এসো হাদিস পড়ি ?

এসো হাদিস পড়ি ?

হাদিস অনলাইন ?

অমুসলিম বা মুসলিম ব্যক্তির কোন অপরাধ রাষ্ট্রীয় আদালত কর্তৃক প্রমাণিত হওয়ার পূর্বে কারো জন্য আইন হাতে তুলে নেওয়া জায়েয নয়। এরূপ করলে উক্ত ব্যক্তি কবীরা গুনাহগার হিসাবে গণ্য হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যাকারী ব্যক্তি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না (বুখারী হা/৩১৬৬, মিশকাত হা/৩৪৫২)। আর চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম হ’ল, যাদের সাথে মুসলমানদের জিযিয়া চুক্তি বা রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে সন্ধি অথবা কোন মুসলিমের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে (ফাৎহুলবারী ১২/২৫৯)। আল্লাহ বলেন, ‘যে কেউ জীবনের বদলে জীবন অথবা জনপদে অনর্থ সৃষ্টি করা ব্যতীত কাউকে হত্যা করে, সে যেন সকল মানুষকে হত্যা করে। আর যে ব্যক্তি কারু জীবন রক্ষা করে, সে যেন সকল মানুষের জীবন রক্ষা করে’ (মায়েদাহ ৫/৩২)।

প্রথমতঃ ইউসুফ (আঃ)-এর মাধ্যমে দেশের নেতার কাছে নিজের যোগ্যতা তুলে ধরে তা ব্যবহারের মাধ্যমে আসন্ন দুর্ভিক্ষ পীড়িত সাধারণ জনগণের স্বার্থ রক্ষার সুযোগ প্রার্থনা করেছিলেন মাত্র। যেমনটি এ যুগেও যেকোন কর্মের ক্ষেত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা তুলে ধরা হয়। ইবনু কাছীর বলেন, এর মধ্যে নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়ার দলীল রয়েছে ঐ ব্যক্তির জন্য, যিনি কোন বিষয়ে নিজেকে আমানতদার ও যোগ্য বলে নিশ্চিতভাবে মনে করেন’ (আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ১/১৯৬)। কুরতুবী বলেন, মিসরে ঐ সময় ইউসুফের চাইতে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় যোগ্য ও আমানতদার কেউ ছিল না বিধায় ইউসুফ উক্ত দায়িত্ব চেয়ে নিয়েছিলেন’ (কুরতুবী, ইউসুফ ৫৫ আয়াতের তাফসীর)। 

দ্বিতীয়তঃ উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য কেবল শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আনীত শরী‘আতই অনুসরণীয়। পূর্ববর্তী উম্মতগণের জন্য প্রবর্তিত কোন বিধান অনুসরণীয় নয় (মায়েদাহ ৫/৪৮; মুসলিম হা/১৫৩, মিশকাত হা/১০)। আর শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) নেতৃত্ব চেয়ে নিতে নিষেধ করেছেন (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৮০, ৩৬৮৩)। 

তৃতীয়তঃ গণতন্ত্রে কেবল নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়া হয় না বরং এখানে মানুষের মনগড়া আইন রচনার ও মানুষের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ভোট চাওয়া হয়। ইউসুফ (আঃ) দায়িত্ব চেয়ে নিয়ে নিজের মনগড়া আইন চালু করতে চাননি। বরং নবী হিসাবে তিনি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মিশরের ভঙ্গুর অর্থব্যবস্থা সুষ্ঠু ও সুন্দর করতে চেয়েছিলেন। সুতরাং এর সাথে প্রচলিত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের তুলনা করার কোন সুযোগ নেই (নবীদের কাহিনী ১/২০৭ পৃঃ)।

ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ দু’টি শর্ত প্রদান করেছেন। ঈমান ও আমলে ছালেহ। অর্থাৎ নির্ভেজাল তাওহীদ বিশ্বাস ও ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক সৎকর্ম। এক্ষণে মুসলিম-অমুসলিম সকল দেশের মুসলিম নাগরিকদের জন্য মৌলিক কর্তব্য হ’ল নবী-রাসূলগণের দেখানো পথে নিজেদের জীবনে বিশুদ্ধ ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা এবং নিরন্তর দাওয়াত ও সংগঠনের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরে আক্বীদা ও আমলের সংস্কার সাধনে চেষ্টিত হওয়া। এর মাধ্যমেই আল্লাহ চাইলে কাঙ্ক্ষিত খেলাফত কায়েম হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম সম্পাদন করে, তাদের প্রতি আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, তাদেরকে তিনি অবশ্যই পৃথিবীতে খেলাফত দান করবেন। যেমন তিনি পূর্ববর্তীদেরকে দান করেছিলেন (নূর ২৪/৫৫-৫৬)। এক্ষেত্রে যেমন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র প্রভৃতি শিরকী মতবাদ অনুসরণের কোন সুযোগ নেই, তেমনি চরমপন্থার অনুসরণে মানুষ হত্যায় লিপ্ত হওয়ারও কোন সুযোগ নেই।জানা আবশ্যক যে, নিজের জীবনে বিশুদ্ধ ইসলাম প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য যাবতীয় বৈধ প্রচেষ্টা চালানো প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্র কায়েম করাই ইসলাম এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জন করাই হ’ল ইক্বামতে দ্বীন বা দ্বীনের বিজয়, এটি হ’ল চরমপন্থী খারেজীদের আক্বীদা। ইসলামের মৌলিক আক্বীদা-বিশ্বাসের সাথে এর দূরতম কোন সম্পর্ক নেই। কেননা ইক্বামতে দ্বীন অর্থ ইক্বামতে হুকূমত নয়। বরং ইক্বামতে তাওহীদ। যা প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ নূহ (আঃ) থেকে মুহাম্মাদ (ছাঃ) পর্যন্ত সকল নবীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন’ (শূরা ৪২/১৩; বিস্তারিত দ্রঃ ‘ইক্বামতে দ্বীন পথ ও পদ্ধতি’ বই)।

এক্ষেত্রে কর্তব্য হ’ল (১) উত্তম পন্থায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করা (মুসলিম হা/৪৯, মিশকাত হা/৫১৩৭)। (২) দেশে ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য জনমত গঠন করা এবং বৈধপন্থায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো (রা‘দ ১৩/১১)। (৩) বিভিন্ন উপায়ে সরকারকে নছীহত করা (মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৬৬)। (৪) সরকারের হেদায়াতের জন্য দো‘আ করা (বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৫৯৯৬)। (৫) সরকারের বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকটে কুনূতে নাযেলাহ পাঠ করা (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৮৯)। (৬) প্রয়োজনে হিজরত করা। যেমন রাসূল (ছাঃ) দাওয়াতের প্রথম দিকে যখন মক্কার মুসলিমদের উপর কাফেররা চরম নির্যাতন করছিল, তখন তিনি তাদেরকে পার্শ্ববর্তী ন্যায়নিষ্ঠ খ্রিষ্টান রাজা নাজাশীর হাবশা রাজ্যে তাদেরকে হিজরত করার নির্দেশ দেন (বায়হাক্বী, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩১৯০)। (৭) আর মুসলিম সরকারের সুস্পষ্ট কুফরী প্রমাণিত হ’লে, শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা কল্যাণকর হবে কি-না, সে বিষয়ে অবশ্যই দেশের নির্ভরযোগ্য বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম পরামর্শ করে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন এবং মুসলিম নাগরিকগণ তাদের অনুসরণ করবেন। বিদ্রোহ করায় কল্যাণের চেয়ে যদি অকল্যাণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে, তাহ’লে বিদ্রোহ করা যাবে না। বরং ধৈর্যধারণ করতে হবে, যতক্ষণ না আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন ফায়ছালা নাযিল হয় (বাক্বারাহ ১০৯, তওবা ২৪)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, শাসকের নিকট থেকে কেউ অপসন্দনীয় কিছু দেখলে যেন সে ধৈর্যধারণ করে (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৬৭)। তিনি বলেন, এমতাবস্থায় তাদের হক তাদের দাও এবং তোমাদের হক আল্লাহর কাছে চাও’ (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৭২)।‘কেননা তাদের পাপ তাদের উপর এবং তোমাদের পাপ তোমাদের উপর বর্তাবে’(মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৭৩)। তিনি বলেন, তোমরা তাদের হক দিয়ে দাও। কেননা আল্লাহ শাসকদেরকেই জিজ্ঞেস করবেন তাদের শাসন সম্পর্কে (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৭৫)।

সঊদী রাজতন্ত্র শরী‘আতসম্মত। ইসলামে রাজতন্ত্র আদৌ নিষিদ্ধ নয়, যদি না তা কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সঊদী রাজতন্ত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করা হয় এবং তা কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। যেমন সঊদী সংবিধানের ৭নং ধারায় বলা হয়েছে, يسةمد الحكم في المملكة العربية السعودية سلطةه من كةاب الله ةعالى وسنة رسوله. وهما الحاكمان على هذا النظام وجميع أنظمة الدولة (সঊদী রাজতন্ত্রের সর্বত্র আল্লাহর কিতাব ও তার রাসূলের সুন্নাহর কর্তৃত্ব জারী থাকবে)। ৮নং ধারায় বলা হয়েছে, يقوم الحكم في المملكة العربية السعودية على أساس العدل والشورى والمساواة وفق الشريعة الإسلامية (সঊদী রাজতন্ত্রের বিধানসমূহ প্রতিষ্ঠিত হবে ইসলামী শরী‘আতের অনুকূলে ন্যায়পরায়ণতা, পরামর্শ ও সমতাবিধানের ভিত্তির উপরে)। 

অতএব শাসক যদি আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করেন এবং ইসলামী শরী‘আত অনুযায়ী রাজ্যশাসন করেন, তাহ’লে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তার অনুকূলে। উক্ত নীতির অনুসরণে কোন শাসক যদি পরবর্তী শাসক হিসাবে তার পরিবার থেকে যোগ্য কাউকে বা অন্য কারু ব্যাপারে অছিয়ত করে যান, তাতে কোন বাঁধা নেই। যেমন আবুবকর (রাঃ) মৃত্যুকালীন সময়ে বিশিষ্ট ছাহাবীগণের সাথে পরামর্শক্রমে পরবর্তী খলীফা হিসাবে ওমর (রাঃ)-কে নির্বাচন করেন (তারীখে ত্বাবারী ২/৩৫২-৩৫৩; ইবনু সা‘দ, তাবাক্বাতুল কুবরা ৩/১৯৯-২০০)। শাসক পরিবার থেকে কেউ পরবর্তী শাসক হ’তে পারবে না, এরূপ কোন নিষেধাজ্ঞা শরী‘আতে নেই। এক্ষণে শাসক যদি অযোগ্য কারো ব্যাপারে অছিয়ত করে থাকেন, তার জন্য তিনিই দায়ী হবেন। কেননা অযোগ্য লোককে ক্ষমতাসীন করাকে রাসূল (ছাঃ) ক্বিয়ামতের আলামত হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন (বুখারী হা/৫৯, মিশকাত হা/৫৪৩৯)। অতএব মৌলিকভাবে সঊদী রাজতন্ত্র শরী‘আতবিরোধী গণ্য করার কোন সুযোগ নেই। 

পক্ষান্তরে পশ্চিমা গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিই হ’ল ধর্মনিরপেক্ষতা। যেখানে মানুষ হ’ল সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। আর আইন রচনার ভিত্তি হ’ল, মানুষের মনগড়া সিদ্ধান্ত। এভাবে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ প্রথমে মুসলমানকে ঈমানের গন্ডীমুক্ত করে। অতঃপর গণতন্ত্র তাকে মানুষের গোলাম বানায়। অতঃপর সে আল্লাহর সন্তুষ্টি বাদ দিয়ে ভোটারের মনস্ত্তষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়। যা তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ব্যতীত কারু বিধান দেবার ক্ষমতা নেই’ (ইউসুফ ১২/৪০)। তিনি বলেন, যদি তুমি জনপদের অধিকাংশ লোকের কথা মেনে চল, তাহ’লে ওরা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। তারা তো কেবল ধারণার অনুসরণ করে এবং তারা তো কেবল অনুমান ভিত্তিক কথা বলে’ (আন‘আম ৬/১১৬)। 

একইভাবে গণতন্ত্র সমাজের প্রত্যেককে ক্ষমতালোভী করে তোলে। অথচ ক্ষমতা চেয়ে নেওয়া শরী‘আতে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৮০, ৩৬৮৩)।

কারো ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে গাছ লাগানো তার উপর যুলুমের শামিল। রাসূল (ছাঃ) যুলুম থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫১২৩ ‘অত্যাচার’ অনুচ্ছেদ)। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘কোন ব্যক্তি যদি তার কোন মুসলিম ভাইয়ের প্রতি তার সম্মান কিংবা অন্য কোন বিষয়ে যুলুম করে, তবে সে যেন ঐ দিন আসার পূর্বেই যেন তার নিকট হ’তে উহা মাফ করে নেয়, যেদিন তার নিকট দিরহাম ও দীনার কিছুই থাকবে না (অর্থাৎ মৃত্যু বা ক্বিয়ামতের দিনের পূর্বে)। কেননা ক্বিয়ামতের দিন যদি তার নিকট নেক আমল থাকে, তবে তার যুলুম পরিমাণ নেকী নেওয়া হবে। আর যদি তার কাছে নেকী না থাকে, তবে মাযলূম ব্যক্তির গুনাহ তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে’ (বুখারী, মিশকাত হা/৪৮৯৯)।

প্রচলিত গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণের কোন সুযোগ নেই। প্রথমতঃ গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অথচ ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ একটি নিরেট কুফরী মতবাদ। ইসলামের সাথে এর আপোষের কোন সুযোগ নেই। দ্বিতীয়তঃ গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি হ’ল- ‘জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস’, আইন রচনার ক্ষেত্রে ‘দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ই চূড়ান্ত’। অর্থাৎ গণতন্ত্রে মানুষকে মানুষের মনগড়া বিধান মানতে বাধ্য করে। পক্ষান্তরে ইসলামী শরী‘আতের মৌল নীতি হ’ল ‘আল্লাহ্ই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস’ এবং ‘অহি’-র বিধানই চূড়ান্ত’। এখানে মানুষ স্রেফ আল্লাহর বিধান মানে। যার অধীনে সকল মানুষের অধিকার সমান। বস্ত্ততঃ ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ প্রথমে মুসলমানকে ঈমানের গন্ডীমুক্ত করে। অতঃপর গণতন্ত্র তাকে মানুষের গোলাম বানায়। অতঃপর সে আল্লাহর সন্তুষ্টি বাদ দিয়ে ভোটারের মনস্ত্তষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়। যা তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। 

তৃতীয়তঃ প্রচলিত রাজনীতির সাথে আপোষ করাকে ‘হোদায়বিয়ার সন্ধি’-র সময় ‘রাসূলুল্লাহ’ শব্দ বাদ দেওয়ার সাথে তুলনা করা নিতান্তই হাস্যকর ব্যাপার। কেননা তাঁকে আল্লাহর রাসূল হিসাবে না মানার কারণেই কুরায়েশদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিল। তারা এটা মানলে তো আপোষ হয়ে যেত। সন্ধির কোন প্রয়োজন হ’ত না। সেকারণ তিনি ‘রাসূলুল্লাহ’ কেটে ‘মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ’ লিখেছিলেন। এটা লেখাতে তিনি কোন তাগূতী বিধানের সাথে আপোষ করেননি বা নবুঅতের দাবী থেকে সরে আসেননি। অতএব বর্তমানের কুফরী রাজনীতির সাথে আপোষ করার জন্য উক্ত ঘটনাকে প্রমাণ হিসাবে পেশ করা স্রেফ খোঁড়া অজুহাত মাত্র। 

বলা বাহুল্য, প্রচলিত রাজনীতির সঙ্গে আপোষ নয়; বরং জনমত পরিবর্তনের মাধ্যমে একে পরিবর্তন করাই হ’ল প্রকৃত অর্থে ইসলামী রাজনীতি (বিঃদ্রঃ ‘ইসলামী খেলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন’, ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন কি ও কেন?’ এবং ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ বই)।

রাসূল (ছাঃ) বলেন, ইহূদী হৌক, নাছারা হৌক যে ব্যক্তি ইসলাম কবুল না করে মৃত্যুবরণ করে, সে ব্যক্তি জাহান্নামবাসী হবে’ (মুসলিম হা/১৫৩; মিশকাত হা/১০)। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে কটূক্তিকারী ব্যক্তি তওবা না করলে সে অবশ্যই ধর্মত্যাগী ও কাফের (তাওবাহ ৬৫-৬৬)। ছাহাবীগণসহ সর্বযুগের বিদ্বানগণ এ বিষয়ে একমত যে ঐ ব্যক্তি কাফের ও মুরতাদ এবং তাকে হত্যা করা ওয়াজিব (ইবনু তায়মিয়াহ, আছ-ছারেমুল মাসলূল ২/১৩-১৬)। তবে তা আদালতের মাধ্যমে প্রমাণ সাপেক্ষে বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব সরকারের। যেমন ইহূদী নেতা কা‘ব বিন আশরাফ রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামকে কটূক্তি করে ব্যঙ্গ কবিতা লিখলেও রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ পাওয়ার আগ পর্যন্ত ছাহাবীগণ তাকে হত্যা করেননি (বুখারী হা/৪০৩৭)। এছাড়া মু‘আয বিন জাবাল (রাঃ) ইয়ামনে জনৈক মুরতাদকে সেখানকার গভর্ণরের অনুমতি ক্রমেই হত্যা করেছিলেন (আবুদাঊদ হা/৪৩৫৪)। প্রত্যেকেই যদি দন্ড বাস্তবায়ন শুরু করে, তাহ’লে সমাজে চরম বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে। সেকারণ দন্ড বাস্তবায়নের সাথে সংশ্লিষ্ট আদালত ও সরকার এ দায়িত্ব পালন করবেন। না করলে তারা কবীরা গোনাহগার হবেন এবং আল্লাহর নিকট কৈফিয়তের সম্মুখীন হবেন (উছায়মীন, শারহুল মুমতে‘ ১৪/৪৪১-৪২)।

এগুলি বাজে কথার অন্তর্ভুক্ত। যা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। আল্লাহ বলেন, সফলকাম মুমিন তারাই, যারা ছালাতে খুশূ-খুযূ অবলম্বন করে’ ‘এবং যারা অনর্থক কাজ এড়িয়ে চলে’ (মুমিনূন ২৩/১-৩)। উল্লেখ্য, স্ত্রীর পক্ষ থেকে যিহার হয় না (ফাতাওয়া মারআতুল মুসলিমাহ ২/৮০৩ পৃঃ; উছায়মীন, ফাতাওয়া নুরুন আলাদ দারব-১৯)।

এক্ষেত্রে উক্ত নারী অত্যাচারিতা ও নিরপরাধ হিসাবে গণ্য হবে। ওয়ায়েল ইবনু হুজর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যুগে জনৈকা মহিলা মসজিদে ছালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে বের হন। একজন লোক তাকে একা পেয়ে কাপড়ে ঢেকে নেয় এবং তাকে ধর্ষণ করে। মহিলা চিৎকার শুরু করলে লোকটি চলে যায়। সেখান দিয়ে মুহাজিরদের একদল লোক যাচ্ছিলেন। মহিলাটি তাদেরকে বললেন যে, ঐ লোক আমার সাথে এরূপ আচরণ করেছে। তখন লোকেরা তাকে ধরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে নিয়ে আসলে তিনি মহিলাকে বললেন, তুমি চলে যাও। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। অতঃপর তিনি ঐ ধর্ষণকারী পুরুষকে রজম করার আদেশ দিলেন (আবুদাঊদ হা/৪৩৭৯; তিরমিযী হা/১৪৫৪, মিশকাত হা/৩৫৭২, হাদীছটি হাসান, ‘হুদূদ’ অধ্যায়)।

‘উলুল আমর’ অর্থ শাসন ও কর্তৃত্বের অধিকারী। হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, ‘উলুল আমর’ যেকোন শাসক ও আলেম হতে পারেন; যখন তাঁরা আল্ল¬াহকে মানার নির্দেশ দেন এবং তাঁর অবাধ্যতায় নিষেধ করেন’ (তাফসীর ইবনে কাছীর, সূরা নিসা ৫৯ আয়াতের ব্যাখ্যা)। 

আল্ল¬ামা নাসাফী (রহঃ) বলেন, ‘উলুল আমর’ হলেন রাষ্ট্রনায়ক কিংবা আলেমগণ। কিন্তু তাঁরা যদি সত্যের বিরোধিতা করেন তাহলে তাঁদের কথা মানা যাবে না। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لا طَاعَةَ لِمَخْلُوْقٍ فِيْ مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ অর্থাৎ ‘সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতায় সৃষ্টির প্রতি কোন আনুগত্য নেই’ (তাফসীরে নাসাফী, ১/১৮০ পৃঃ; মিশকাত হা/৩৬৯৬; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৫২০)। 

নওয়াব ছিদ্দীক হাসান খান ভূপালী (রহঃ) বলেন, তাক্বলীদ পন্থীরা বলে যে, ‘উলুল আমর’ হলেন আলেমগণ। অথচ মুফাসসিরগণ বলেছেন, ‘উলুল আমর’ প্রথমতঃ শাসকগণ অতঃপর আলেমগণ। এঁদের কারো কথা গ্রহণ করা যাবে না যতক্ষণ না তাঁরা আল্ল¬াহর রাসূলের সুন্নাত অনুযায়ী চলার নির্দেশ দেন। যদি এটা মেনে নেওয়া হয় যে, কিছু আলেম এমনও আছেন, যারা লোকদেরকে তাঁদের কথা বিনা দলীলে মেনে নিতে বলেন, তাহলে তাঁরা লোকদেরকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে পথ দেখাবেন। এমতাবস্থায় তাদের কথা গ্রহণ করা যাবে না’ (তাফসীরে রূহুল বায়ান, ১/২৬৩-২৬৪ পৃঃ)। 

আল্লাহ রাববুল আলামীন প্রত্যেক সৃষ্টির মাঝেই সমাজবদ্ধ জীবনের সহজাত প্রবণতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আর পবিত্র কুরআনে তিনি মুসলিম উম্মাহকে হাবলুল্লাহর মূলে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন (আলে ইমরান ৩/১০৩)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমাদের উপর জামা‘আতবদ্ধ থাকা ফরয করা হ’ল এবং বিচ্ছিন্ন থাকা নিষিদ্ধ করা হ’ল। কেননা শয়তান একক ব্যক্তির সাঙ্গে থাকে এবং সে দু’জন থেকে দূরে থাকে। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যস্থলে থাকতে চায়, সে যেন জামা‘আতবদ্ধ জীবনকে অপরিহার্য করে নেয়’ (তিরমিযী হা/২১৬৫)। তিনি বলেন, ‘জামা‘আতের উপর আল্লাহর হাত থাকে’ (তিরমিযী হা/২১৬৬; মিশকাত হা/১৭৩)। 

ইসলামী নেতৃত্ব গড়ে উঠবে কেবল বিশুদ্ধ আক্বীদা ও আমলের ভিত্তিতে। যেখানে যোগ্য ব্যক্তিদের পরামর্শের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন হবে, যেভাবে খুলাফায়ে রাশেদীন নির্বাচিত হয়েছিলেন (মুসলিম হা/৪৮১৮)। এভাবে যুগ যুগ ধরে আমীরের আনুগত্য অব্যাহত রয়েছে। ইসলামী খেলাফত না থাকলেও কোন যুগে আমীরের আনুগত্য স্থগিত হয়নি এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত তা স্থগিত হবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত আমীর কুরআন ও ছহীহ হাদীছের উপর নিজে অটল থাকবেন এবং তাঁর কর্মীদের সেভাবে নির্দেশ দিবেন।

যদি বিচারক হিসাবে হককে হক হিসেবে আর বাতিলকে বাতিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার, হককে তার প্রাপকের নিকটে পৌঁছে দেয়ার এবং মযলূমকে সাহায্য করার সুযোগ থাকে এবং তা বাস্তবায়ন করা যায় তাহ’লে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে শরী‘আতে বাধা নেই। কারণ তা নেকী এবং তাক্বওয়ার কাজে পরস্পরকে সাহায্য করার শামিল হিসেবে গণ্য হবে (মায়েদাহ ২)। আর যদি এরূপ সুযোগ না থাকে তাহলে বৈধ নয়। কেননা তাতে বিচারককে উক্ত গোনাহের ভাগিদার হতে হবে। 

বর্তমানে যারা এ পেশায় নিয়োজিত আছেন, তারা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক আইনগুলি বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত থাকবেন। সম্ভব না হলে উক্ত চাকুরী পরিত্যাগ করবেন।

পদ্ধতিগত সামান্য পার্থক্য থাকলেও প্রত্যেকেই উম্মতের শ্রেষ্ঠ মানুষদের মাধ্যমেই নির্বাচিত হয়েছিলেন। যার সার-সংক্ষেপ নিম্নে বর্ণিত হ’ল।- 

১ম খলীফা হযরত আবুবকর (রাঃ) : রাসূলে করীম (ছাঃ) স্বীয় অনুপস্থিতিতে আবুবকর (রাঃ)-কে দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন (বুখারী হা/৭১৩, মুসলিম হা/৪১৮; মিশকাত হা/১১৪০)। পরবর্তীতে সাকীফা বনু সা‘এদায় মিলিত হয়ে আলোচনার একপর্যায়ে হযরত আবুবকর (রাঃ)-এর হাতে ওমর (রাঃ)-এর বায়‘আত গ্রহণের মাধ্যমে তা কার্যকর হয়। অতঃপর সকলে তাঁকে খলীফা হিসাবে মেনে নেন(বুখারী হা/৬৮৩০; আল-আহকাম, পৃঃ ৭; ইবনু জারীর তাবারী, তারীখুর রুসুল ওয়াল মুলূক ৩/২৪১-২৪৩)। 

২য় খলীফা ওমর (রাঃ) : বিদায়ী খলীফা আবুবকর (রাঃ) মৃত্যুকালীন সময়ে বিশিষ্ট ছাহাবীগণের সাথে পরামর্শক্রমে পরবর্তী খলীফা হিসাবে তাঁকে নির্বাচন করেন। অতঃপর বিষয়টি উপস্থিত ছাহাবায়ে কেরামের নিকটে তিনি পেশ করলে সকলে তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন (তারীখে ত্বাবারী ২/৩৫২, ৩৫৩; ইবনু সা‘দ, তাবাক্বাতুল কুবরা ৩/১৯৯-২০০)। 

৩য় খলীফা ওছমান (রাঃ) : ওমর (রাঃ) শাহাদাত বরণকালে ছয়জনকে নিয়ে একটি ‘শূরা’ গঠন করে দেন, যাদের প্রত্যেকেই দুনিয়াতে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ছিলেন। তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে ওছমান (রাঃ)-কে পরবর্তী খলীফা হিসাবে নির্বাচন করেন(বুখারী হা/৩৭০০; আল-বিদায়াহ ৭/১৫২)। 

৪র্থ খলীফা আলী (রাঃ) : ওছমান (রাঃ)-এর শাহাদাত বরণের পর হযরত আলী (রাঃ)-কে খেলাফত গ্রহণের অনুরোধ করা হ’লে তিনি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘এটা তোমাদের এখতিয়ার নয়। বরং এটি বদরী ছাহাবা ও শূরা সদস্যদের দায়িত্ব। তাঁরা একত্রে বসে যাকে মনোনীত করবেন, তিনিই খলীফা হবেন’ (আশ-শূরা পৃঃ ১০৩)। পরবর্তীতে মুহাজির ও আনছার ছাহাবীগণের অনুরোধ মসজিদে নববীতে তিনি বায়‘আত গ্রহণ করেন। রাসূল (ছাঃ)-এর চাচা আববাস (রাঃ) সর্বপ্রথম তার বায়‘আত গ্রহণ করলে বাকী সকলে তাঁর প্রতি আনুগত্যের বায়‘আত নেন (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৭/২২৫-২৬; তারীখে ত্বাবারী ৪/৪২৭-২৮)। 

চারজন খলীফা নির্বাচিত হয়েছিলেন উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের পরামর্শক্রমে। তাঁদের মধ্যে দুনিয়াবী কোন স্বার্থ ছিল না, ছিল না নেতৃত্বের প্রতি সামান্যতম কোন লোভ। তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল জান্নাত। উম্মতের একান্ত প্রয়োজনেই কেবল তাঁরা খেলাফতের এই কঠিন দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং বর্তমান যুগের নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়ার এ রাজনীতির সাথে ইসলামী খেলাফতের সামান্যতম কোন সম্পর্ক নেই (বিস্তারিত দ্রঃ ‘ইসলামী খেলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন’ বই)।

যে কোন অপরাধ রাষ্ট্রীয় ইসলামী আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ার পূর্বে কারো জন্য আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া জায়েয নয়। এরূপ করলে উক্ত ব্যক্তি অপরাধী হিসাবে গণ্য হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যাকারী ব্যক্তি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না (বুখারী, মিশকাত হা/৩৪৫২)। তবে কাফেরকে হত্যার বদলে কোন মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩৪৭৫)। এক্ষেত্রে রক্তমূল্য দিতে হবে। কাফেরের রক্তমূল্য মুসলিমের রক্তমূল্যের অর্ধেক এবং চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তির রক্তমূল্য স্বাধীন নাগরিকের অর্ধেক (আবুদাঊদ হা/৪৫৮৩, মিশকাত হা/৩৪৯৬)। রাসূল (ছাঃ)-এর সময়ে একজন মুসলিমের রক্তমূল্য ছিল ১০০ উট এবং আহলে কিতাব, অমুসলিম কিংবা চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তির জন্য ছিল তার অর্ধেক (আবুদাঊদ হা/৪৫৪২, ৪৫৮৩; নাসাঈ হা/৪৭৯৩; মিশকাত হা/৩৪৯২, ৩৪৯০)। প্রশ্নে বর্ণিত অপরাধের ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি শাস্তিপ্রাপ্ত না হ’লে তওবা করবে ও আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে (যুমার ৫৩)।

কাফফারা সংক্রান্ত উক্ত বক্তব্য সঠিক নয়। বরং এর জন্য অনুতপ্ত হয়ে উক্ত কাজ থেকে বিরত থাকার প্রতিজ্ঞা করে আল্লাহর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করাই যথেষ্ট হবে।

রাজা যদি আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করেন এবং ইসলামী শরী‘আত অনুযায়ী রাজ্যশাসন করেন, তাহ’লে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তার অনুকূলে। উক্ত নীতির অনুসরণ করলে বংশপরম্পরায় রাজা হওয়ায় কোন আপত্তি নেই। তার পরিবার থেকে রাজা হ’তে পারবে না, এরূপ কোন নিষেধাজ্ঞা শরী‘আতে নেই। অন্যদিকে পশ্চিমা গণতন্ত্রে মৌলিক ভিত্তিই হ’ল ধর্মহীনতা। যা মৌলিকভাবেই আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং আল্লাহর বিধানসমূহকে অস্বীকার করে। ইসলামী রাষ্ট্রনীতিতে যার অনুমোদন নেই (মায়েদাহ ৫/৪৪)। সাথে সাথে সমাজের প্রত্যেককে ক্ষমতার প্রতি লালায়িত করে তোলে। অথচ ক্ষমতা চেয়ে নেওয়া শরী‘আতে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৮০, ৩৬৮৩)।

প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের একসাথে পড়াশুনা করা সম্পূর্ণরূপে শরী‘আতবিরোধী কাজ। এছাড়াও এটি মানুষের স্বভাব ধর্মের বিরোধী এবং পারস্পরিক নীতিবোধের জন্য চরম ক্ষতিকর। আধুনিক বংশধরগণের মধ্যে অশ্লীলতা প্রসারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হ’ল প্রচলিত সহশিক্ষা ব্যবস্থা। অতএব সর্বতোভাবে একে পরিহার করার চেষ্টা করতে হবে। বাধ্যগত অবস্থায় কোন ছেলে বা মেয়েকে যদি এরূপ করতে হয়, তাহলে তাকে পূর্ণ পর্দা ও তাক্বওয়া বজায় রেখে চলতে হবে। তবে জ্ঞানার্জন থেকে বিরত থাকা যাবে না। কারণ জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক নারী-পুরুষের জন্য ফরয (ইবনু মাজাহ হা/২২৪, মিশকাত হা/২১৮)।

অন্যায় আক্রমণের শিকার হ’লে প্রতিহত করতে হবে। তবে প্রতিশোধ গ্রহণ না করে ধৈর্য্যধারণ করলে উক্ত ব্যক্তি আল্লাহর নিকটে উত্তম প্রতিদান লাভ করবে (শূরা ৪২/৩৯-৪৩, ফুছছিলাত ৪১/৩৪)। জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-কে বলল, কেউ এসে আমার মাল জোর করে নিতে চাইলে আমি কি করব? তিনি বললেন, দিবে না। লোকটি বলল, যদি সে আমার সাথে লড়াই করে? তিনি বললেন, তুমিও লড়াই করবে। সে বলল, যদি সে আমাকে হত্যা করে? তিনি বললেন, তুমি শহীদ হবে। সে বলল, যদি আমি তাকে হত্যা করি? তিনি বললেন, তাহ’লে সে জাহান্নামী হবে’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৩৫১৩)। 

তবে ফিৎনা ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়লে সে সময় প্রতিশোধ না নিয়ে ধৈর্য্যধারণ করাই উত্তম। যেমন এমতাবস্থায় করণীয় সম্পর্কে সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, যদি কেউ আমার ঘরে ঢুকে আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়, তখন আমি কি করব? জওয়াবে রাসূল (ছাঃ) বললেন, كُنْ كَخَيْرِ ابْنَىْ آدَمَ তুমি আদমের দুই ছেলের মধ্যে উত্তমটির মত হও’ (আবুদাঊদ হা/৪২৫৭, তিরমিযী হা/২১৯৪; মিশকাত হা/৫৩৯৯)।

এক্ষেত্রে কর্তব্য হ’ল (১) বিভিন্ন উপায়ে সরকারকে নছীহত করা (আহমাদ হা/৮৭৮৫; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৪৪২) (২) সকল প্রকার বৈধ পন্থায় প্রতিবাদ জানানো। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমাদের উপরে ভালো ও মন্দ দু’ধরনের শাসক আসবে। যে ব্যক্তি তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে সে দায়িত্বমুক্ত হবে। যে ব্যক্তি তাকে অপসন্দ করবে, সে নিরাপত্তা লাভ করবে। কিন্তু যে ব্যক্তি তার উপর রাযী থাকবে ও তার অনুসারী হবে (সে গোনাহগার হবে)’ (মুসলিম হা/১৮৫৪; মিশকাত হা/৩৬৭১)। (৩) সরকারের হেদায়াতের জন্য দো‘আ করা। রাসূল (ছাঃ) দাওস কওমের হেদায়াতের জন্য দো‘আ করেছিলেন(মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৯৯৬)। (৪) সরকারের বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকটে কুনূতে নাযেলাহ পাঠ করা। ৭০ জন ছাহাবীকে শঠতার মাধ্যমে হত্যাকারী রে‘ল ও যাকওয়ান গোত্রদ্বয়ের বিরুদ্ধে রাসূল (ছাঃ) মাসব্যাপী কুনূতে নাযেলাহ পাঠ করেছিলেন (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১২৮৯)। 

সরকারের সুস্পষ্ট কুফরী প্রমাণিত হলে, শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৬৬)। তবে উক্ত বিদ্রোহ কল্যাণকর হবে কি-না, সে বিষয়ে অবশ্যই দেশের নির্ভরযোগ্য বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম পরামর্শ করে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন এবং মুসলিম নাগরিকগণ তাদের অনুসরণ করবেন। বিদ্রোহ করায় কল্যাণের চেয়ে যদি অকল্যাণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে, তাহ’লে বিদ্রোহ করা যাবে না। বরং ধৈর্যধারণ করতে হবে, যতক্ষণ না আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন ফয়ছালা নাযিল হয়(বাক্বারাহ ১০৯, তওবা ২৪)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, শাসকের নিকট থেকে কেউ অপসন্দনীয় কিছু দেখলে যেন সে ধৈর্যধারণ করে (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৬৭)। তিনি বলেন, এমতাবস্থায় তাদের হক তাদের দাও এবং তোমাদের হক আল্লাহর কাছে চাও’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৭২)।‘কেননা তাদের পাপ তাদের উপর এবং তোমাদের পাপ তোমাদের উপর বর্তাবে’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৭৩)। তিনি বলেন, তোমরা তাদের হক দিয়ে দাও। কেননা আল্লাহ শাসকদেরকেই জিজ্ঞেস করবেন তাদের শাসন সম্পর্কে (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৭৫)।

এটি রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ নয়। বরং আমর ইবনু মায়মূন আবু আব্দুল্লাহ কূফী(মৃ : ৭৪ হিঃ) নামক একজন জ্যেষ্ঠ তাবেঈ কর্তৃক বর্ণিত ‘আছার’। ইমাম বুখারী ‘আনছারগণের মর্যাদা’ অধ্যায়ের ২৭ নং অনুচ্ছেদে নবুঅতপূর্ব যুগের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনার মধ্যে এ ঘটনাটি এনেছেন। তীক্ষ্ণ ধীসম্পন্ন প্রাণী বানরের মধ্যে যে অন্য প্রাণীসমূহের চাইতে অধিকতর সতর্কতা ছিল, ঘটনাটি তার অন্যতম প্রমাণ। যেমন ঘোড়া সম্পর্কেও অনুরূপ ঘটনা জানা যায়। যে নিজের মায়ের উপর অপগত হয়ে তাকে চিনতে পারায় নিজের লিঙ্গ নিজে কামড়ে ছিন্ন করে ফেলে (ফৎহুল বারী)। এর মাধ্যমে ‘রজম’টাই যে ব্যভিচারের স্বাভাবিক দন্ড, সেটাও প্রমাণিত হয়। এ ঘটনার মধ্যে মানুষের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।

যে কোন কথা, কর্ম ও ইবাদত ইসলামী আক্বীদা-বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক হলে তার বিরোধিতা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্য কর্তব্য। প্রচলিত গণতন্ত্র সেরূপ একটি বিষয়।

ইসলামী আদালত কর্তৃক উক্ত দন্ড কার্যকর হ’লে পরকালীন শাস্তির জন্য তা কাফফারা হয়ে যাবে (বুখারী হা/১৮; মুসলিম হা/১৭০৯; মিশকাত হা/১৮)।

মুরতাদের জন্য একমাত্র শাস্তি হ’ল মৃত্যুদন্ড। রাসূল (ছাঃ)-এর বলেন, مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ ‘যে ব্যক্তি স্বীয় দ্বীনকে পরিবর্তন করল, তাকে হত্যা কর (বুখারী হা/৩০১৭, মুসলিম হা/১৭৭৬; মিশকাত হা/৩৫৩৩)। তবে অবশ্যই তা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ইসলামী রাষ্ট্রীয় আদালতের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন হবে। যে কেউ বাস্তবায়ন করতে পারবে না। আল্লাহ বলেন, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর তাঁর রাসূলের ও তোমাদের মধ্যকার শাসন কর্তৃপক্ষের’...(নিসা ৪/৫৯)। সূরা মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতে মুসলিমদের মধ্য হ’তে ডাকাত, ছিনতাইকারী প্রভৃতি সমাজবিরোধী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি- কারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। জমহূর মুফাসসিরগণ এ ব্যাখ্যাই প্রদান করেছেন। পরবর্তী ৩৪ নং আয়াত থেকেই তা স্পষ্ট বুঝা যায়। আবূদাঊদে বর্ণিত হাদীছটিও একই অর্থবোধক।

দাস প্রথা শরী‘আতের পরিপন্থী নয় এবং এর হুকুমও রহিত হয়নি। তবে দাস মুক্ত করণের অত্যধিক ফযীলতের কারণে ছাহাবা, তাবেঈন ও পরবর্তী যুগের মুসলমানগণ ছওয়াবের উদ্দেশ্যে দাস মুক্ত করতে থাকলে সমাজ থেকে এ প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায়। কেননা রাসূলুল¬াহ (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি কোন মুসলিম দাসকে দাসত্ব হতে মুক্ত করবে তার প্রত্যেকটি অঙ্গের বিনিময়ে আল্লাহ মুক্তকারীর প্রত্যেক অঙ্গকে জাহান্নামের আগুন হতে নাজাত দান করবেন। এমনকি তার লজ্জাস্থানও ক্রীতদাসের লজ্জাস্থানের বিনিময়ে আগুন হতে মুক্তি পাবে (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৩৮২)।

ভাল কাজে মানত করে তা পুরা না করে ভঙ্গ করলে কাফফারা দিতে হবে। এর কাফফারা হল, (১) ১০ জন মিসকীনকে মাঝারি মানের খাদ্য দেওয়া (২) অথবা তাদেরকে পোষাক দেওয়া (৩) অথবা গোলাম আযাদ করা। (৪) এগুলো করতে অক্ষম হলে ৩টি ছিয়াম পালন করা (মায়েদাহ ৮৯)। আর যদি অন্যায় ও পাপ কাজে মানত করে তাহলে তা পূরণ করতে হবে না (মুসলিম, মিশকাত হা/৩৪২৮)।

বর্তমান বিশ্বে কোন ব্যক্তি তার দেশের কোন আইনের বিরোধিতা করলে রাষ্ট্রদ্রোহী সাব্যস্ত হয় এবং তার জেল বা ফাঁসি হয়। নিজেদের তৈরি করা আইনের বিরোধিতা করলে যদি এধরনের শাস্তি হয়, তাহ’লে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর আইনের বিরোধিতা করলে কেমন শাস্তি হওয়া উচিত? যে ব্যক্তি আল্লাহর আইনের বিরোধিতা করল এবং সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি করল, অন্যদের আক্বীদায় বিভ্রান্তি এনে দিল, তার শাস্তি কম হবে কেন? এরপর তাকে তিনদিন তওবা করার সুযোগ দিতে হবে। এর মধ্যে তওবা করলে সে বেঁচে যাবে। অবশ্য ইসলামী আইন চালু আছে এরূপ ইসলামী রাষ্ট্রের শুধুমাত্র ইসলামী আদালতের মাধ্যমেই কেবল এই শাস্তি বাস্তবায়ন করতে হবে।

সরকারের উক্ত আইন শরী‘আত পরিপন্থী। অভিভাবক তার সুবিধা অনুযায়ী মেয়ের বিবাহ দিতে পারে। আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে ৬/৭ বছর বয়সে বিবাহ করেছিলেন এবং নয় বছর বয়সে সংসার শুরু করেছিলেন (ছহীহ আবুদাঊদ হা/৪৯৩৩)। উল্লেখ্য যে, সরকারের শরী‘আত সম্মত নির্দেশ অবশ্যই পালন করতে হবে (নিসা ৫৯)।

না। কারণ পিতার মৃত্যুর পূর্বে মেয়ে অংশীদার হয় না। একমাত্র মেয়ে (অন্য কোন সন্তান না থাকা সাপেক্ষে) শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত অর্ধেক সম্পত্তির অধিকারী হবে এবং তা পিতার মৃত্যুর পরে। তবে জীবদ্দশায় তাকে হাদিয়া হিসাবে কিছু দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে অন্য সন্তান থাকলে সকলকে সমপরিমাণ দিতে হবে (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩০১৯ ‘বখশিষ’ অনুচ্ছেদ ক্রয়-বিক্রয়’ অধ্যায় অনুচ্ছেদ)।

মুহাম্মাদ (ছাঃ) প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান ছিল কেবলমাত্র আল্লাহর অহী (আন‘আম ৫০)। অর্থাৎ পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ। এ অহী ভিত্তিক সংবিধান দ্বারাই তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। এর প্রথম বাক্য হচ্ছে, পড়ুন আপনার প্রভুর নামে যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন (আলাক্ব ১)। আর সমাপ্তি ঘটে সূরা মায়েদার ৩ নং আয়াত দ্বারা।

সূদকে আল্লাহ হারাম করেছেন (বাক্বারাহ ২৭৫)। সুতরাং সূদ গ্রহণ করা ও সূদের সাথে সংশ্রব রাখা কবীরা গোনাহ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সূদ গ্রহীতা, সূদ দাতা, সূদের লেখক ও সাক্ষীদেরকে অভিসম্পাত করেছেন (মুসলিম, মিশকাত হা/২৮০৭)। অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘সূদের (পাপের) সত্তরটি স্তর রয়েছে। যার নিম্নতম স্তর হ’ল মায়ের সাথে যিনা করার (সমতুল্য) পাপ’ (ইবনু মাজাহ হা/২২৭৪; মিশকাত হা/২৮২৬)। তিনি আরো বলেন, ‘জ্ঞাতসারে কোন ব্যক্তির এক দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) সূদ গ্রহণ করা, ছত্রিশবার যেনা করার চেয়ে অনেক বেশী পাপ’ (আহমাদ, মিশকাত হা/২৮২৫, সনদ ছহীহ)। আল্লাহর নবী স্বপ্নে দেখেন যে, একটি রক্তের নদীতে জনৈক ব্যক্তি সাতার কেটে তীরে উঠতে চাচ্ছে, কিন্তু তীরে দাঁড়ানো লোকটি তাকে পাথর মারছে। ফলে সে তীরে উঠতে পারল না। পরে জিবরীল ও মীকাঈল রাসূল (ছাঃ)-কে বললেন, লোকটি সূদখোর (বুখারী, মিশকাত হা/৪৬২১ ‘স্বপ্ন’ অধ্যায়)।

এটা অবৈধ হয়েছে। এ অবস্থায় জমি ফেরত নিতে হবে এবং অংশ হারে সবাইকে লিখে দিতে হবে। একজন লোক রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট এসে বলল, আমি আমার এই ছেলেকে একটি গোলাম প্রদান করেছি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘তুমি কি তোমার সব ছেলেকে অনুরূপ দিয়েছ? লোকটি বলল, না। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, আল্লাহকে ভয় কর। তোমার ছেলেদের মাঝে ইনছাফ কর। তিনি বাড়ী ফিরে গিয়ে গোলামটি ফেরত নিলেন (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩০১৯)।

উৎপাদিত ফসল নেছাব পরিমাণ হ’লে যিনি জমি পত্তন বা লীজ নিয়েছেন তাকেই ওশর দিতে হবে। কেননা লীজ গ্রহীতাই উৎপাদিত শস্যের মালিক। আর শস্যের মালিকের উপরেই ওশর ফরয (আন‘আম ৬/১৪১)। অপর দিকে জমির মালিক যেহেতু টাকা নিয়েছে, তাই তার টাকা যদি সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বাহান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমান হয় এবং সেই টাকার উপর এক বছর অতিবাহিত হয় তাহ’লে তাকে শতকরা আড়াই টাকা হারে যাকাত দিতে হবে (আবুদাঊদ হা/১৫৭৩, ১৫৭৬; বুলূগুল মারাম, তাহক্বীক্ব: মুবারকপুরী, হা/৫৯২-৯৩ ‘যাকাত’ অধ্যায়-এর ভাষ্য দ্র.)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দাস প্রথাকে রহিত করেননি। বরং তিনি দাস-দাসীদেরকে মুক্ত করে দেয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন। অমুসলিমদের সাথে জিহাদ সংঘটিত হ’লে এখনও দাস-দাসী সৃষ্টি হ’তে পারে। জানা আবশ্যক যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ফায়ছালাকে কেউ মেনে নিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগলে সে মুমিন হ’তে পারবে না (নিসা ৬৫; আহযাব ৩৬)। ইসলামে অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলো কুরআনে নিষিদ্ধ করা হয়নি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিষিদ্ধ করেছেন। যেমন গৃহ পালিত গাধার গোশ্ত খাওয়া, হিংস্র প্রাণীর গোশ্ত খাওয়া, কবরের উপর ঘর নির্মাণ করা, চুনকাম করা, সেখানে বসা ও লিখা, যেনার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ, গণকের উপার্জিত অর্থ, ফসল পরিপক্ক হওয়ার পূর্বে বিক্রয় করা, যুদ্ধের সময় কাফের শিশু ও নারীদেরকে হত্যা করা ইত্যাদি। কুরআনে না থাকলেও এগুলো আল্লাহর ‘অহি’ মোতাবেক তিনি নিষিদ্ধ করেছেন (নাজ্ম ৩-৪)।

কোর্টের মাধ্যমে এক বৈঠকে তিন তালাক দিলে এক তালাকই গণ্য হবে। সুতরাং তিন মাসের মধ্যে ফেরত নিলে পুনরায় বিবাহ ছাড়াই দু’জন সাক্ষীর মাধ্যমে ফেরত নেওয়া যাবে। আর তিন মাস পার হয়ে গেলে পুনরায় মোহর নির্ধারণ করে নতুন বিবাহের মাধ্যমে ফেরত নিতে পারে (হাইআতু কিবারিল ওলামা ২/৭১১)। হাসান (রাঃ) বলেন, মা‘ক্বিল ইবনু ইয়াসারের বোন এক ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ অবস্থায় সে তাকে তালাক দিল। পুনরায় ফিরিয়ে আনল না। এভাবে তার ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে সে আবার তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিল। মা‘ক্বিল এতে রাগান্বিত হ’লেন। তিনি বললেন, সময়মত ফিরিয়ে নিল না, এখন আবার প্রস্তাব দিচ্ছে। তিনি তাদের মাঝে বিয়ের ব্যাপারে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন। এরপর আল্লাহ এ আয়াতটি নাযিল করেন, ‘তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এবং তারা তাদের ইদ্দত পূর্ণ করে, তখন তারা নিজেদের স্বামীদেরকে বিবাহ করতে চাইলে তোমরা বাধা দিয়ো না’ (বাক্বারাহ ২৩২)। এরপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মা‘ক্বিলকে ডাকলেন এবং তার সামনে আয়াতটি পাঠ করলেন। তখন তিনি তার যিদ পরিত্যাগ করলেন এবং আল্লাহর আদেশের আনুগত্য করলেন’ (বুখারী হা/৫৩৩১ ‘তালাক’ অধ্যায় ৪৪ অনুচ্ছেদ)।

আভিধানিক অর্থে ফিক্বহ বা শরী‘আতের বুঝ ছাহাবায়ে কেরাম সহ সকল যুগে ছিল ও থাকবে। তবে প্রশ্নে বর্ণিত উছূলভিত্তিক ফিক্বহ শাস্ত্রের আবির্ভাব ঘটে রাসূল (ছাঃ)-এর মৃত্যুর অনেক পরে। দলীল হিসাবে বর্ণিত হাদীছটি মুনকার (সিলসিলা যাঈফাহ হা/৮৮১; আবুদাঊদ হা/৩৫৯২; তিরমিযী হা/১৩২৭)।

উক্ত পদ্ধতি হারাম। বন্ধক এক ধরনের কর্য। আর কর্যের মাধ্যমে লাভ গ্রহণ করা সূদ। ছাহাবীগণ এমন কর্য নিষেধ করতেন যে কর্য লাভ আনয়ন করে (বায়হাক্বী, ইরওয়াউল গালীল হা/১৩৯৭)।

কসমের কাফফারা হচ্ছে ১০ জন মিসকীনকে খাদ্য প্রদান করা অথবা একজন দাসকে মুক্ত করা কিংবা তিনদিন ছিয়াম পালন করা (মায়েদাহ ৫/৮৯)। আল্লাহ এখানে পর পর ছিয়াম পালনের কথা বলেননি। কাজেই কসমের কাফফারার ছিয়াম পালন করার সময় বিশেষ কারণে একটি ছুটে গেলে তার জন্য আরো একটি ছিয়াম বেশী করে চারটি পালন করতে হবে না। বরং মোট ৩টিই করতে হবে। কেননা আল্লাহ বলছেন, ‘তোমরা তোমাদের সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় কর’ (তাগাবুন ৬৪/১৬)।


Desktop Site