঃ) এর জমানা পান নাই।

খ)  ইমাম যায়লারী হানাফি(রহঃ)ও  ‘নাসবুর গ্রন্থে’২/১৫৪  একই কথা বলেছেন। 

গ)  ইমাম নব্বী(রঃ) এটাকে ‘মজমু’  গ্রন্থে যয়ীফ বলেছেন।তারপর বলেছেন, বাইহাকী এটা বর্ননা করেছেন, কিন্তু এটা ‘মুরসাল’। কারন ইয়াজিদ বিন রুমান উমার(রাঃ)এর সময়ে ছিলেন না। 

ঘ)  আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী(রঃ) তার ‘ইরওয়ালিল গালিল ও আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী(রঃ)  তার ‘উমদাতুল কারী শরহে সহীহ বুখারী’৫/৩০৭  গ্রন্থে এটিকে যঈফ বলেছেন।

০৭ তারাবীহর রাকাত সম্পর্কে মনীষীদের পর্যালোচনা

ক) শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী হানাফী বলেন, রাসুলুল্লাহ(সঃ)  থেকে ২০ রাকাতের প্রমান নাই। ২০ রাকাতের হাদিস দূর্বল সনদে বর্নিত হয়েছে। এই দূর্বলতার ব্যাপারে সমস্ত মুহাদ্দেস একমত।

খ) আল্লামা ইবনেল হুমাম(রহঃ)(হিদায়ার লেখক) বলেন, তাবারানী ও ইবনে আবী শায়বার হাদীস দূর্বল ও বুখারী/মুসলিমে বর্নিত বিশুদ্ধ হাদীসের বিরোধী।কাজেই এটা বর্জনীয়

গ) আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী(রহঃ)  বলেন, রাসুলুল্লাহ(সঃ) হতে কেবলমাত্র ৮ রাকাত তারাবীহ এর হাদীস সহীহ সনদে বর্নিত হয়েছে। ২০ রাকাতের হাদীস যঈফ।এই ব্যাপারে সবাই একমত। স্বীকার করা ছাড়া আমাদের উপায় নাই যে, রাসুলুল্লাহর(সঃ)  তারাবীহ ছিল ৮ রাকাত। আল উরফুশ শাযী- ৩০৯ পৃষ্ঠা

ঘ) মোল্লা আল কারী হানাফী(রহ)  বলেন, হানাফী শায়খদের কথার দ্বারা ২০ রাকাত বুঝা যায় বটে, কিন্তু দলীলানুযায়ী ৮ রাকাত সঠিকমিরকাত-১ম খন্ড

ঙ) আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী(রহ)  বলেন, ২০ রাকাতের হাদীস সহীহ হাদীসের বিরোধী হওয়ায়, তা বিনা দ্বিধায়  বর্জনীয়

চ) একই মন্তব্য করেছেন,  ইমাম নাসাঈ ‘যুআফা’ গ্রন্থে,আল্লামা আইনী হানাফী ‘উমদাতুল কারী’ গ্রন্থে, আল্লামা ইবনু আবেদীন ‘হাশিয়া দূররে মুখতার’ গ্রন্থ ও অন্যান্য বহু মনীষীগন

ছ) ইমাম মালিকসহ(রহঃ) ও ইবনুল আরাবীসহ অন্যরা এই সংখ্যাকে অপছন্দ করেছেন

ছ) বর্তমান-শ্রেষ্ঠ  নাসিরউদ্দিন আলবানী(রহঃ) তার লেখা “সালাতুত তারাবীহ” গ্রন্থ বলেন, রাসুল(সঃ) ১১ রাকাত আদায় করেছেন।২০ রাকাতের হাদীস দূর্বল। তাই ১১ রাকাতের বেশী পড়া 

জায়েজ নয়। কেননা বৃদ্ধি করাটাই রাসুলুল্লাহ(সঃ)এর কাজকে বাতিল ও কথাকে অসার করে দেয়

রাসুলুল্লাহ(সঃ)  বলেন, “তোমরা আমাকে যেরুপ সালাত আদায় করতে দেখেছ, ঠিক সেভাবেই সালাত আদায় কর”।

আর সেজন্যই ফজরে সুন্নাত ও অন্যান্য সালাত বাড়ানো বৈধ নয়।যখন কারো জন্য সুন্নাত স্পষ্ট হয় না এবং প্রবৃত্তির অনুসরনও করে না, ১১ রাকাতের বেশী তারাবীহ পড়ার কারনে তাদেরকে আমরা বিদয়াতীও বলি না এবং গোমরাহও বলি না”।

০৮। তিনি ছিলেন ‘সৃষ্টিজগতের প্রতি রহমত স্বরূপ’ (আম্বিয়া ২১/১০৭)এবং বেশী না পড়াটা ছিল উম্মতের প্রতি তাঁর অন্যতম রহমত।

 ০৯।  তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা সালাআদায় কর,যেভাবে আমাকে ছালাত আদায় করতে দেখছ’।বুখারী হা/৬৩১; ঐ, মিশকাত হা/৬৮৩ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘দেরীতে আযান’অনুচ্ছেদ-৬

এই কথার মধ্যে সালাতের ধরন ও রাক‘আত সংখ্যা সবইএসে যায়। তাঁর উপরোক্ত কথার ব্যাখ্যা হ’ল তাঁর কর্ম, অর্থাৎ ১১ রাক‘আতছালাত

১০। সমস্ত ইসলামী চিন্তাবিদগন এ বিষয়ে একমত যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ১১রাক‘আত পড়তেন এবং কখনো এর ঊর্ধ্বে পড়েননি এবং এটা পড়াই উত্তম, তখন তারা কেন১১ রাক‘আতেরউপর আমলের ব্যাপারে একমত হ’তে পারেন না? কেন তারা অসীম রাকাত পড়ার নিয়ম দেখায়ে  আবার ২৩ রাক‘আতে সীমাবদ্ধ থাকেন? এটা উম্মতকেসহীহ হাদীসেরভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া থেকে বিরত রাখছে ।

১১। জেনে রাখা ভাল যে, রাক‘আত গণনার চেয়ে ছালাতের খুশূ-খুযূ ও দীর্ঘ সময় ক্বিয়াম,কু‘ঊদ, রুকূ, সুজূদ অধিকযরূরী। যা আজকের মুসলিম সমাজে প্রায় লোপ পেতে বসেছে। ফলে রাত্রির নিভৃত ছালাতের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।

১২ রাসুল(সঃ)  ৮ রাকাত পড়েছিলেন, আমাদেরও  সেটা করা উচিৎ।তিনি যতটুকু সময় নিয়ে পড়তেন, নামাযের খুযু-খুশু(সময়নিষ্ঠা, বিনয়, একাগ্রতা ও তাকওয়া) বজায় রাখার জন্য আমাদেরও ধীরে সেদিকে যাওয়া উচিৎ।আমরা যদি মহানবী(সঃ)কে মডেল মানি তাহলে আমাদের উনাকে অনুসরন করা উচিৎ। তা নাহলে এটাকে বিদয়াতে পরিনত হবে আর সেটা সাজা আমাদের ভোগ করতে হবে, আপাত দৃষ্টিতে এটা যত সুন্দরই মনে হউক না কেন। তবে এগুলো হতে সময় লেগেছে, যেতেও কিছু সময় লাগবে।

# রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, “তোমরা সালাতআদায় কর, যেভাবে আমাকে ছালাত আদায় করতে দেখছ”।

#  বিদায় হজ্জের ভাষনে বলেন, “তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছিঃ- কুরআন ও হাদিস।

#  মহান আল্লাহ কুরআনে বলেন,  ‘তোমাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে, তোমরা আল্লাহ-রাসুলের কাছে ফিরে আস’। অর্থাৎ  কুরআন-হাদিসের কাছে আস।

.......................

মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে, ফরজ সালাতের পরে সম্মিলিত মুনাজাত

মসজিদের  ইমামের  নেতৃত্বে, ফরজ  সালাতের পরে সম্মিলিত  মুনাজাত

‘মুনাজাত’ অর্থ ‘পরস্পরে গোপনে কথা বলা’। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, إِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا صَلَّى يُنَاجِىْ رَبَّهُ ‘তোমাদের কেউ যখন সালাতে রত থাকে, তখন সে তার প্রভুর সাথে ‘মুনাজাত’ করে অর্থাৎ গোপনে কথা বলে’।

বুখারী (দিল্লী ছাপা) ১/৭৬ পৃঃ; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৭১০, ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘মসজিদ ও ছালাতের স্থানসমূহ’ অনুচ্ছেদ-৭ ; إِنَّ الْمُصَلِّى يُنَاجِى رَبَّهُ আহমাদ, মিশকাত হা/৮৫৬ ‘ছালাতে ক্বিরাআত’ অনুচ্ছেদ-১২

তাই সালাত কোন ধ্যান নয়, বরং আল্লাহর কাছে বান্দার সরাসরি ক্ষমা চাওয়া ও প্রার্থনা নিবেদনের নাম। দুনিয়ার কাউকে যা বলা যায় না, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে বান্দা তাই-ই বলে। আল্লাহ স্বীয় বান্দার চোখের ভাষা বুঝেন ও হৃদয়ের কান্না শোনেন।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক। আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’ (মুমিন/গাফির ৪০/৬০)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘দো‘আ হ’ল ইবাদত’।

আহমাদ, আবুদাঊদ প্রভৃতি, মিশকাত হা/২২৩০ ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়-৯, ২য় পরিচ্ছেদ

দো‘আ করার পদ্ধতি সুন্নাত অনুযায়ী হ’তে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কোন পদ্ধতিতে দো‘আ করেছেন, আমাদেরকে সেটা দেখতে হবে। তিনি যেভাবে প্রার্থনা করেছেন, আমাদেরকে সেভাবেই প্রার্থনা করতে হবে। তাঁর রেখে যাওয়া পদ্ধতি ছেড়ে অন্য পদ্ধতিতে দো‘আ করলে তা কবুল হওয়ার বদলে গোনাহ হওয়ারই সম্ভাবনা বেশী থাকবে।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সালাতের মধ্যেই দো‘আ করেছেন। তাকবীরে তাহরীমার পর থেকে সালাম ফিরানো পর্যন্ত সময়কাল হ’ল সালাতের সময়কাল।

আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৩১২ ‘ত্বাহারৎ’ অধ্যায়-৩, ‘যা ওযূ ওয়াজিব করে’ অনুচ্ছেদ-১, পরিচ্ছেদ-২

সালাতের এই নিরিবিলি সময়ে বান্দা স্বীয় প্রভুর সাথে ‘মুনাজাত’ করে। ‘ছানা’ হ’তে সালাম ফিরানোর আগ পর্যন্ত ছালাতের সর্বত্র কেবল দো‘আ আর দো‘আ। অর্থ বুঝে পড়লে উক্ত দো‘আগুলির বাইরে বান্দার আর তেমন কিছুই চাওয়ার থাকে না। তবুও সালাম ফিরানোর পরে একাকী দোআ করার প্রশস্ত সুযোগ রয়েছে। তখন ইচ্ছামত যেকোন ভাষায় যেকোন বৈধ দোআ করা যায়

যা-দুল মা‘আ-দ (বৈরূত : মুওয়াসসাসাতুর রিসালাহ, ২৯তম সংস্করণ ১৯৯৬), ১/২৫০

সালাতে দোআর স্থান সমূহ :

১) সানা বা দো‘আয়ে ইস্তেফতা-হ, যা আল্লা-হুম্মা বা-এদ বায়নী দিয়ে শুরু হয়

২) শ্রেষ্ঠ দো‘আ হ’ল সূরায়ে ফাতিহার মধ্যে আলহামদুলিল্লাহ ওইহ্দিনা সিরা-ত্বাল মুস্তাকীম

৩) রুকূতে সুবহা-নাকা আল্লা-হুম্মা…

৪) রুকূ হ’তে উঠার পর ক্বওমার দো‘আ রববানা ওয়া লাকাল হাম্দ হাম্দান কাছীরান’… বা অন্য দো‘আ সমূহ।

৫) সিজদাতেও সুবহা-নাকা আল্লা-হুম্মা’… বা অন্য দো‘আ সমূহ।

৬) দুই সিজদার মাঝে বসে আল্লা-হুম্মাগ্ফিরলী… বলে ৬টি বিষয়ের প্রার্থনা।

৭) শেষ বৈঠকে তাশাহ্হুদের পরে ও সালাম ফিরানোর পূর্বে দো‘আয়ে মাসুরাহ সহ বিভিন্ন দো‘আ পড়া। এ ছাড়াও রয়েছে

৮) ক্বওমাতে দাঁড়িয়ে দো‘আয়ে কুনূতের মাধ্যমে দীর্ঘ দো‘আ করার সুযোগ।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, সিজদার সময় বান্দা তার প্রভুর সর্বাধিক নিকটে পৌঁছে যায়। অতএব ঐ সময় তোমরা সাধ্যমত বেশী বেশী দো‘আ কর।

মুসলিম, মিশকাত হা/৮৯৪ ‘সিজদা ও তার ফযীলত’ অনুচ্ছেদ-১৪ ; নায়ল ৩/১০৯ পৃঃ

অন্য হাদীসে এসেছে যে, তিনি শেষ বৈঠকে তাশাহ্হুদ ও সালামের মধ্যবর্তী সময়ে বেশী বেশী দো‘আ করতেন।

মুসলিম, মিশকাত হা/৮১৩ ‘তাকবীরের পর যা পড়তে হয়’ অনুচ্ছেদ-১১

সালাম ফিরানোর পরে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার ‘মুনাজাত’ বা গোপন আলাপের সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়। অতএব সালাম ফিরানোর আগেই যাবতীয় দো‘আ শেষ করা উচিত, সালাম ফিরানোর পরে নয়। যদি কেউ মুছল্লীদের নিকটে কোন ব্যাপারে বিশেষভাবে দো‘আ চান, তবে তিনি আগেই সেটা নিজে অথবা ইমামের মাধ্যমে সকলকে অবহিত করবেন। যাতে মুছল্লীগণ নিজের দো‘আর নিয়তের মধ্যে তাকেও শামিল করতে পারেন।

ফরয ছালাত বাদে সম্মিলিত দো

ফরয সালাত শেষে সালাম ফিরানোর পরে ইমাম ও মুক্তাদী সম্মিলিতভাবে হাত উঠিয়ে ইমামের সরবে দো‘আ পাঠ ও মুক্তাদীদের সশব্দে ‘আমীন’ ‘আমীন’ বলার প্রচলিত প্রথাটি দ্বীনের মধ্যে একটি নতুন সৃষ্টি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম হ’তে এর পক্ষে ছহীহ বা যঈফ সনদে কোন দলীল নেই। বলা আবশ্যক যে, আজও মক্কা-মদীনার দুই হারাম-এর মসজিদে উক্ত প্রথার কোন অস্তিত্ব নেই।

প্রচলিত সম্মিলিত দোআর ক্ষতিকর দিক সমূহ

 ১) এটি সুন্নাত বিরোধী আমল। অতএব তা যত মিষ্ট ও সুন্দর মনে হৌক না কেন সূরায়ে কাহ্ফ-এর ১০৩-৪ নং আয়াতের মর্ম অনুযায়ী ঐ ব্যক্তির ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

২) এর ফলে মুসল্লী স্বীয় সালাতের চাইতে সালাতের বাইরের বিষয় অর্থাৎ প্রচলিত ‘মুনাজাত’কেই বেশী গুরুত্ব দেয়। আর এজন্যেই বর্তমানে মানুষ ফরয সালাতের চাইতে মুনাজাতকে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ‘আখেরী মুনাজাত’ নামক বিদ‘আতী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বেশী আগ্রহ বোধ করছে ও দলে দলে সেখানে ভিড় জমাচ্ছে।

৩) এর মন্দ পরিণতি হচ্ছে, একজন মুসল্লী সারা জীবন সালাত আদায় করেও কোন কিছুর অর্থ শিখে না। বরং সালাত শেষে ইমামের মুনাজাতের মুখাপেক্ষী থাকে।

৪) ইমাম আরবী মুনাজাতে কী বললেন সে কিছুই বুঝতে পারে না। ওদিকে নিজেও কিছু বলতে পারে না। সে সালাতের মধ্যে যে দো‘আগুলো পড়েছে, অর্থ না জানার কারণে সেখানেও তার আবেগ ছিল না। ফলে জীবনভর ঐ মুছল্লীর অবস্থা থাকে ‘না ঘরকা না ঘাটকা’।

৫) মুসল্লীর মনের কথা ইমাম ছাহেবের অজানা থাকার ফলে মুছল্লীর কেবল ‘আমীন’ বলাই সার হয়।

৬) ইমাম সাহেবের দীর্ঘক্ষণ ধরে আরবী-উর্দূ-বাংলায় বা অন্য ভাষায় করুণ সুরের মুনাজাতের মাধ্যমে শ্রোতা ও মুছল্লীদের মন জয় করা অন্যতম উদ্দেশ্য থাকতে পারে। ফলে ‘রিয়া’ ও ‘শ্রুতি’-র কবীরা গোনাহ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ‘রিয়া’-কে হাদীসে ‘ছোট শিরক’ বলা হয়েছে।

আহমাদ, মিশকাত হা/৫৩৩৪ ‘হৃদয় গলানো’ অধ্যায়-২৬, ‘লোক দেখানো ও শুনানো’ অনুচ্ছেদ-৫

যার ফলে ইমাম ছাহেবের সমস্ত নেকী বরবাদ হয়ে যাওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা সৃষ্টি হ’তে পারে।

সালাতে হাত তুলে সম্মিলিত দোআ :

(১) ‘ইস্তিসক্বা’ অর্থাৎ বৃষ্টি প্রার্থনার সালাতে ইমাম ও মুক্তাদী সম্মিলিতভাবে দু’হাত তুলে দো‘আ করবে। এতদ্ব্যতীত (২) ‘কুনূতে নাযেলাহ’ ও ‘কুনূতে বিতরে’ও করবে।

একাকী দুহাত তুলে দোআ :

সালাতের বাইরে যে কোন সময়ে বান্দা তার প্রভুর নিকটে যে কোন ভাষায় দো‘আ করবে। তবে হাদীসের দো‘আই উত্তম। বান্দা হাত তুলে একাকী নিরিবিলি কিছু প্রার্থনা করলে আল্লাহ তার হাত খালি ফিরিয়ে দিতে লজ্জা বোধ করেন।

আবুদাঊদ, মিশকাত হা/২২৪৪, ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়-৯

খোলা দু’হস্ততালু একত্রিত করে চেহারা বরাবর সামনে রেখে দো‘আ করবে।

আবুদাঊদ হা/১৪৮৬-৮৭৮৯; ঐ, মিশকাত হা/২২৫৬

দো‘আ শেষে মুখ মাসাহ করার হাদীছ যঈফ।

আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/২২৪৩, ৪৫, ২২৫৫ ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়-৯; আলবানী বলেন, দো‘আর পরে দু’হাত মুখে মোছা সম্পর্কে কোন ছহীহ হাদীছ নেই। মিশকাত, হাশিয়া ২/৬৯৬ পৃঃ; ইরওয়া হা/৪৩৩-৩৪, ২/১৭৮-৮২ পৃঃ

বরং উঠানো অবস্থায় দো‘আ শেষে হাত ছেড়ে দিবে।

(১) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় উম্মতের জন্য আল্লাহর নিকট হাত উঠিয়ে একাকী কেঁদে কেঁদে দো‘আ করেছেন।

মুসলিম হা/৪৯৯, ‘ঈমান’ অধ্যায়-১, ‘উম্মতের জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দো‘আ করা’ অনুচ্ছেদ-৮৭

(২) বদরের যুদ্ধের দিন তিনি ক্বিবলামুখী হয়ে আল্লাহর নিকটে একাকী হাত তুলে কাতর কণ্ঠে দো‘আ করেছিলেন।  মুসলিম হা/৪৫৮৮ ‘জিহাদ’ অধ্যায়-৩২, অনুচ্ছেদ-১৮, ‘বদরের যুদ্ধে ফেরেশতাগণের দ্বারা সাহায্য প্রদান

(৩) বনু জাযীমা গোত্রের কিছু লোক ভুলক্রমে নিহত হওয়ায় মর্মাহত হয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একাকী দু’বার হাত উঠিয়ে আল্লাহর নিকটে ক্ষমা চেয়েছিলেন।

 বুখারী, মিশকাত হা/৩৯৭৬ ‘জিহাদ’ অধ্যায়-১৯, অনুচ্ছেদ-৫; বুখারী হা/৪৩৩৯ ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়-৮০, ‘দো‘আয় হাত উঁচু করা’ অনুচ্ছেদ-২৩

(৪) আওত্বাস যুদ্ধে আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ)-এর নিহত ভাতিজা দলনেতা আবু ‘আমের আশ‘আরী (রাঃ)-এর জন্য ওযূ করে দু’হাত তুলে একাকী দো‘আ করেছিলেন।

 এটি ছিল ৮ম হিজরীতে সংঘটিত ‘হোনায়েন’ যুদ্ধের পরপরই। বুখারী হা/৪৩২৩, ‘যুদ্ধ-বিগ্রহ সমূহ’ অধ্যায়-৬৪, ‘আওত্বাস যুদ্ধ’ অনুচ্ছেদ-৫৬

(৫) তিনি দাওস কওমের হেদায়াতের জন্য ক্বিবলামুখী হয়ে একাকী দু’হাত তুলে দো‘আ করেছেন।

বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৬১১; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৫৯৯৬

(৬) হজ্জ ও ওমরাহ কালে সাঈ করার সময় ‘ছাফা’ পাহাড়ে উঠে কা‘বার দিকে মুখ ফিরিয়ে দু’হাত তুলে দো‘আ করা।

আবুদাঊদ হা/১৮৭২মুসলিম, মিশকাত হা/২৫৫৫

(৭) আরাফার ময়দানে একাকী দু’হাত তুলে দো‘আ করা।

 নাসাঈ হা/৩০১১

(৮) ১ম ও ২য় জামরায় কংকর নিক্ষেপের পর একটু দূরে সরে গিয়ে ক্বিবলামুখী হয়ে দু’হাত তুলে দো‘আ করা।

 বুখারী হা/১৭৫১-৫৩, ‘হজ্জ’ অধ্যায়-২৫, ‘জামরায় কংকর নিক্ষেপ ও হাত উঁচু করে দো‘আ’ অনুচ্ছেদ-১৩৯-৪২

(৯) মুসাফির অবস্থায় হাত তুলে দো‘আ করা।

মুসলিম, মিশকাত হা/২৭৬০

তাছাড়া জুম‘আ ও ঈদায়েনের খুৎবায় বা অন্যান্য সভা ও সম্মেলনে একজন দো‘আ করলে অন্যেরা (দু’হাত তোলা ছাড়াই) কেবল ‘আমীন’ বলবেন।

ছহীহ আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৪৬১; ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ৮/২৩০-৩১; ফাতাওয়া আরকানিল ইসলাম পৃঃ ৩৯২

এমনকি একজন দো‘আ করলে অন্যজন সেই সাথে ‘আমীন’ বলতে পারেন।

উল্লেখ্য যে, দো‘আর জন্য সর্বদা ওযূ করা, ক্বিবলামুখী হওয়া এবং দু’হাত তোলা শর্ত নয়। বরং বান্দা যে কোন সময় যে কোন অবস্থায় আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করবে। যেমন খানাপিনা, পেশাব-পায়খানা, বাড়ীতে ও সফরে সর্বদা বিভিন্ন দো‘আ করা হয়ে থাকে। আর আল্লাহ যে কোন সময় যে কোন অবস্থায় তাঁকে আহবান করার জন্য বান্দার প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।

বাক্বারাহ ২/১৮৬, মুমিন/গাফের ৪০/৬০; বুখারী ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়-৮০, অনুচ্ছেদ-২৪, ২৫ ও অন্যান্য