এসো হাদিস পড়ি ?

এসো হাদিস পড়ি ?

হাদিস অনলাইন ?

সেহরী বা সাহারী খাওয়া


মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মতিক্রমে রোযার জন্য সেহরী খাওয়া মুস্তাহাব এবং যে ব্যক্তি তা ইচ্ছাকৃত খায় না সে গোনাহগার নয়। আর এ কারণেই যদি কেউ ফজরের পর জাগে এবং সেহরী খাওয়ার সময় না পায়, তাহলে তার জন্য জরুরী রোযা রেখে নেওয়া। এতে তার রোযার কোন ক্ষতি হবে না। বরং ক্ষতি হবে তখন, যখন সে কিছু খেতে হয় মনে করে তখনই (ফজরের পর) কিছু খেয়ে ফেলবে। সে ক্ষেত্রে তাকে সারা দিন পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে এবং রমাযান পরে সেই দিন কাযা করতে হবে।

সেহরী খাওয়া যে উত্তম তা প্রকাশ করার জন্য মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) উম্মতকে বিভিন্ন কথার মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি সেহরীকে বর্কতময় খাদ্য বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘তোমরা সেহরী খাও। কারণ, সেহরীতে বর্কত আছে।’’[1] ‘‘তোমরা সেহরী খেতে অভ্যাসী হও। কারণ, সেহরীই হল বর্কতময় খাদ্য।’’[2]

ইরবায বিন সারিয়াহ বলেন, একদা রমাযানে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) আমাকে সেহরী খেতে ডাকলেন; বললেন, ‘‘বর্কতময় খানার দিকে এস।’’[3]

সেহরীতে বর্কত থাকার মানে হল, সেহরী রোযাদারকে সবল রাখে এবং রোযার কষ্ট তার জন্য হাল্কা করে। আর এটা হল শারীরিক বর্কত। পক্ষান্তরে শরয়ী বর্কত হল, রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর আদেশ পালন এবং তাঁর অনুসরণ।

মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এই সেহরীর গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে তা দিয়ে মুসলিম ও আহলে কিতাব (ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের) রোযার মাঝে পার্থক্য চিহিÁত করেছেন। তিনি অন্যান্য ব্যাপারে তাদের বিরোধিতা করার মত তাতেও বিরোধিতা করতে আমাদেরকে আদেশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের রোযা ও আহলে কিতাবের রোযার মাঝে পার্থক্য হল সেহরী খাওয়া।’’[4]

কি খেলে সেহরী খাওয়া হবে?


অল্প-বিস্তর যে কোন খাবার খেলেই সেহরী খাওয়ার বিধি পালিত হয়ে যাবে। এমনকি কেউ যদি এক ঢোক দুধ, চা অথবা পানিও খায় অথবা ২/১টি বিস্কুট বা খেজুরও খায়, তাহলে তারও সেহরী খাওয়ার সুন্নত পালন হয়ে যাবে। আর এই সামান্য পরিমাণ খাবারেই রোযাদার এই বিরাট ফরয রোযা পালনের মাধ্যমে মহান আল্লাহর আনুগত্য করতে বল পাবে এবং ফিরিশ্তাবর্গ তার জন্য দুআ করবে।

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘সেহরী খাওয়াতে বর্কত আসে। সুতরাং তোমরা তা খেতে ছেড়ো না; যদিও তাতে তোমরা এক ঢোক পানিও খাও। কেননা, যারা সেহরী খায় তাদের জন্য আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন এবং ফিরিশ্তা দুআ করতে থাকেন।’’[1]

তিনি আরো বলেন, ‘‘তোমরা সেহরী খাও; যদিও এক ঢোক পানি হয়।’’[2]

আবূ হুরাইরা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘মুমিনের শ্রেষ্ঠ সেহরী হল খেজুর।’’[3]

অবশ্য সেহরী খাওয়াতে বাড়াবাড়ি করা উচিৎ নয়। কারণ, বেশী পানাহার করার ফলে ইবাদত ও আনুগত্যে আলস্য সৃষ্টি হয়।

কিছু লোক আছে, যারা গলায় গলায় ভ্যারাইটিজ পানাহার করে এমনভাবে পেট পূর্ণ করে নেয় যে, মনে হয় তার শবাসকষ্ট হচ্ছে। যার ফলে ফজরের নামাযে বড় আলস্য ও শৈথিল্যের সাথে উপস্থিত হয় এবং মসজিদে আল্লাহর যিক্রের জন্যও সামান্য ক্ষণ বসতে সক্ষম হয় না। আর দিনের বেলায় পেটের বিভিন্ন প্রকার কমপে½নের শিকার হয়। অথচ মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘উদর অপেক্ষা নিকৃষ্টতর কোন পাত্র মানুষ পূর্ণ করে না। আদম সন্তানের জন্য ততটুকুই খাদ্য যথেষ্ট, যতটুকুতে তার পিঠ সোজা করে রাখে। আর  যদি এর চেয়ে বেশী খেতেই হয় তাহলে যেন সে তার পেটের এক তৃতীয়াংশ আহারের জন্য, এক তৃতীয়াংশ পানের জন্য এবং অন্য আর এক তৃতীয়াংশ শবাস-প্রশবাসের জন্য ব্যবহার করে।’’[4]

সেহরীর সময়


সেহরী খাওয়ার সময় হল অর্ধরাত্রির পর থেকে ফজরের আগে পর্যন্ত। আর মুস্তাহাব হল, ফজর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা না হলে শেষ সময়ে সেহরী খাওয়া। আনাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, যায়দ বিন ষাবেত তাঁকে জানিয়েছেন যে, তাঁরা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে সেহরী খেয়ে (ফজরের) নামায পড়তে উঠে গেছেন। আনাস বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সেহরী খাওয়া ও আযান হওয়ার মধ্যে কতটুকু সময় ছিল?’ উত্তরে যায়দ বললেন, ‘পঞ্চাশ অথবা ষাটটি আয়াত পড়তে যতটুকু লাগে।’[1]

এখানে আয়াত বলতে মধ্যম ধরনের আয়াত গণ্য হবে। আর এই শ্রেণীর ৫০/৬০টি আয়াত পড়তে মোটামুটি ১৫/২০ মিনিট সময় লাগে। অতএব সুন্নত হল, আযানের ১৫/২০ মিনিট আগে সেহরী খাওয়া।

মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর সাহাবাগণ খুব তাড়াতাড়ি (সময় হওয়া মাত্র) ইফতার করতেন এবং খুব দেরী করে সেহরী খেতেন।[2]

সুতরাং সেহরী আগে আগে খেয়ে ফেলা উচিৎ নয়। মধ্য রাতে সেহরী খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া তো মোটেই উচিৎ নয়। কারণ, তাতে ফজরের নামায ছুটে যায়। ঘুমিয়ে থেকে হয় তার জামাআত ছুটে যায়। নচেৎ, নামাযের সময় চলে গিয়ে সূর্য উঠার পর চেতন হলে নামাযটাই কাযা হয়ে যায়। নাঊযু বিল্লাহি মিন যালিক। আর নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় মসীবত; যাতে বহু রোযাদার ফেঁসে থাকে। আল্লাহ তাদেরকে হেদায়াত করুন। আমীন।

ফজর উদয় হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ হলে


ফজর উদয় হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ হলে রোযাদার ততক্ষণ পর্যন্ত পানাহার করতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ফজর উদয় হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে। আর সন্দেহের উপর পানাহার বন্ধ করবে না। যেহেতু মহান আল্লাহ পানাহার বন্ধ করার শেষ সময় নির্ধারিত করেছেন নিশ্চিত ও স্পষ্ট ফজরকে; সন্দিগ্ধ ও অস্পষ্ট ফজরকে নয়। তিনি বলেছেন,

{ وكلوا واشربوا حتى يتبين لكم الخيط الأبيض من الخيط الأسود من الفجر }

অর্থাৎ, আর তোমরা পানাহার কর, যতক্ষণ পর্যন্ত না (রাতের) কালো অন্ধকার থেকে ফজরের সাদা রেখা তোমাদের নিকট স্পষ্ট হয়েছে। (কুরআনুল কারীম ২/১৮৭)

এক ব্যক্তি ইবনে আববাস (রাঃ)-কে বলল, ‘আমি সেহরী খেতে থাকি। অতঃপর যখন (ফজর হওয়ার) সন্দেহ হয়, তখন (পানাহার) বন্ধ করি।’ তিনি বললেন, ‘যতক্ষণ সন্দেহ থাকে ততক্ষণ খেতে থাক, সন্দেহ দূর হয়ে গেলে খাওয়া বন্ধ কর।’[1]

ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন, ‘ফজর উদয় হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ হলেও যতক্ষণ পর্যন্ত না নিশ্চিত হওয়া গেছে ততক্ষণ রোযাদার পানাহার করতে পারবে।’[2]

যদি কোন ব্যক্তি ফজর উদয় হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ রেখে খায়, অথবা ফজর উদয় হয়নি মনে করে খায়, অতঃপর জানতে পারে যে, খাওয়ার আগেই ফজর উদয় হয়ে গেছে, অথবা ফজরের আযান হয়ে গেছে, তাহলে তার রোযা শুদ্ধ এবং তাকে ঐ রোযা কাযা করতে হবে না। যদিও সে আসলে ফজরের পর খেয়েছে। কারণ, সে না জেনে খেয়েছে। আর না জেনে খাওয়া ক্ষমার্হ। অর্থাৎ তা ধর্তব্য নয়।[3] পক্ষান্তরে যদি কেউ ঘুম থেকে জেগে উঠে জানতে পারে যে, ফজর বা ফজরের আযান হয়ে গেছে এবং তা সত্ত্বে পানি বা অন্য কিছু খায়, তাহলে তার রোযা হবে না। তাকে ঐ দিন পানাহার ইত্যাদি রোযার মতই বন্ধ রেখে রমাযান পর কাযা রাখতে হবে।

জ্ঞাতব্য যে, সেহরীর শেষ সময় হল পূর্ব আকাশে ছড়িয়ে পড়া সাদা আলোক রেখার উদ্ভব কাল। সামুরাহ বিন জুনদুব (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘বিলালের আযান এবং (পূর্বাকাশে) আলম্বিত শুভ্র জ্যোতি যেন তোমাদেরকে সেহরী খাওয়াতে বাধা না দেয়। অবশ্য পূর্বাকাশে ছড়িয়ে পড়া জ্যোতি দেখে খাওয়া বন্ধ করো।’’[4]

বলা বাহুল্য, ছড়িয়ে পড়া উক্ত সাদা রেখা পরিদৃষ্ট হলে সাথে সাথে রোযাদারের জন্য পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত হওয়া ওয়াজেব। তাতে সে ফজরের আযান শুনুক, অথবা না শুনুক। কারণ, মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘তোমরা পানাহার কর, যতক্ষণ পর্যন্ত না (রাতের) কালো অন্ধকার থেকে ফজরের সাদা রেখা তোমাদের নিকট স্পষ্ট হয়েছে।’’ (কুরআনুল কারীম ২/১৮৭)

আর মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘ইবনে উম্মে মাকতূমের আযান না দেওয়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার কর। কারণ, সে ফজর উদয় না হলে আযান দেয় না।’’[5]

লক্ষণীয় যে, ফজর উদয় হয়েছে কি না, তা-ই দেখার বিষয়; আযান হয়েছে কি না, তা নয়। অতএব মুআযযিন যদি নির্ভরযোগ্য হয় এবং জানা যায় যে, সে ফজর উদয় না হলে আযান দেয় না অথবা ফজর উদয় হওয়ার পরে দেরী করে আযান দেয় না, তাহলে তার আযান শোনামাত্র পানাহার থেকে বিরত হওয়া ওয়াজেব। পক্ষান্তরে মুআযযিন যদি (ফজর উদয়ের) সময় হওয়ার পূর্বেই আযান দেয়, তাহলে তার আযান শুনে পানাহার বন্ধ করা ওয়াজেব নয়। তদনরূপ মুআযযিন যদি ঢিলে হয় এবং যথাসময় থেকে দেরী করে আযান দেয়, তাহলে সময় শেষ জানা সত্ত্বেও আযান হয়নি বলে খেয়ে যাওয়া বৈধ নয়। কারণ, এতে রোযা হবে না।

কিন্তু মুআযযেনের অবস্থা না জানা গেলে, অথবা একই শহরে একাধিক মসজিদের একাধিক মুআযযেনের বিভিন্ন সময়ে আযান হলে এবং শহরের ভিতরে ঘর-বাড়ি তথা লাইটের ফলে ফজর উদয় হওয়ার সময় নিজে নির্ধারণ না করতে পারলে নির্ভরযোগ্য সেই ইসলামী পঞ্জিকা অনুযায়ী আমল করা জরুরী, যাতে নিখুঁতভাবে ফজর উদয়ের স্থানীয় সময় ঘ¦টা-মিনিট সহ স্পষ্ট লিখা থাকে। অতঃপর নিজের ঘড়ি ঠিক রেখে সেই সময় অনুযায়ী সেহরী-ইফতার করলে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর সেই হাদীসের উপর আমল হবে, যাতে তিনি বলেন, ‘‘যে বিষয়ে সন্দেহ আছে সে বিষয় বর্জন করে তাই কর যাতে সন্দেহ নেই।’’[6] ‘‘সুতরাং যে সন্দিহান বিষয়াবলী থেকে দূরে থাকবে, সে তার দ্বীন ও ইজ্জতকে বাঁচিয়ে নেবে।’’[7]

জ্ঞাতব্য যে, ফজর উদয় হওয়ার ৫/১০ মিনিট আগে সতর্কতামূলকভাবে পানাহার থেকে বিরত হওয়া একটি বিদআত। কোন কোন পঞ্জিকা (বা রমাযান-সওগাতে) যে একটি ঘর সেহরীর শেষ সময়ের এবং পৃথক আর একটি ঘর ফজরের আযানের লক্ষ্য করা যায়, তা আসলে শরীয়ত-বিরোধী কাজ।[8] কারণ, সেহরীর শেষ সময় যেটাই, সেটাই ফজরের আযানের সময়। আর ফজরের আযানের সময়ের আগে লোকেদের পানাহার বন্ধ করা অবশ্যই শরীয়ত-বিরোধী কাজ।

বলা বাহুল্য, (বিশেষ করে) রমাযান মাসে মুআযযিন-ইমামদের উচিৎ, যথাসময়ে আযান দেওয়ার ব্যাপারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা রাখা। রাইট-টাইমের ঘড়ি দ্বারা ফজর উদয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আযান দেওয়া মোটেই উচিৎ নয়। যাতে তাঁরা লোকেদেরকে ধোকা দিয়ে এমন সময় আযান না দিয়ে বসেন, যে সময়ে তাদের জন্য আল্লাহর হালালকৃত খাদ্য তাদের জন্য হারাম করে দেন এবং সময় হওয়ার পূর্বেই ফজরের নামায হালাল করে বসেন। আর এ যে কত বড় বিপজ্জনক, তা অনুমেয়।[9]

 আবূ হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘যখন তোমাদের কেউ আযান শোনে এবং সেই সময় তার হাতে (পানির) পাত্র থাকে, তখন সে যেন তা থেকে নিজের প্রয়োজন পূর্ণ না করা পর্যন্ত রেখে না দেয়।’’[10]

অনেক উলামা উক্ত হাদীসটিকে এ কথার দলীল মনে করেন যে, যে ব্যক্তির হাতে খাবারের পাত্র (নিয়ে খেতে) থাকা অবস্থায় ফজর (বা তার আযান) হয়ে যায়, তার জন্য তা থেকে নিজের প্রয়োজন পূর্ণ না করা পর্যন্ত রেখে দেওয়া (খাওয়া বন্ধ করা) বৈধ নয়। সুতরাং এ ব্যাপারটি আয়াতের সাধারণ নির্দেশ থেকে স্বতন্ত্র। মহান আল্লাহ বলেন,

{ وكلوا واشربوا حتى يتبين لكم الخيط الأبيض من الخيط الأسود من الفجر }

‘‘আর তোমরা পানাহার কর, যতক্ষণ পর্যন্ত না (রাতের) কালো অন্ধকার থেকে ফজরের সাদা রেখা তোমাদের নিকট স্পষ্ট হয়েছে।’’ (কুরআনুল কারীম ২/১৮৭)

অতএব উক্ত আয়াত তথা অনুরূপ অর্থের সকল হাদীস উপর্যুক্ত হাদীসের বিরোধী নয়। তাছাড়া ইজমার প্রতিকূলও নয়। বরং সাহাবাদের একটি জামাআত এবং আরো অন্যান্যগণ উক্ত হাদীস অপেক্ষা আরো প্রশস্ততা রেখে মনে করেন যে, ফজর উজ্জ্বল হয়ে গেলে এবং ভোরের শুভ্র আলো রাস্তায় ছড়িয়ে পড়লেও সে পর্যন্ত পানাহার করা বৈধ।[11]

অনেকে মনে করেন, উক্ত হাদীসে ‘আযান’ বলতে বিলালের আযানকে বুঝানো হয়েছে; যা প্রথম (সেহরী বা তাহাজ্জুদের) আযান এবং যা ফজরের আগে দেওয়া হত। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘বিলাল রাতে আযান দেয়। সুতরাং তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পানাহার করতে থাক, যতক্ষণ পর্যন্ত না ইবনে উম্মে মাকতূম আযান দেয়।’’[12]

অথবা উক্ত হাদীসের অর্থ এই যে, আযান শুনেও যদি ফজর উদয়ে সন্দেহ হয়, যেমন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার ফলে অন্ধকার থাকে, তাহলে সে সময় কেবল আযানে ফজর হওয়ার কথা নিশ্চিতরূপে জানা যায় না। কারণ, ফজর জানার যে মাধ্যম তা (ফজরের জ্যোতি) নেই। আর মুআযযিন তা দেখে ফজর উদয়ের কথা জানতে পারলে সেও জানতে পারত। পক্ষান্তরে ফজর উদয় হওয়ার কথা এমনিই বুঝতে পারা গেলে মুআযযেনের আযান শোনার প্রয়োজন নেই। কারণ, সে তো (রাতের) কালো অন্ধকার থেকে ফজরের সাদা রেখা স্পষ্ট হলেই পানাহার থেকে বিরত থাকতে আদিষ্ট। এ কথা বলেছেন খাত্ত্বাবী।

বাইহাক্বী বলেন, ‘উক্ত হাদীস সহীহ হলে অধিকাংশ উলামার নিকট তার ব্যাখ্যা এই যে, মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) জেনেছিলেন, মুআযযিন ফজর হওয়ার আগে আযান দেয়। সুতরাং তখন সে পান করলে ফজর উদয়ের আগেই পান করা হবে।’[13]

আলী আল-ক্বারী বলেন, ‘উক্ত নির্দেশ তখন প্রযোজ্য, যখন ফজর উদয়ে সন্দেহ হয়।’ ইবনুল মালেক বলেন, ‘উক্ত নির্দেশ তখন প্রযোজ্য, যখন জানতে পারবে না যে, ফজর উদয় হয়ে গেছে। নচেৎ, যখন ফজর উদয় হওয়ার কথা জানতে পারবে এবং তাতে সন্দেহ করবে তখন নয়।’[14] এ ছাড়া আরো অন্য ব্যাখ্যাও করা হয়েছে। সুতরাং আল্লাহই ভালো জানেন।

বলা বাহুল্য, শেষোক্ত উলামাদের মতানুসারে যখন কোন রোযাদার মুখে কোন খাদ্য বা পানীয় থাকা অবস্থায় ফজরের আযান শুনবে, তখনই সে তা মুখ থেকে উগলে ফেলে দেবে। আর এতে তার রোযা শুদ্ধ হয়ে যাবে।[15]

প্রকাশ থাকে যে, সেহরী খাওয়ার পর মুআযযিনের আযানের অপেক্ষা করে তার ‘আল্লা--’ বলার সাথে সাথে তৈরী রাখা পানি শেষ বারের মত পান করা বৈধ নয়। কারণ, আযান হয় ফজর উদয় হওয়ার সাথে সাথে এবং এ কথা জানাবার উদ্দেশ্যে যে সেহরীর সময় শেষ। অতএব খাবার সময় নেই জানার পরেও খাওয়া শরীয়তের বিরোধিতা তথা রোযা নষ্ট করার কাজ।[16]

পূর্বের আলোচনায় আমরা জানতে পেরেছি যে, ফজরের আগে একটি আযান আছে, যা তাহাজ্জুদ ও সেহরীর সময় জানাবার জন্য ব্যবহার করা হত মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর যুগে। অতএব সেহরীর সময় লোকেদেরকে জাগানোর জন্য সেই আযানের বদলে কুরআন বা গজল পড়া, বেল বা ঘ¦টা বাজানো, অথবা তোপ দাগা বিদআত।[17]

শীঘ্র ইফতার


রোযার নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে রোযা খোলা বা ইফতার করার জন্য প্রত্যেক রোযাদারের অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করাটাই স্বাভাবিক। আর সেই সময় যে তার রোযা পূর্ণ করতে পারে প্রকৃতিগতভাবে সে খুশী হয়। অতএব ইফতার করতে তাড়াতাড়ি করাটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু তা সত্ত্বেও দয়ার নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে সত্বর ইফতার করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে, তাতে আমাদের মঙ্গল আছে। তিনি বলেন, ‘‘লোকেরা ততক্ষণ মঙ্গলে থাকবে, যতক্ষণ তারা (সূর্য ডোবার পর নামাযের আগে) ইফতার করতে তাড়াতাড়ি করবে।’’[1]

যেহেতু ইয়াহুদ ও খ্রিষ্টানরা রোযা রেখে দেরী করে ইফতার করে, তাই তিনি আমাদেরকে তাদের বিরুদ্ধাচরণ করতে আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘দ্বীন ততকাল বিজয়ী থাকবে, যতকাল লোকেরা ইফতার করতে তাড়াতাড়ি করবে। কারণ, ইয়াহুদ ও খ্রিষ্টানরা দেরী করে ইফতার করে।’’[2]

খোদ মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর আমল ছিল জলদি ইফতার করা। আবূ আত্বিয়াহ বলেন, আমি ও মাসরূক আয়েশা (রাঃ)এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললাম, ‘হে উম্মুল মুমেনীন! মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর সাহাবীদের মধ্যে একজন (সময় হওয়া মাত্র) তাড়াতাড়ি ইফতার করে ও তাড়াতাড়ি নামায পড়ে এবং অপর একজন দেরী করে ইফতার করে ও দেরী করে নামায পড়ে।’ তিনি বললেন, ‘ওদের মধ্যে কে তাড়াতাড়ি ইফতার করে ও তাড়াতাড়ি নামায পড়ে?’ আমরা বললাম, ‘আব্দুল্লাহ (অর্থাৎ ইবনে মাসঊদ)।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এ রকমই (তাড়াতাড়ি ইফতার ও নামায আদায়) করতেন।’[3]

সময় হওয়ার সাথে সাথে শীঘ্র ইফতার করা নবুঅতের একটি আদর্শ। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘তিনটি কাজ নবুয়তের আদর্শের অন্তর্ভুক্ত; জলদি ইফতার করা, দেরী করে (শেষ সময়ে) সেহরী খাওয়া এবং নামাযে ডান হাতকে বাম হাতের উপর রাখা।’’[4]

বলা বাহুল্য, স্থানীয়ভাবে সূর্যের বৃত্তির সমস্ত অংশটা অদৃশ্য হয়ে (অস্ত) গেলে রোযাদারের উচিৎ, সাথে সাথে সেই সময় ইফতার করা। আর এ সময় নিম্ন আকাশে অবশিষ্ট লাল আভা থাকলেও তা দেখার নয়। যেহেতু মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘রাত যখন এদিক (পূর্ব গগণ) থেকে আগত হবে, দিন যখন এদিক (পশ্চিম গগণ) থেকে বিদায় নেবে এবং সূর্য যখন অস্ত যাবে, তখন রোযাদার ইফতার করবে।’’[5]

অতএব দেখার বিষয় হল সূর্যাস্ত; আযান নয়। সুতরাং রোযাদার যদি সবচক্ষে দেখে যে, সূর্য ডুবে গেছে কিন্তু মুআযযিন এখনো আযান দেয়নি, তাহলেও তার জন্য ইফতার করা বৈধ।[6]

পক্ষান্তরে পূর্বসতর্কতামূলকভাবে মুআযযিনদের দেরী করে আযান দেওয়া বিদআত।[7]

সূর্য ডোবার পর আবার সূর্য দেখলে


সূর্য ডোবার পর কোন মুসাফির বিমান বন্দরে ইফতার করার পর প্লেনে চড়ে আকাশে উঠে যদি সূর্য দেখে, তাহলে তার জন্য পানাহার থেকে বিরত থাকা এবং পুনরায় রোযায় থাকার নিয়ত করা জরুরী নয়। কারণ, সে তার রোযার পূর্ণ একটি দিন অতিবাহিত করে ফেলেছে। অতএব ইবাদত করার উদ্দেশ্যে তা শেষ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় শুরু করার কোন পথ নেই। আর তাকে ঐ দিন কাযাও করতে হবে না। কেননা, তার রোযা শুদ্ধ হয়ে গেছে।

পক্ষান্তরে সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে প্লেনে উড়ে পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করলে এবং মুসাফির ঐ দিনের রোযা পূর্ণ করতে চাইলে সে নিজের দেশের সময় অনুযায়ী ইফতার করতে পারবে না। বরং শূন্যে থাকা অবস্থায় যতক্ষণ না সূর্য অস্তমিত হতে দেখবে, ততক্ষণ সে রোযায় থাকতে বাধ্য; যদিও তাতে দিন অনেক লম্বা হবে।

অনুরূপ ইফতার করার জন্য আকাশের যে লেভেলে এসে সূর্য দেখা যায় না সে লেভেলে প্লেনে নামিয়ে আনা পাইলটের জন্য বৈধ নয়। কারণ, তা এক প্রকার ছল-বাহানা। অবশ্য যদি উড্ডয়নের কোন স্বার্থে বিমান নিচের লেভেলে নামাতে হয় এবং সেখানে এসে সূর্য অদৃশ্য হয়, তাহলে ইফতার করা যাবে।[1]

সূর্য ডুবে গেছে মনে করে ইফতার করলে


সূর্য ডুবে গেছে মনে করে রোযাদার ইফতার করে নেওয়ার পর যদি জানা যায় যে, সূর্য এখনও ডুবে নি, তাহলে সঠিক মতে তার রোযা শুদ্ধ; তাকে কাযা করতে হবে না। কারণ, সে না জেনেই ইফতার করে ফেলেছে। আর অবস্থা (সময়) না জেনে রোযা নষ্টকারী জিনিস ব্যবহার করলে তার এ (না জানার) ওযর গ্রহণযোগ্য। তা ছাড়া আসমা বিন্তে আবী বাক্র (রাঃ) বলেন, ‘নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর যুগে একদা আমরা মেঘলা দিনে ইফতার করলাম। তারপর সূর্য দেখা গেল।’[1] সুতরাং তাঁরা সূর্য ডুবে গেছে মনে করেই দিনের বেলায় ইফতার করেছিলেন। অতএব অবস্থা বা সময় তাঁদের অজানা ছিল; শরয়ী নির্দেশ নয়। তাঁদের ধারণায় ছিল না যে, সে সময়টা দিনের বেলা। আর মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) তাঁদেরকে সে দিনকে কাযা করতেও আদেশ দেননি। পক্ষান্তরে (উক্ত অবস্থায়) কাযা ওয়াজেব হলে তা শরীয়তরূপে পরিগণিত এবং তার বর্ণনা আজ পর্যন্ত সুরক্ষিত হত। অতএব তা যখন সুরক্ষিত নেই এবং সে ব্যাপারে কোন নির্দেশ মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) কর্তৃক বর্ণিত নেই, তখন মৌলিক অবস্থা হল, দায়িত্বমুক্ত হওয়া এবং কাযা না করা।[2]

কি দিয়ে ইফতারী হবে?


কিছু আধা-পাকা অথবা পূর্ণ পাকা (শুকনা) খেজুর দিয়ে এবং তা না পাওয়া গেলে পানি দিয়ে ইফতার করা সুন্নত।

আনাস (রাঃ) বলেন, ‘আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) নামাযের পূর্বে কিছু আধা-পাকা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। তা না পেলে পূর্ণ পাকা (শুকনা) খেজুর দিয়ে এবং তাও না পেলে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে নিতেন।’[1]

তিনি আরো বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, "যে ব্যক্তি খেজুর পায়, সে যেন তা দিয়ে ইফতার করে। যে ব্যক্তি তা না পায়, সে যেন পানি দিয়ে ইফতার করে। কারণ, তা হল পবিত্র।" [2]

ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেন, ‘নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) খেজুর দ্বারা ইফতার করতে এবং তা না পাওয়া গেলে পানি দ্বারা ইফতার করতে উৎসাহিত করতেন। আর এ হল উম্মতের প্রতি তাঁর পরিপূর্ণ দয়া ও হিতাকাঙ্খার নিদর্শন। পেট খালি থাকা অবস্থায় প্রকৃতি (পাকস্থলী)কে মিষ্টি জিনিস দিলে তা অধিকরূপে গ্রহণ করে এবং তদ্দবারা বিভিন্ন শক্তিও উপকৃত হয়; বিশেষ করে দৃষ্টিশক্তি এর দ্বারা বৃদ্ধি পায়। মদ্বীনার মিষ্টি হল খেজুর। খেজুর মদ্বীনাবাসীর মিষ্টান্ন। খেজুরের উপরই তাদের লালন-পালন। খেজুর তাদের প্রধান খাদ্য এবং তা-ই তাদের সহযোগী খাদ্য। আর অর্ধপক্ক খেজুর তাদের ফলস্বরূপ।

পক্ষান্তরে পানিও (এ সময়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ জিনিস।) রোযার ফলে কলিজায় এক প্রকার শুষ্কতা আসে। সুতরাং তা প্রথমে পানি দিয়ে আর্দ্র করলে তারপর খাদ্য দ্বারা উপকার পরিপূর্ণ হয়। এ জন্য পিপাসার্ত ও ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য উত্তম হল, প্রথমে একটু পানি পান করে তারপরে খেতে শুরু করা। এ ছাড়া খেজুর ও পানিতে এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে, হার্টের উপকারিতায় যার প্রভাবের কথা কেবল ডাক্তারগণই জানেন।’[4]

বলা বাহুল্য, কারো কাছে পানি ও মধু থাকলে, পানিকে প্রাধান্য দিয়ে পানি দ্বারা ইফতার করবে। কেননা রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘--- যে ব্যক্তি তা না পায়, সে যেন পানি দিয়ে ইফতার করে। কারণ, তা হল পবিত্র।’’ অবশ্য পানি পান করার পর মধু খাওয়া দোষাবহ নয়।[5]

এই ভিত্তিতেই খালি পেটে উপকারী বলে দাবী করে প্রথমে আদা-লবণ অথবা (খেজুর ছাড়া) অন্য কোন জিনিস মুখে নিয়ে ইফতার করা সুন্নতের প্রতিকূল। অবশ্য প্রথমে এক ঢোক পানি খেয়ে তারপর ঐ সব খেতে দোষ নেই।

ইফতার করার সময় খাওয়ার মত কোন জিনিস না পাওয়া গেলে মনে মনে ইফতারের নিয়ত করাই যথেষ্ট। এ ক্ষেত্রে আঙ্গুল চোষার প্রয়োজন নেই - যেমন কিছু সাধারণ লোক করে থাকে। যেমন রুমালকে থুথু দিয়ে ভিজিয়ে তা চোষাও বিধেয় নয়।[6]

জ্ঞাতব্য যে, অনেক লোকেই এই মাসের ইফতারের সময় বড় লম্বা-চওড়া দস্তরখান বিছিয়ে থাকে। যাতে সাজানো হয় (চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়) নানা রকম পানাহার সামগ্রী। কখনো কখনো সাধ্যের বাইরে নানান ধরনের গোশত, শাক-সব্জি, ফল-মূল, শরবত-জুস ও ক্ষীর-সামাই-পিঠা-পুরি ইত্যাদির সম্ভার প্রস্ত্তত করা হয়। যার অনেকাংশ প্রয়োজনের অতিরিক্ত; বিধায় তা ফেলে দিতে হয়। যা নিঃসন্দেহে হারাম। রমাযান আমাদের কাছে তা চায় না। তাছাড়া অপচয় শরীয়তে নিষিদ্ধ ও নিন্দিত। মহান আল্লাহ বলেন,

{وكلوا واشربوا ولا تسرفوا, إنه لا يحب المسرفين}

অর্থাৎ, তোমরা খাও এবং পান কর। আর অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না। (কুরআনুল কারীম ৭/৩১)

{ولا تبذر تبذيرا, إن المبذرين كانوا إخوان الشياطين}

অর্থাৎ, তোমরা কিছুতেই অপব্যয় করো না। কারণ, অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। (কুরআনুল কারীম ১৭/২৬-২৭)

বলা বাহুল্য, এ ব্যাপারে আমাদেরকে মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করা উচিৎ। উচিৎ নয়, নিষিদ্ধ কৃপণদের পথ অবলম্বন করা। যেমন উচিৎ নয়, অপচয় ও অপব্যয়ের হারাম পথ গ্রহণ করা।[7]

ইফতারের সময়


যেমন পূর্বেই আলোচিত হয়েছে যে, সূর্যের পুরো বৃত্ত অদৃশ্য হওয়ার সাথে সাথে ইফতারের সময় হয়। আর সে সময় হল মাগরেবের নামাযের আগে। ইফতার করে নামায পড়ার পর প্রয়োজনীয় আহার ভক্ষণ করবে রোযাদার। অবশ্য যদি আহার প্রস্ত্তত থাকে, তাহলে প্রথমে আহার খেয়েই নামায পড়বে। যেহেতু আনাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘‘রাতের খাবার উপস্থিত হলে মাগরিবের নামায পড়ার আগে তোমরা তা খেয়ে নাও। আর সে খাবার খেতে তাড়াহুড়া করো না।’’[1]

কিন্তু সময় হওয়ার পূর্বে ইফতার করা হতে সাবধান! কারণ, মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) একদল লোককে (স্বপ্নে) দেখলেন যে, তারা তাদের পায়ের গোড়ালির উপর মোটা শিরায় (বাঁধা অবস্থায়) লটকানো আছে, তাদের কশগুলো কেটে ও ছিঁড়ে আছে এবং কশ বেয়ে রক্তও ঝরছে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, আমি বললাম, ‘ওরা কারা?’ তাঁরা বললেন, ‘ওরা হল তারা; যারা সময় হওয়ার পূর্বে-পূর্বেই ইফতার করে নিত---।’’[2]

রোযা অবস্থায় দুআ


রোযাদারের উচিৎ, ইফতার করার আগে পর্যন্ত রোযা থাকা অবস্থায় বেশী বেশী করে দুআ করা। কারণ, রোযা থাকা অবস্থায় রোযাদারের দুআ আল্লাহর নিকট মঞ্জুর হয়। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘তিন ব্যক্তির দুআ অগ্রাহ্য করা হয় না (বরং কবুল করা হয়); পিতার দুআ, রোযাদারের দুআ এবং মুসাফিরের দুআ।’’[1]

পক্ষান্তরে ইফতার করার সময় দুআ কবুল হওয়ার কথা বিশুদ্ধ বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত নয়। এ ব্যাপারে যা কিছু বর্ণনা করা হয়, তা যয়ীফ। অনুরূপ ইফতারের সময় একাকী বা জামাআতী হাত তুলে দুআও বিধেয় নয়। কারণ, সুন্নাহ (মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বা তাঁর সাহাবাগণের তরীকায়) এ আমলের বর্ণনা মিলে না। অতএব রোযাদার সতর্ক হন।

এ স্থলে পানাহার করার সময় যে সব দুআ সাধারণভাবে পঠনীয় তা নিম্নরূপঃ-

১। পানাহারের পূর্বে বিসমিল্লাহ বলা। কারণ, মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) তা বলতে আদেশ করেছেন।[2] আর তিনি এ কথাও জানিয়েছেন যে, তা না বললে শয়তান ভোজনকারীর সাথে ভোজনে অংশ গ্রহণ করে থাকে।[3]  একদা একটি বালিকা এবং একজন বেদুঈন ‘বিসমিল্লাহ’ না বলেই খেতে শুরু করতে চাইলে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) তাদের হাত ধরে ফেললেন এবং বললেন যে, শয়তান তাদেরকে এভাবে খেতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং তাদের হাতের সাথে শয়তানের হাত তাঁর হাতে ধরা আছে। আসলে শয়তান তাদের সাথে খেতে চাচ্ছিল।[4]

২। খাওয়ার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে ভুলে গেলে এবং খেতে খেতে মনে পড়লে বলতে হয়,

بسم الله أوله وآخره

উচ্চারণঃ- বিসমিল্লা-হি আউওয়ালাহু অ আ-খিরাহ।

অর্থ- শুরুতে ও শেষে আল্লাহর নাম নিয়ে খাচ্ছি।[5]

৩। খাওয়া শেষ হলে ‘আল-হামদু লিল্লাহ’ বলতে হয়। যেহেতু কিছু খাওয়া অথবা পান করার পরে বান্দা আল্লাহর প্রশংসা করুক এটা তিনি পছন্দ করেন।[6]

আর ইফতার করার সময় যে দুআ প্রমাণিত, তা ইফতার করার পর পঠনীয়। ইবনে উমার (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) ইফতার করলে এই দুআ বলতেন,

তৃষ্ণাগুলি চলে গেল এবং শিরা ভেঙ্গে গেল এবং পুরস্কারটি স্থির হয়ে গেল, ঈশ্বর ইচ্ছুক ছিলেন।

উচ্চারণঃ- যাহাবায যামা-উ অবতাল্লাতিল উরুক্বু অষাবাতাল আজরু ইনশা-আল্লাহ।

অর্থ- পিপাসা দূরীভূত হল, শিরা-উপশিরা সতেজ হল এবং ইনশা-আল্লাহ সওয়াব সাব্যস্ত হল।[7]

ইফতারের সময় এই দুআয় সবচেয়ে সহীহরূপে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া ইফতারের অন্যান্য (লাকা সুমতু, ইত্যাদি) দুআ বিশুদ্ধরূপে প্রমাণিত নয়।

 

রোযার অন্যান্য আদব

‘ভোগে কেবল দুর্ভোগ সার, বাড়ে দুখের বোঝা,

ত্যাগ শিখ্ তুই সংযম শিখ্, সেই তো আসল রোযা।

এই রোযার শেষে ঈদ আসিবে, রইবে না বিষাদ।।’ -কাজী নজরুল

Desktop Site